সহকারী রাজ্যপাল রোডিক, চক্চকে পাঁশনে পরা সতর্ক চেহারার এক ভদ্রলোক, বন্ডকে সমস্ত পরিস্থিতিটা একেবারে পানির মত বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করলেন দেখুন মিঃ বন্ড, আমরা এ ব্যাপারে সবরকম সম্ভাবনার সব দিক থেকে ভীষণ খুঁটিয়ে বিচার করে দেখছি। আমাদের মত চার ইঞ্জিনওয়ালা অতবড় একটা প্লেন আমাদের উপনিবেশের এলাকার মধ্যে লুকিয়ে রাখা সম্ভব, এরকম ধারণা করবার পিছনে কোন যুক্তি নেই। এত বড় একটা প্লেন নামাবার মত বিমান বন্দর এ অঞ্চলে একটাই আর সেটি হচ্ছে নাসাউ। বাইরের প্রতিটি বড় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন যে, এ বিষয়ে। তাঁদের কিছু জানা নেই।
বন্ড বাধা দিয়ে বলেছিল, আচ্ছা, ঐ রাডার স্ক্রীনের ওপর কি ২৪ ঘণ্টা নজর রাখা হয়?
পুলিশ কমিশনার ভদ্রলোক বললেন, স্যার, কমান্ডারের এ কথাটি কিন্তু ভাববার মত। বিমানবন্দরের বড়কর্তা স্বীকার করেছেন যে, রাতের দিকে যখন কোন প্লেন আসার কথা থাকে না, তখন কাজকর্ম একটু শিথিল হয়ে পড়ে। তার লোকজনের সংখ্যা বেশি নয়, আর তারাও আবার সব স্থানীয় লোক। তাছাড়া আবহাওয়া স্টেশনের রাডার যন্ত্রটা ছোট, আওতা নেহাৎ কম। এটা ব্যবহার করা হয় প্রধানত জাহাজ চলাচলে সাহায্য করবার জন্যই।
সহকারী রাজ্যপাল রাডার যন্ত্র বা নাসাউ-এর লোকদের কার্যদক্ষতার আলোচনায় মোটেই জড়িয়ে পড়তে চাইছিলেন না। বলরেন, এটা অবশ্যই ভাববার কথা। আর কম্যান্ডার বন্ড তো নিজেই সব তদন্ত করবেন।
বন্ড জানতে চাইলেন, তিনি যাদের খুঁজছেন তারা হচ্ছে একদল লোক। দশ জনেরও হতে পারে আবার বিশ-ত্রিশ জনেরও হওয়ার সম্ভব। তারা সবসময় জোট বেঁধে থাকবে। এইরকম কোন দলবল আপাতত আছে কিনা?
মিঃ পিটম্যান?
তা স্যার এরকম দলতো এখানে অজস্র আসে। আমাদের টুরিস্ট বোর্ড অবশ্য এদের আসাটা খুবই পছন্দ করে। মিঃ পিটম্যান প্রশস্ত হেসে বললেন, তা আমাদের দ্বীপের বাৎসরিক গুপ্তধন অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
পুলিশ কমিশনার একটু সংশয়ের সুরে বললেন, তবে একটা কথা স্যার। এই অনুসন্ধানকারী দলের সত্যিই এক ইয়ট আছে। আর এই ব্যাপারে শেয়ারহোল্ডাররাও সম্প্রতি এসে পৌঁছেছেন বলে শুনেছি। কম্যান্ডার বন্ডের অনুমানের সাথে এগুলো সব মিলে যাচ্ছে। বন্ড এই ছোট্ট সূত্রটুকু সাগ্রহে আঁকড়ে ধরে কাস্টমস্ বিল্ডিং আর কমিশনারের অফিসে এ নিয়ে আরো দুটো ঘণ্টা তত্ত্ব-তালাশ চালিয়েছে। তারপর বেড়াবার উদ্দেশ্যে শহরে ঢুকেছে, যদি লার্গোর দলের কাউকে দেখা যায়। আর এখন বন্ড ট্যাক্সি বন্দরে এসে পৌঁছল। সে ড্রাইভারকে অপেক্ষা করতে বলে প্রবেশদ্বারের লাগোয়া লম্বা নিচু হলঘরটাতে ঢুকে পড়ল। ঠিক তক্ষুণি লার্কিনের প্লেনের এসে পৌঁছানোর কথা ঘোষণা করা হচ্ছে।
হঠাৎ পেছন থেকে এক শান্ত স্বর শোনা গেল 007? নম্বর ০০০-এর সাথে আলাপ করুণ। বন্ড চমকে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখল সেই অদ্বিতীয় ফেলিস্ লিটার। CIA-র লিটার বন্ডের জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর কয়েকটা অ্যাডভেঞ্চারে তার সঙ্গী হয়েছে।
প্রবেশ দ্বারে পৌঁছে লিটার তার একগাদা মালপত্র বন্ডের ট্যাক্সিতে চাপিয়ে ড্রাইভারকে বলে দিল সেগুলো বাহামিয়ানে পৌঁছে দিতে।
দুই বন্ধু গাড়িতে চেপে বসল। বিমান বন্দর ছাড়িয়ে এলে বন্ড বলল, শেষবার যখন তোকে দেখি, তুই পিংকার্টন ডিটেকটিভ এজেন্সিতে কাজ করছিলি। এর মধ্যে আবার জড়ালি কি করে?
