পেটাশী ব্রেক দিয়ে গতিবেগ কমাতে লাগল। তার চোখ অল্টিমিটারের দিকে আর নিচের ঝকঝকে সমুদ্রের দিকে। চাঁদের আলোয় সমস্ত সমুদ্রের পানি স্নিগ্ধ আলোয় ঝলমল করছে। এবার সে এসে পড়ল এক অন্ধকার দ্বীপের ওপর।
লাল আলোটা একেবারে নাক বরাবর সামনে। প্লেনটা শূন্যে ছোট্ট একটা লাফ দিল। আবার ধাক্কা, ব্যাস! পেটাশী সত্যিই প্লেনটাকে নামাতে পেরেছে। প্লেনটা খুব আস্তে আস্তে পানির ভিতর তলিয়ে যাচ্ছিল। জরুরী অবস্থায় বেরোবার জন্য প্লেনের বাঁ দিকে একটা ছোট দরজা আছে। সেই দরজা খুলে সে বাইরে বেরিয়ে এল।
ইতিমধ্যেই একটা জলি বোট এসে পড়েছে প্লেনের পিছন দিকে। তাতে ছ জন লোক। একটি লোক পেটাশীর দিকে এগিয়ে এল। একটা লম্বা ছোরা তার অনাবৃত থুতনির দিকে ঢুকিয়ে দিল। পেটাশী বোধহয় কিছুই বুঝতে পারল না–শুধু ক্ষণিকের বিস্ময়, সুতীব্র যন্ত্রণা, তারপর অজস্র উজ্জ্বল আলোর বিস্ফোরণ। পেটাশীর মৃতদেহটা নিয়ে লোকটা পানির মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
হত্যাকারী এবার হেঁটে গিয়ে জলি বোটে উঠল। এবার সবাই মিলে অজস্র ফেনায় ঢাকা পানির মধ্যে ডুব দিল। শেষ লোকটি ডুব দেওয়ার পর বোটের মেকানিক একটা আন্ডার ওয়াটার সার্চলাইট-এর মুখ নিচের দিকে নামিয়ে দিয়ে ডুবুরিদের জন্য দড়ি ছাড়তে লাগলেন। খানিক পরে সার্চলাইটটা জ্বালিয়ে দিতেই ডুবন্ত প্লেনটার চারদিকে ভরে গেল উজ্জ্বল আলোর কুয়াশা। মেকানিক বোট থামিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলেন।
.
ডিস্কো ভোলান্তে
রাত্রি শেষ হতে আর আধঘণ্টা দেরি। প্রেতাত্মা সংঘের ১ নম্বর বেতার যন্ত্রের ঘরে ঢুকলেন। বেতারে ২ নম্বরকে ধরে দিতে বললেন অপারেটরকে।
কিছুক্ষণ পর–শুনতে পাচ্ছি। আমি ২ নম্বর। একটা গম্ভীর স্বর শোনা গেল। কাজ সফল হয়েছে। এখন সওয়া দশটা। পরের পর্যায় পৌনে এগারটার মধ্যে শেষ হবে। কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। ধন্যবাদ। আর কিছু শোনা গেল না। ১ নম্বর হেঁটে গিয়ে নামলেন ইয়েটের খোলের দিকে। সেখানে দ্বিতীয় ডুবুরি দলের চারজন বসে ধূমপান করছিল। তাদের লক্ষ্য করে বললেন, তোমাদের নামবার আর বোধহয় বেশি দেরি নেই। ধীরে-সুস্থে কাজ কর। ১ নম্বর লোহার। সিঁড়ি বেয়ে ইয়েটের খোল থেকে ডেকের ওপর উঠে এলেন। দু শ গজ দূরে ফাঁকা সমুদ্রের ওপর ছোউ জলি বোটটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সার্চলাইটের আলোয় সমুদ্রগর্ভের কিছুটা অংশ সোনার মত উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সার্চ লাইটের কারেন্ট দিচ্ছে একটা ছোট জেনারেটর। এখান থেকে সবচেয়ে কাছের দ্বীপটির দূরত্ব পাঁচ মাইল। প্ল্যান ওমেগা এগিয়ে চলেছে নিঃশব্দে এবং দ্রুতগতিতে।
