বন্ড কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, মনে হচ্ছে, তোদের রাষ্ট্রপতি তাঁর নাসাউ-এ পাঠানো লোকটির চেয়ে একটু বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বোধহয় আমাদের দুই দেশের সেনাপতিরা আটলান্টিকের দু ধারে তাদের সৈন্যসামন্ত সুবিধেমত সাজিয়ে ফেলেছেন। যাই হোক, নাসাউ ক্যাসিনো যদি প্রেতাত্মা সংঘের প্রথম লক্ষ্যস্থল হয়, তবে কাছাকাছি সৈন্য সামন্ত জোগাড় করে রাখতে ক্ষতি নেই।
লীটার বলল, আমাকে যে কটা টার্গেটের কথা বলা হয়েছে, তা হল কেপ ক্যানাভেরাল, পেনুসাঁকোলার নৌ-ঘাঁটি, আর দ্বিতীয় বোমাটাও যদি নেহাৎ এদেশেই ফাটায়, তাহলে তাদের লক্ষ্য হবে মিয়ামী…ট্যাম্প হলেও হতে পারে। প্রেতাত্মা সংঘ পাশ্চাত্য শক্তিবর্গের কোন এক সম্পত্তির কথাটা বলছিল। আমার মনে হয় এটা ওরা কোনও এক বড় কারখানার কথা বলছে–মন দিয়ে বিবেচনা করতে হলে আমি বলব হয় কেপ ক্যানাভেরাল, নয় এই গ্র্যান্ড বাহামার রকেট ঘাঁটি। তবে একটা কথা আমি বুঝতে পারছি না যে, ওরা যদি ঐ বোমা দুটো পেয়েই থাকে, তাদের লক্ষ্যস্থলে ফাটাবে কি করে? সাবমেরিনের সাহায্যে করা যায়–স্রেফ একটা টর্পেডো টিউবের ভেতর দিয়ে বোমাটাকে সমুদ্রতটের কাছাকাছি ফেলে দেওয়া। কিংবা, একটা ডিঙ্গিতে করে ভাসিয়ে দিলেও হয়। শুধু TNT আর পুটোনিয়ামের মধ্যে ঠিক জায়গায় একটা ফিউজ লাগিয়ে দিতে হবে। আর বোমার মাথায় আর একটা ফিউজ থাকে যেটাতে জোর ধাক্কা লাগলে বোমা ফাটে। সেই ফিউজ সরিয়ে নিয়ে সেই জায়গায় অন্য ফিউজ লাগিয়ে দিতে হবে। যাতে বোমা বসিয়ে দিয়ে শ খানেক দূরে পালিয়ে যাওয়ার সময় থাকে।
লীটার অবহেলাভরে বলল, চল, এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া যাক। তারপর আমরা ক্যাসিনোতে গিয়ে দেখতে চাই, কোন শয়তান বৈজ্ঞানিক জুয়ার টেবিলে লার্গোর পাশ আলো করে বসে আছে।
.
তাসের রাজা
নাসাউ ক্যাসিনো হল পৃথিবীর সমস্ত ব্রিটিশ এলাকার একমাত্র আইনসঙ্গত জুয়ার আড্ডা। প্রতি বছর এই ক্যাসিনো এক ক্যানাডিয়ান জুয়াখেলার সংস্থাকে লীজ দেওয়া হয়। এবং সমস্ত শীতকালে তাদের লাভ এক লক্ষ ডলারের কাছাকাছি বলে আন্দাজ করা হয়। এখানে পরিচ্ছন্ন নাচবার ও খাবার ঘর আছে। এর থেকে যা লাভ হয়, পরিচালকদের তা সত্যিই প্রাপ্য। রাজ্যপালের দেহরক্ষী বন্ড ও লিটারকে দুটো মেম্বারশিপ কার্ড পৌঁছে দিয়েছিল। ক্যাসিনোতে ঢুকে প্রথমে কফি এবং মদ খাওয়ার পর ওরা আলাদা হয়ে বিভিন্ন জুয়ার টেবিলের দিকে চলল।
