বন্ড সরলভাবে হাসল, বলল চলে আসুন, আপনার প্রেতের সঙ্গে আমার প্রেতের লড়াই হোক। লার্গোর মুখে সংশয় ফুটে উঠল। তিনি জুতোটাকে জোর থাবড়া মেরে বললেন, ঠিক আছে বন্ধুবর। তিনবারের খেলায় কে জেতে দেখা যাক। এইবার তিন নম্বর খেলা।
টেবিল নিস্তব্ধ। খেলা শেষ । অনুত্তেজিত ভঙ্গিতে বন্ড তার তাস ফেলে দিয়ে বলল, আমার মনে হয়, আমার বদলে তাসের কু-দৃষ্টিটাকে ঘায়েল করা উচিত ছিল আপনার। টেবিলের চারপাশে অনেক মন্তব্যের গুঞ্জন শোনা গেল। এবার নিজের মুখের বিকৃতি সামলাতে লাগ্লোকে রীতিমত চেষ্টা করতে হল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সামলে নিলেন। বন্ড বলল, খেলার জন্য ধন্যবাদ।
ডোমিনো ঘরটার সবচেয়ে দূরের কোণে রাখা একটা টেবিলের দিকে চলল। তার পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে বন্ড এই প্রথম লক্ষ্য করল যে, মেয়েটা অল্প একটু খোঁড়াচ্ছে। বন্ড মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল, আজ সাঁতার কাটতে গিয়ে কি তোমার পায়ে লেগেছে? সে গম্ভীর হয়ে বলল, না, আমার একটা পা অন্যটার চেয়ে এক ইঞ্চি ছোট; আপনার খারাপ লাগছে?
না। বেশ সুন্দর লাগছে, তোমাকে কেমন বাচ্চা বাচ্চা মনে হচ্ছে। তাছাড়া আমার মনে হয়, তোমাকে খুব যত্নে মানুষ করা হয়েছিল, যাকে বলে, পায়ে কখনো মাটি লাগতে দেওয়া হয়নি। তারপর হঠাৎ তোমাকে টেনে এনে ফেলে দেওয়া হল প্রায় রাস্তার ওপর। তোমার হাতে ছিল নারীর চিরন্তন অস্ত্র আর তা খুব ঠাণ্ডা মাথায় ব্যবহার করেছ তুমি। মনে হয়, তোমার নিজের দেহকে কাজে লাগাতে হয়েছে তোমাকে। এটা খুব চমৎকার কাজ দেয়, কিন্তু সে ক্ষেত্রে তোমার কোমল প্রবৃত্তিগুলোকে অবহেলা করতেই হবে। এখন তুমি যা চেয়েছিলে তা সবই পেয়েছ। বন্ড ডোমিনার হাত স্পর্শ করল। তারপর বলল, তুমি অপরূপ সুন্দরী, যৌন আকর্ষণে ভরা, উত্তেজক, স্বাধীন, স্বেচ্ছাচারী, মেজাজী এবং নিষ্ঠুর।
মেয়েটি বন্ডকে বলল, আপনি আমাকে নিষ্ঠুর বললেন কেন? ধর, আমি জুয়া খেলতে বসে লার্গোর মত খারাপভাবে হারছি, তখন যদি একটি মেয়ে অর্থাৎ আমার প্রেমিকা, আমার পাশে বসে সব কিছু দেখেও একটা উৎসাহের কথা না বলে, তাহলে আমি তাকে নিষ্ঠুরই বলব। প্রেমাস্পদের সামনে ব্যর্থ হওয়া পুরুষেরা পছন্দ করে না।
মেয়েটি অধৈর্যভাবে বলে উঠল, আমাকে প্রায়ই এরকম পাশে বসে ওর কায়দা দেখতে হয়। আমি চাইছিলাম যে আপনি জিতুন। আমি ভান করতে পারি না। আমি আপনাকে বলেছিলাম ও আমার অভিভাবক, সেটা মিথ্যে কথা। আমি ওর রক্ষিতা। আমি একটা গিল্টি করা খাঁচায় আটকানো পাখি। এই খাঁচায় আমার আর স্পৃহা নেই। দেহের বাইরেটা অনায়াসে কেনা যায় কিন্তু মনটা নয়। ও মেয়েদের দরকারের জন্য ব্যবহার করে, প্রেম করার জন্য নয়। আমার আর ভাল লাগছে না।