১ নম্বরের আসল নাম এমিলিক ওলার্গো। এক বিশাল ও অসাধারণ সুপুরুষ। তার চেহারায় এমন এক জান্তব আকর্ষণ আছে যা, যে কোন মেয়ের মাথা ঘুরিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। তিনি অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষ। তার রক্তের মধ্যে রয়েছে লুণ্ঠনের বীজ। তার প্রকৃতি অন্যরকম। তার প্রতিটি কাজের পেছনে থাকে এক অপরূপ সূক্ষ্মতা এবং এক অতি শীতল মস্তিষ্ক, যার সাহায্যে প্রতি ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর শিকারদের প্রতি হিংসা অনায়াসে এড়াতে পেরেছেন। প্রেতাত্মা সংঘের পক্ষে এবং প্ল্যান ওমেগা র সর্বাধিনায়ক হওয়ার পক্ষে তিনি ছিলেন এক আদর্শ দস্যু।
একজন নাবিক দরজায় টোকা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। বলল, ওদের সিগন্যাল পাওয়া গেছে। রথ আর স্লেজ রওনা হয়েছে।
ধন্যবাদ। কোন বড় কাজের উত্তাপ এবং উত্তেজনার মধ্যেও লার্গো এক প্রশান্তির সৃষ্টি করতে পারতেন। দূর থেকে দেখা গেল পানির নিচে থেকে জোনাকীর মত ছোট একটা আলো তবৃত করে জলি বোটের দিকে এগিয়ে আসছে। কল্পনার চোখে লার্গো সমুদ্রের অনেক তলায় কর্মরত আটজন ডুবুরির প্রতিটি অঙ্গ সঞ্চালন দেখতে পাচ্ছিলেন। এই প্ল্যান ওমেগা র পেছনে যে কতবড় একটা প্রচেষ্টা ও উদ্ভাবনীশক্তি কাজ করছে, তা ভেবে লার্গো আর একবার বিস্মিত হলেন।
জলি বোটের কাছে পানির ওপর একটা ছোট আলোর ঝলক দেখা গেল। ডুবুরীরা একে একে ভেসে উঠছে…তাদের ঘুমের কাঁচের আবরণীতে চাঁদের আলো প্রতিফলিত হয়ে ঝিলিক দিচ্ছে। তারা একে একে মই বেয়ে ওপরে উঠে এল। ইয়টের ক্যাপ্টেন লার্গোর পাশে এসে দাঁড়ালেন। লার্গো প্রশ্ন করলেন ওদের প্রত্যেককে এক গ্লাস করে হুইস্কি দাও। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আবার ডুব দিতে হবে। কোসে-কে বল আমার সাথে দেখা করতে।
পদার্থবিদ কোৎসের চোখে চাঁদের আলোয় জ্বলজ্বল করছিল। লাগো জানতে চাইলেন কোন সমস্যা আছে কি না? কোৎসে জানালেন–সব কিছুই হাতের কাছে আছে, কোন সমস্যা নেই। আমি গিয়ে কাজটা শেষ করে ফেলছি। লাগো তাকিয়ে তাকিয়ে কোসেকে অস্থিরভাবে ডেক বেয়ে নেমে যেতে দেখলেন। তিনি ইয়টের ককপিট ব্রিজে গিয়ে ঢুকলেন। ক্যাপ্টেন সেখানে অ্যালুমিনিয়ামে তৈরি স্টিয়ারিং হুইল ধরে বসেছিলেন। লার্গো বললেন, ঠিক আছে রওনা দাও। ক্যাপ্টেন তার পাশের অজস্র বোতামের মধ্যে স্টার্ট লেখা বোতামটি টিপে দিলেন। ইয়ট চলতে শুরু করল। স্পীডোমিটারের কাঁটা ৪০ নট-এ। বিশাল ইয়ট উজ্জ্বল নিস্তরঙ্গ সমুদ্রের পানি ছুঁয়ে যেন উড়ে চলল। এই ইয়টের নাম ডিস্কো ভোলান্তে। জলযানটির ওজন ১০০ টন এবং সর্বোচ্চ গতিবেগ ৫০ নট। এই ডিস্কোর খ্যাতিতেই লার্গো অল্পদিনের মধ্যেই এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় লক্ষপতি হয়ে উঠলেন। আর ডুবুরি ভর্তি ইয়েটে করে তার সব রহস্যময় সমুদ্রযাত্রা অনেক গরম গুজবের সৃষ্টি করল। সকলেই জানল যে, লার্গো একটা গুরুতুপূর্ণ গুপ্তধনের সন্ধা কাজ চালাচ্ছেন। জলদস্যুদের একটা গুপ্ত মানচিত্র পাওয়া গেছে। এক স্পেনদেশীয় জাহাজ অনেকদিন ধরে এখানকার সমুদ্রগর্ভে পড়ে আছে, প্রবালের আস্তরণের তলায়। লার্গো নাকি এখন অপেক্ষা করছেন তার শেয়ারহোল্ডারদের জন্য।
