বেল্টলির সামনে বাঁ দিকে কাৎ হয়ে পড়ে আছে ভওয়াগনটা। প্রায় সমস্ত ছাদ গেছে উড়ে। দূর থেকে ভেসে এল পুলিশের গাড়ির সাইরেনের আওয়াজ। বন্ড ভীড় ঠেলে দ্রুতপদে সদরদপ্তরে ফিরে চলল।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হতে বন্ডকে দুটো নিউইয়র্কগামী প্লেনের আশা ত্যাগ করতে হল। পুলিশ আগুন নিভিয়ে মানুষটার, যন্ত্রপাতির এবং বোমার খোলের যে কটা টুকরো অবশিষ্ট ছিল তা মর্গে পাঠিয়ে দিয়েছে। অবশ্য সেই মোটর সাইকেল আরোহীর কথা মনে করতে পারলেন অনেকেই। বোমা ছুঁড়েই স্রেফ উড়ে বেরিয়ে গিয়েছে বেকার স্ট্রীটের দিকে।
বন্ড কোন সাহায্য করতে পারল না। ভক্সওয়াগনের ছাদটা ছিল খুব নিচু। ফলে চালককে সে একেবারেই দেখতে পায়নি।
গুপ্তচর বিভাগ পুলিশী রিপোর্টের একটা কপি চেয়ে রাখল। M নির্দেশ দিলেন যে, সেটি যেন থান্ডারবল যুদ্ধ বিভাগে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তিনি অল্প সময়ের জন্য আবার বন্ডের সাথে দেখা করলেন।
বন্ড যখন দপ্তর থেকে বাইরে এল তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাড়ি ফিরে গোসল করে সে নিজের জিনিসপত্র একটা বড় স্যুটকেসের মধ্যে ভালো করে গুছিয়ে নিল তারপর গিয়ে ঢুকল রান্নাঘরে। খাওয়া-দাওয়া সেরে সে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল–অস্ত্রগুলো দেখে নিতে হবে।
.
মরণ আর মরণ
SPECTRE-এর দিক থেকে দেখতে গেলে প্ল্যান ওমেগা ব্লোফেল্ড যেরকমটা আশা করেছিলেন, ঠিক সেইভাবে এগিয়ে চলেছে। প্ল্যানের প্রথম থেকে তৃতীয় অংক পর্যন্ত নিখুঁতভাবে সম্পূর্ণ হয়েছে। জোসেফ পেটাশী অর্থাৎ মরহুম মিঃ জোসেফ পেটাশীকে সুচিন্তিতভাবে এ কাজের জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল। অতি অল্প যে ক জন বাছাই করা ইটালিয়ান পাইলটকে জার্মান বিমানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, এ তাদের একজন। পেটাশীর দলের বিমানগুলিতে ছিল নতুন হেক্সোজেন বিস্ফোরক ভর্তি নব-আবিষ্কৃত জার্মান প্রেশার মাইন।
সে সময় মিত্রশক্তি বাহিনী ইটালীর মেরুদণ্ড বেয়ে স্রোতের মত উঠতে শুরু করেছে। পেটাশী নিজের ভবিষ্যৎ আঁচ করতে পেরেছিল এবং চটপট কাজেও লেগে পড়ল সেই মত। একদিন যথারীতি বিমানে চেপে টহল দেওয়ার সময়, সে খুব যত্নের সাথে তার সঙ্গী পাইলট এবং নেভিগেটরের মাথার পেছনে একটি করে গুলি চালিয়ে খতম করে দিল। তারপর সেই বিরাট প্লেনকে ঠিক সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপর দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে বারি বন্দরে এনে নামাল। স্বভাবতঃই এই দুঃসাহসিক বীরত্বের জন্য পেটাশী আমেরিকান ও ব্রিটিশ উভয় পক্ষ থেকে সম্মান পদকে ভূষিত হল। এর ওপর মিত্রপক্ষকে একটা আস্ত প্রেশার মাইন উপহার দেওয়ার জন্য বিশেষ তহবিল থেকে নগদ পুরস্কার পেল ১০,০০০ পাউন্ড। NATO-র অগ্রবর্তী আক্রমণকারী বিমানবাহিনীর কাজে নির্বাচিত ছয় জন ইটালিয়ানের মধ্যে স্থান পেল পেটাশী। তার এক আশ্চর্য মোহ আছে দামী ও চটকদার সব জিনিসপত্রের ওপর। এটা তার চিরকালের অভ্যেস। সে চাইছিল বিমানবাহিনীর সংস্পর্শ থেকে অনেক দূরে সরে যেতে। এর অর্থ হচ্ছে অন্য কোন দেশে, অন্য কোন নাম। নিয়ে থাকতে