.
মৃত্যুভরা কালো পানি
পুলিশ জেটির তলায় কালো পানিতে মরচে ধরা লোহার খুঁটিগুলোকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। দ্বাদশীর চাঁদের আলোয় ফুটে ওঠা লোহার বড় ফ্রেমটার ডোরাকাটা ছায়ায় দাঁড়িয়ে কস্টেবল স্যান্টোস আকোয়ালাং-এর সিলিন্ডারটা বন্ডের পিঠে তুলে দিলেন, এবং বন্ড তার দড়িদড়াগুলো ভাল করে কোমরে জড়িয়ে নিল, যাতে লিটারের দেওয়া পানির নিচে গাইগার কাউন্টারের স্ট্র্যাপে টান না পড়ে।
স্যান্টোস এক বিশালদেহী মিশ্রবর্ণের মানুষ, পরনে এখন শুধু সাঁতার কাটবার প্যান্ট। তার বুকের মাংসপেশী দুটো বড় বড় থালার মত দেখাচ্ছে। বন্ড বলল, এত রাতে পানির নিচে আমি কি কি দেখতে পারি? বড় কোন মাছ থাকবে এদিকে?
স্যাটোস হেসে বলল, বন্দরের ধারে-কাছে যারা থাকে তাদেরকেই দেখবেন স্যার। দু একটা ব্যারাকুডাও চোখে পড়তে পারে। কিংবা হাঙর। চাঁদ আর ডিস্কোর ডেকের আলোকে আপনি সবকিছু দেখতে পাবেন। বারো থেকে পনেরো মিনিটের বেশি লাগবে না আপনার।
বন্ড কোমরের ছোরাটা একবার পরখ করে মাউথপীসে মুখ রাখল। অক্সিজেনের সাপ্লাই খুলে দিয়ে পানিতে নেমে গেল বালির ওপর দিয়ে। কাদায় ঢাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থাকে থাকে নিচে নামতে লাগল, সেই সঙ্গে বন্ডও। প্রায় চল্লিশ ফিট যাবার পর সে দেখল, সমুদ্রের তলা থেকে সে মাত্র কয়েক ইঞ্চি ওপর দিয়ে যাচ্ছে। বন্ডের মনে হল, সে যেন চাঁদের মাটির ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। বন্ডের সাঁতার কাটার ছন্দ ক্রমশঃ স্বাভাবিক হয়ে এল। চাঁদকে ডান কাঁধের দিকে রেখে সঠিক রাস্তায় এগোতে বন্ডের মন ডোমিনোর উদ্দেশ্যে উধাও হয়ে গেল। হঠাৎ বন্ড এর তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে সহসা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের সংকেত বেজে উঠল বিপদ! বিপদ!
তার শরীর শক্ত হয়ে গেল। তার হাত চলে গেল ছোরার দিকে আর মাথা ঘুরে গেল ডানদিকে। কুড়ি পাউন্ডের ব্যারাকুড়া হচ্ছে সমুদ্রের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মাছ। এই মাছটি চলছিল বন্ডের থেকে প্রায় দশ গজ দূরে, সমান্তরালভাবে। বিরাট মুখটা আধ ইঞ্চি হাঁ করা। বন্ড হঠাৎ ছোরা হাতে বিশাল মাছটাকে তীব্রভাবে আক্রমণ করল। দানব ব্যারাকুডাটা অলসভাবে বারকয়েক ল্যাজের পাখনা নেড়ে সরে গেল, আর বন্ড আবার নিজের রাস্তা ধরতেই সে ঘুরে গিয়ে বন্ডের পিছু নিল। ছোট ছোট রূপালী মাছেদের এক মস্ত ঝাঁক দেখা দিল সামনে। মাঝসমুদ্রে এমনভাবে ভাসছিল, যেন তাদের কাঁচের বোতলে পুরে রাখা হয়েছে। দুটি সমান্তরাল দেহ তাদের কাছাকাছি এসে পড়তেই তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে দুই শত্রুর জন্য রাস্তা করে