লার্গো শ্যমা দ্য ফেরার তাঁর সামনে এক স্কুপ ডলারের চাকতি, আর আধ ডজন হাজার ডলার মূল্যের হলদে বড় চাকতি। ডোমিনো ভিতালি তার পেছনে বসে একটার পর একটা সিগারেট খেতে খেতে খেলা দেখছিল। বন্ড দূর থেকে খানিকক্ষণ খেলা দেখল। স্কোয়্যারকাট নেকলাইন দেওয়া কালো পোশাকও গলায় সরু চেন দেওয়া একটা হীরে পরা ডোমিনোকে খুব বিষণ্ণ, ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। লার্গোর ভাগ্য সম্বন্ধে সকলেই নার্ভাস হয়ে পড়েছে দেখে তার সাহস বেড়ে গেল।
এই যে বন্ধুবর মিঃ বন্ড, লার্গো হাত বাড়িয়ে বললেন, এইবার টেবিলে অঢেল টাকা আসছে, আমার বোধহয় অন্য কাউকে ব্যাংকটা দিয়ে দেওয়া উচিত। এই ইংরেজরা রেলগাড়ির ব্যাপার বোঝে ভাল। কিন্তু তবু তিনি সুন্দরভাবে হাসলেন, হারতে যদি হয়, তবে মিঃ বন্ডের কাছেই হারা ভাল।
বিশাল বাদামী থাবাটা তাসের জুতো কে এক নরম থাবড়া মারল। জিভের মত একটা তাস বেরিয়ে এল। সেটা নিয়ে লার্গো টেবিলের মোটা কাপড়ের ওপর দিয়ে বন্ডের দিকে এগিয়ে দিলেন। নিজের জন্য আরেকটা বার করলেন, এবং তারপর দুজনের জন্য অন্য আরও দুটো তাস বের হল। বন্ড নিজের প্রথম তাসটা তুলেই সেটা টেবিলের মাঝখানে চিৎ করে ফেলে দিল। নওলা, রুইতনের নওলা। বন্ড পাশে লার্গোর দিকে তাকাল। বলল, শুরুটা চমৎকার হল–এতই চমৎকার যে আমার অন্য তাস-টাও দেখিয়ে দিচ্ছি। বলে সে সহজভাবে সেটাকে নওলার পাশে ছুঁড়ে দিল। তাসটা মাঝপথে ডিগবাজি খেয়ে আগেরটার পাশে চিৎ হয়ে পড়ল। এক অপূর্ব দশ, ইস্কাপনের দশ। বন্ডের মোট পয়েন্ট হল নয়, সবচেয়ে বেশি যা হতে পারে। নেহাৎ যদি লার্গোর দুটো তাসের সমষ্টিও নয় বা উনিশ পয়েন্ট হয়, বন্ড জিতে গেছে। বন্ড তাস দেখিয়ে দেওয়াতে তার আরেকটা তাস তোলার উপায় রইল না। লার্গো এক পয়েন্টের জন্য হেরে গেছেন–দুজনের হাতই চমৎকার, এ ধরনের হার সবচেয়ে কষ্টকর।
বন্ড জিতল। সুতরাং এবার সেই ব্যাংকার। Croupier সাহেব আটশো ডলারের চাকতি বন্ডের দিকে সরিয়ে দিলেন।
খুশির হাসি হেসে লার্গো বললেন, আর একবার চেষ্টা করা যাক। আপনি যা জিতেছেন রাখুন, আর আমি আপনার ডানদিকের মিঃ স্নোকে পার্টনার নিয়ে বাজি ধরছি। ঠিক আছে, মিঃ স্নো? মিঃ স্নো, একজন শক্ত চেহারার ইউরোপ্রিয়ান, রাজি হলেন। বন্ডের মনে পড়ল, ইনি লার্গোর গুপ্তধনের অন্যতম অংশীদার। বন্ড আটশো ডলার বাজি রাখল, আর বিরুদ্ধে তারা চারশো ডলার করে রাখলেন। আবার বন্ড জিতল। তার পয়েন্ট ছয়, বিপক্ষের পাঁচ। লার্গো দুঃখের ভঙ্গিতে বললেন, এবার সত্যিই আমরা ভাগ্যের লিখন বুঝতে পেরেছি। মিঃ স্নো বন্ডের দিকে তার জেতা ১৬০০ ডলার ঠেলে দিলেন। লার্গো গগমে গলায় বলে উঠলেন, বন্ধুবর আমার তাসের ওপরে কু দৃষ্টি দিতে চাইছেন। আমাদের দেশে ও-জিনিস ঘায়েল করবার একটা চমৎকার কায়দা আছে। ভীড়ের মধ্যে সকলের কাছে এটা এক মজার ব্যাপার ছাড়া কিছুই মনে হল না।