বন্ড লক্ষ্য করল মেয়েটার চেহারা একেবারে পালটে গিয়েছে। খুব নরম দেখাচ্ছে তাকে। সে তার জীবনের কথা বলতে শুরু করল, সে ছিল এক পালতোলা জাহাজের নাবিক। সারা পৃথিবী যে ঘুরে বেড়াল। অনেক মেয়ে পেয়েছিল সে জীবনে। তারপর বাষ্পীয় জাহাজ চলাচল শুরু হল। থাকে ঐ রকম একটা জাহাজে। একদিন আমার সেই স্বপ্নের মানুষটি অপরূপ এক সোনালি সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এল। সে তার জমানো টাকা দিয়ে ব্রিস্টলে একটা মদের বার খুলল। আমাকে ইটালী ফেরত যেতে হল। একদিন লম্বা সিল্কের টুপি পরা আর ফ্রক কোট পরা এক ভদ্রলোক হীরোর বার এ ঢুকলেন। মেয়েটি প্যাকেটের পাশে দিকের লেখাটা দেখাল, জন প্লেয়ার অ্যান্ড সন্স। আগন্তুকেরা ছিলেন সেই জন প্লেয়ার ও তার দুই ছেলে। তারা কাপড়ে আঁকা ছবি দুটোর খুব প্রশংসা করে, ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে, সিগারেটের প্যাকেটে ছাপবার ব্যবস্থা করে দিলেন। এর জন্য তারা একশ পাউন্ড দিতে রাজি আছে। হীরোর তাতে কোন আপত্তি ছিল না, আর তাছাড়া তার ঠিক একশ পাউন্ডেরই দরকার ছিল বিয়ের জন্য। ডোমিনার দৃষ্টি অনেক দূরে চলে গেল। হীরো একটি জলপরী একেছিল। আমার মনে হয় হীরো তার জলপরী মুছে যাওয়াতে একটু দুঃখিত। হয়েছিল। হীরো যখন বুড়ো হয়ে পড়ল, বোঝা গেল সে আর বেশিদিন বাঁচবে না, মিঃ প্লেয়ার লাইফবয়ের সামনে। হীরোর ছবিটার এক প্রতিলিপি আঁকালেন তখনকার দিনের একজন শ্রেষ্ঠ শিল্পীকে দিয়ে। তিনি হীরাকে কথা দিলেন যে, এ ছবিটাও থাকবে প্রত্যেক প্লেয়ার্স সিগারেটের প্যাকেটে, তবে ভেতরদিকে। হীরোর মৃত্যুর ঠিক আগে মিঃ প্লেয়ার নতুন ছবিটা উপহার দিয়ে গিয়েছিলেন।
এবার মেয়েটি তার ক্রমশঃ স্বপ্নের জগৎ থেকে ফিরে আসছিল। আমি মনে করি এটা নেহাৎ একটা রূপকথা।
বন্ড একটা সিগারেট ধরিয়ে একমুখ ধোয়া ছেড়ে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল, তোমার পারিবারিক নাম কি পেটাশী?
ও হ্যাঁ। ভিতালী নামটা আমি স্টেজে ব্যবহার করতাম। ভাল শোনায় বলে আমার নামটা বদলে নিয়েছি। ইটালীতে ফিরে এসে আমি ভিতালী নামটাই ব্যবহার করেছি।
তোমার ভাইয়ের কি হল? তার চরিত্রে অনেক গন্ডগোল আছে। কিন্তু চমৎকার পাইলট সে। শেষবার শুনেছিলাম সে প্যারিসে কি এক উঁচু পদ পেয়েছে।
ও ছাড়া আমার আর কেউ নেই। আমি তাকে অন্য সব কিছুর চেয়ে ভালবাসি।
বন্ড সিগারেটটা অ্যাসট্রেতে ঘসে নিভিয়ে ফেলল। বিল আনতে পাঠালো। তারপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, সব বুঝলাম।