দিল, এবং তারা চলে যেতেই আবার ঘন হয়ে এল। পানির ওপর এসে পড়া জ্যোৎস্না টুকরো হয়ে ভেঙে ছড়িয়ে পড়ছিল। বন্ড ধীরে ধীরে সেদিকে উঠতে লাগল। বাঁ দিকে অনেক দূরে একজোড়া বড় স্ক্রু চাঁদের আলোয় চকচক করছে। হ্যাঁ, সত্যিই একটা দরজা আছে। সে গাইগার কাউন্টারের সুইচ টিপে সেটাকে চেপে ধরল ইস্পাতের। ওপর। বাঁ হাতের কব্জিতে বাঁধা মিটারের কাঁটার দিকে লক্ষ্য করে দেখল, খুবই অল্প বিচলিত হয়েছে।
প্রায় একই সঙ্গে বন্ড কানের পাশে ঠং আওয়াজ শুনল, আর তার কাঁধে লাগল জোর ধাক্কা। সঙ্গে সঙ্গে বন্ড খোল থেকে ছিটকে সরে এল। তার নিচে একটা তীক্ষ্ণ বর্শা কাঁপতে কাঁপতে তলিয়ে যাচ্ছে। বন্ড ঘুরল…একটা লোক, গায়ে কালো রবারের স্যুট চাঁদের আলোয় বর্মের মত ঝকঝক করছে। স্থির থাকবার জন্য জোরে পা দিয়ে পানিতে ঘাই মারতে মারতে সে তার গ্যাস (CO,) বন্দুকের নলে আর একটা বর্শা ঢোকাবার চেষ্টা করছে। পাখনা ঝাঁপটা মেরে বন্ড তীরের মত লোকটার দিকে এগিয়ে গেল। লোকটা চট করে লোডিং লীভার টেনে বন্দুক উঁচিয়ে ধরল। বন্ড বুঝল দেরি হয়ে গেছে। শিকার এখনও ছ স্ট্রোক দূরে। সুতরাং সে হঠাৎ থেকে গিয়ে, মাথা নিচু করে নিচের দিকে ডুব মারল। বন্ড নিচ থেকে লোকটিকে আক্রমণ করল। গ্যাস বন্দুকের নিঃশব্দ বিস্ফোরণের ঢেউ অনুভব করল সে, আর তার পায়ে কি যেন লাগল। বন্ড নিচ থেকে লোকটিকে ছোরা দিয়ে ছোবল মারল। পুরো ঢুকে গেল ফলাটা। বন্ড হাতে রবারের স্পর্শ পেল। তারপর বন্দুকের কুঁদোটা তার কানের পেছনে আঘাত হানল, আর একটা সাদা হাত নেমে এল তার মুখ থেকে মাউথপীস খুলে নেওয়ার জন্য। বন্ড পাগলের মত ছোরা চালাতে লাগল। ছোরার তলাটা কি যেন চিরে দিল। সাদা হাতটা বন্ডের কাঁচের মুখোশ ছেড়ে দিল, কিন্তু বন্ড আর কিছু দেখতে পাচ্ছে না। আবার বন্দুকের কুঁদোটা তার মাথায় সজোরে এসে লাগল।
সমস্ত পানি এখন কালো ধোঁয়ায় ভরে উঠেছে। বন্ড আস্তে আস্তে দেখল কালো ধোয়াটা বের হচ্ছে লোকটার দেহ। থেকে। পেটের ভেতর থেকে রক্ত! বন্ডের হাত-পা সীসের মত ভারী হয়ে আসছে। বন্ড কোনরকমে বুকের ওপর হাত জোড় করে বাধা দেবার চেষ্টা করল উঁচু হয়ে ওঠা বন্দুকের নলটাকে। আর ঠিক তক্ষুনি লোকটার দেহ বন্ডের দিকে ছিটকে এল, যেন কেউ তার পিছনে জোর ধাক্কা দিল। হাত দুটো বন্ডের দিকে খুলে গেল অদ্ভুত এক আলিঙ্গনের ভঙ্গিতে, আর বন্দুকটা দুজনের মাঝখানে পড়ে আস্তে আস্তে ডুবে অদৃশ্য হয়ে গেল। লোকটার পিঠ থেকে একগাদা কালো রক্ত সমুদ্রে ছিটকে পড়ল।
এতক্ষণে বন্ড সেই ব্যারাকুড়াকে দেখতে পেল লোকটার কয়েক গজ পেছনে। তার দাঁত থেকে কয়েক টুকরো কালো রবার ঝুলছে। এবার বাঘের মত চোখ দুটো ঠাণ্ডা দৃষ্টি ফেলল, প্রথম বন্ডের ওপর, তারপর মৃতদেহটার ওপর। তারপর সর্বদেহ কাঁপিয়ে বিদ্যুতের মত ঝাঁপ দিল।