টেনে আনা হয়েছে। স্রেফ টেনে এনে ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমার মনে হয় প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে যখন জরুরী নির্দেশ এল এই থান্ডারবলের ব্যাপারে তখন বোধহয় আমাদের বুড়ো কর্তা মানে অ্যালেন ডালেমের হাতে বিশেষ লোকজন ছিল না। সুতরাং আমাকে আর আরো জন বিশেক লোককে টেনে আনল। ওরা আমাকে সব খবরাখবর দিয়ে চলে আসতে বলল নাসাউতে। এবং তোর সাথেই কাজ করতে হবে। তুই যে সব যন্ত্রপাতি চেয়ে পাঠিয়েছিলি সে সব নিয়ে রওনা হয়ে পড়লাম।
এবারে বন্ড লিটারকে পুরো ইতিহাস বলতে শুরু করে দিল। আগের দিন সকালে এম এর অফিসে ঢোকার পর থেকে একটাও খুঁটিনাটি বাদ দিল না। বন্ড বেশ লজ্জার সাথেই শ্রাবল্যান্ডে তার চিকিৎসার বিবরণ দিল। লিটার বিলক্ষণ উপভোগ করল সেটা। তারপর সব শুনে বলল, বাস্তব জীবনে এটম বোমা সুদ্ধ প্লেনও হারায় না। কি সেই রকম হয়েছে, তুই ঝিমিয়ে পড়ছিস জেমস? আমরা দুজন যে সব কেসে জড়িয়ে পড়েছি এ পর্যন্ত, তার বিবরণ আজ কটা লোক বিশ্বাস করবে?
বন্ড এবার খুব আন্তরিকভাবে বলল, শোন্ ফেলি আমি এক কাজ করি। তোর গল্পের মধ্যে ভাববার জিনিস আছে তাই আজ রাত্রে তোর আনা ঐ যন্ত্রটার সাহায্যে M-কে জানাব। দেখা যাক্ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড-এর থেকে কিছু সুবিধা করতে পারে কিনা। সেই ক্লিনিক্ আর ব্রাইটনের যে হাসপাতালে কাউন্ট ছিল–এই জায়গায় অনুসন্ধান চালালে বেশ কিছু খবর পাওয়া যাবে। তবে মোটর বাইকের সেই লোকটিকে কোনদিন ধরতে পারব কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
রয়্যাল বাহামিয়ান হোটেলের তলায় গাড়ি থামাল তারা। লিটার গিয়ে হোটেলের খাতায় নাম সই করল। তারপর সিঁড়ি বেয়ে নিজেদের ঘরে গিয়ে তারা দুটো ডাবল ড্রাই মার্টিনি অন্ দ্য রকস্ এবং মেনু আনতে পাঠাল। আধঘণ্টা পর তাদের লাঞ্চ এসে গেল। খাওয়া দাওয়ার শেষে তারা ঠিক করল ডিস্কা ভোলান্তে ইয়টটা ঘুরে দেখে আসবে। বন্ড টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, এরপর আমরা ঠিক করতে পারব যে, ঐ লোকগুলোর অনুসন্ধানের লক্ষ্য কি? স্প্যানীশ গুপ্তধন না ১০,০০,০০,০০০ পাউন্ড! পরের কাজ হল সদর দপ্তরে রিপোর্ট পাঠানো। প্যাকিং কেসগুলোর দিকে হাত বাড়িয়ে বন্ড বলল, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ওপর তলার দুটো ঘর পাওয়া গেছে। কমিশনার ভদ্রলোক খুব সমর্থ। আমাদের সাহায্য করতে আগ্রহী। সেই একটা ঘরে রেডিও সেটটা বসিয়ে আজ সন্ধ্যাবেলাতেই বেতার অফিসের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। আজ রাতে একটা পার্টি আছে ক্যাসিনোতে, তাতে দেখতে হবে যে লার্গোর দলের কাউকে আমরা চিনতে পারি কিনা। আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে ইয়টটার মধ্যে দুটো বোমা লুকানো আছে কিনা দেখা। লিটার প্যাকিং কেসগুলোর কাছে গিয়ে একটাকে বেছে নিয়ে খুলে ফেলল। সে যখন ফিরে এল তখন তার কাঁধে ঝুলছে চামড়ার খাপে ভরা একটা রোলিফ্লেক্স ক্যামেরা। সামনের ঢাকা খুলে দিয়ে বলল, সত্যিকারের লেন্সটেন্স সব কিছু আছে কিন্তু এই ভুয়া ক্যামেরাটার ভেতরেই যত কিছু যন্ত্রপাতি–ধাতব ভাল আছে, সার্কিট আছে, কতগুলো ব্যাটারি আছে। চমৎকার এক গাউগার কাউন্টার। এবার ঘড়িটা দেখ। শুধু তফাৎ হচ্ছে যে ঘড়ির কলকজা এর পেটের অল্পই জায়গা জুড়ে আছে, আর এর সেকেন্ডের কাটাটা হচ্ছে আমাদের তেজস্ক্রিয়তা মাপবার মিটার। এই তারগুলো দিয়ে মূল যন্ত্রটার সাথে জোড়া।