হবে তাকে। কিন্তু এর জন্য তার চাই একটা পাসপোর্ট, অজস্র টাকা, আর সঠিক ব্যবস্থা। ব্যবস্থাটা হঠাৎ হয়ে গেল। সে ঠিক যে রকম বন্দোবস্তের জন্য লালায়িত ছিল তা একদিন ফন্ডা নামক একজন ইটালিয়ানের আকারে এসে উপস্থিত হল তার সামনে। ফন্ডা ছিল SPECTRE-এর তদানীন্তন ৪ নম্বর। ফন্ডার ফেলা টোপ পেটাশী। উদগ্র লালসার সাথে গিলে নিল। পুরো পরিকল্পনাটা পরীক্ষামূলকভাবে সাজানো। পেটাশীর কাজ হবে ট্রেনিং কোর্সের সময় ভিন্ডিকেটার বিমানটাতে চড়ে পড়া আর প্লেনটাকে লোপাট করে নির্দিষ্ট এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া। পেটাশীকে জানানো হল তারা কিউবার এক বিপ্লবী দল। এই কাজের বিনিময়ে পেটাশী পাবে দশলাখ ডলার। ২রা জুন রাত আটটার সময় ভিন্ডিকেটার যখন সগর্জনে রানওয়ে বেয়ে আকাশে উঠল, পেটাশীর মনের অবস্থা তখন উত্তেজিত, কিন্তু নিশ্চিন্ত। সে মনে মনে ভাবল পূর্ব-পশ্চিমের বিমানপথ থেকে উত্তর দক্ষিণ বিমান পথ ধরে বাহামার দিকে ঘুরে যাবার সময় বেশ একটু কায়দা করতে হবে। আসল কাজ হচ্ছে প্লেন ল্যান্ড করানো। সে সময় খুব শক্ত নার্ভের প্রয়োজন। কিন্তু দশ লাখ ডলারের জন্য নার্ভদের সহজেই শক্ত হতে বলা চলে। সে বায়ুর গতিবেগ ও প্লেনের উচ্চতা পরীক্ষা করল। শেষে মানচিত্র রাখবার ধাতব তাকটার দিকে পেছন করে দাঁড়াল। তার ডান হাত চলে গেল পকেটের ভেতর। স্পর্শের সাহায্যে রিলীজ ভাটা খুঁজে নিয়ে সে গুণে গুণে তিনটে প্যাঁচ ঘুরিয়ে দিল। টিউবের সরুমুখ খুলে গেল। পেটাশী আস্তে করে পকেট থেকে সেটা বের করে তাকের অজস্র লগ আর চার্টের পেছনে ফেলে দিল।
পেটাশী ফুর্তির সাথে হাসল। সে খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসল। অক্সিজেনের মুখোশটা পরে নিয়ে রেগুলেটর ঘুরিয়ে ১০০ পার্সেন্ট অক্সিজেনে তুলে দিল–রক্তের বিষটুকু তুলে ফেলার জন্য। তারপর আরাম করে বসে দেখতে লাগল। তিন-চার মিনিটের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল মর্মান্তিক সংগ্রাম একটু হাওয়ার জন্য। সহপাইলট আর ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার একসাথে তাদের টুল থেকে পড়ে গেল মুখ থুবড়ে।
পেটাশী হাতে রবারের গ্লাস্ পরে অক্সিজেনের মুখোশ মুখের ওপর জোরে চেপে ধরে এগিয়ে গেল। সায়ানাইডের টিউবটা তুলে নিল। পঁাচ ঘুরিয়ে বন্ধ করল টিউবের মুখ। তারপর মৃতদেহগুলি সরিয়ে এক শিশি কৃস্টাল ছড়িয়ে দিল। অক্সিজেনের মুখোশ পরেই কন্ট্রোলরুমে গিয়ে বসল। প্লেনটাকে ৩২,০০০ ফুটে নামিয়ে আনল, তারপর ঢুকে পড়ল। বিমানপথের মধ্যে। নিশ্চিন্ত হয়ে পেটাশী বসল পাইলটের আসনে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল ভিন্ডিকেটার আকাশে ওঠার পর চার ঘণ্টা কেটে গেছে। আমেরিকার উপকূল বোধহয় দেখা দিয়েছে। সে নিজের সিটে ফিরে এল কন্ট্রোলে হাত রেখে প্লেনটাকে মোচড় দিয়ে বাঁ দিকে ঘুরিয়ে দিল। এবার সে উড়ছে দক্ষিণ দিকে। এটা হচ্ছে শেষ পর্যায়। এবার সে প্লেনটাকে ল্যান্ড করানোর ব্যাপারে মাথা ঘামাতে শুরু করবে। সে পকেট থেকে নোটবুক বের করে নিজের অবস্থান, গতিবেগ ও রাস্তা দেখে নিল। গ্রীনউইচের সময় এখন রাত তিনটে, নাসাউ-এর সময় রাত ন টা। মেঘের পর্দার আড়াল থেকে চাঁদটা বেরিয়ে আসছে।
