সারা পৃথিবীতে আমাদের স্বপক্ষের প্রতিটি দেশের গুপ্তচর বিভাগ কাজে নেমে পড়েছে। এই কাজের নাম দেওয়া হয়েছে, অপারেশন থান্ডারবল। এরোপ্লেন, জাহাজ, সাবমেরিন, আর যে কোনও পরিমাণের টাকা–সমস্ত কিছু আমাদের প্রয়োজনের অপেক্ষায় তৈরি আছে। মন্ত্রিসভা ইতিমধ্যেই একটা বিশেষ যুদ্ধবিভাগ সৃষ্টি করছেন। প্রতিটি খুচরো সংবাদ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে এখানে। আমরা অনুমান করছি যে এর ফলে জনসাধারণের মধ্যে যথেষ্ট আতঙ্কের সৃষ্টি হবে। কিন্তু সে আতঙ্ক কেবল ঐ বোমাসুদ্ধ প্লেনটি হারাবার জন্য চিঠির রহস্য একেবারে গোপন থাকবে।
বন্ড একটা সিগারেট ধরিয়ে M-কে বলল, তার ভূমিকাটা এখানে কোথায়? M বন্ডের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাকে এই সব কথা বলে প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বাস ভঙ্গ করেছি 007। এসব কথা কাউকে না বলার কথা ছিল।
আমার মতে এ ব্যাপারের একমাত্র সূত্র হচ্ছে ঐ DEw অপারেটরের রিপোর্ট। সূত্রটা খুব নির্ভরযোগ্য নয়–অন্য কেউ এটাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি তবু আমি আপাতত এটাকে মেনে নিয়েছি।
শেষ পর্যন্ত আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে প্রথম এবং দ্বিতীয় দুটি বোমারই লক্ষ্যস্থল ইউরোপের চেয়ে আমেরিকায় হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ আমেরিকানরা এটম বোমা সম্বন্ধে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ভীতু। তাছাড়া প্রথম বোমাটির লক্ষ্যবস্তু অর্থাৎ দশ কোটি পাউন্ড মূল্যের সম্পত্তি ইউরোপের চেয়ে আমেরিকায় অনেক বেশি এবং SPECTRE এক ইউরোপীয় দল। সুতরাং ইউরোপের মধ্যে এরকম বীভৎস ধ্বংসলীলা চালাবার মতলব তাদের মাথায় নাও থাকতে পারে। মনে হয় ওরা যদি বোমা ফাটায় তবে আমেরিকাতে ফাটাতে চেষ্টা করবে। বলা বাহুল্য, এজন্য প্লেন সুদ্ধ বোমাগুলোকে আমেরিকার কাছাকাছি কোথাও পাচার করবার চেষ্টাই স্বাভাবিক। স্বভাবতঃই ওরা চাইছে, যে ওসব ফাটাফাটি না করে যত শীঘ্র সম্ভব টাকা হাতিয়ে নিয়ে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলা হোক। এটাই হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে বড় ভরসা। আমাদের হাতে সময় রয়েছে আর পৌনে সাত দিন। আমি তোমার ওপরে অনেকটা নির্ভর করছি-একথা বলে M বন্ডের দিকে ঘুরে তাকাল। যদি তোমার কিছু বলার না থাকে তাহলে রাত বারোটা পর্যন্ত প্রতিটি নিউইয়র্কগামী প্লেনে তোমার জায়গা বুক করা আছে। রওনা হয়ে পড়ো। নিউইয়র্ক থেকে BOAC-র প্লেন ধরে বাহামার দিকে পাড়ি দেবে। তোমার পরিচয় একজন ধনী যুবক, বাহামা দ্বীপপুঞ্জে মনের মত সম্পত্তি খরিদ করবার চেষ্টায় যাচ্ছ। এই ছদ্ম পরিচয়ে তুমি যে কোনও জায়গায় যত ইচ্ছে খোঁজখবর নিতে পারবে–কেউ সন্দেহ করবে না। ওখানকার রাজ্যপাল জানেন যে তুমি আসছ। তার অধীনে খুব তৈরি এক পুলিশ বাহিনী আছে। আর CIA-ও বোধহয় ভাল একজন লোককে ওখানে পাঠাবে। তার সাথে থাকবে আধুনিক বেতার যোগাযোগ যন্ত্র। তোমার পাওয়া প্রত্যেকটি তথ্য ও খুঁটিনাটি আমাকে ব্যক্তিগত ভাবে জানানো চাই।
ঠিক আছে, স্যার, বন্ড বলল এবং দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। বন্ডকে বের হতে দেখে কিছু দূরে ভক্সওয়াগন গাড়িতে বসা একজন লোক শার্টের ভিতর দিয়ে একটা লম্বা নল-ওয়ালা ০.৪৫ পিস্তল খাপ থেকে বার করল। কাউন্টলি জানতেন না, বন্ড যেখান থেকে বেরোল, সেই বিরাট বাড়িটা কিসের। তিনি সোজাসুজি শ্রাবল্যান্ডের রিসেপশনিস্টের কাছ থেকে বন্ডের বাড়ির ঠিকানা জোগাড় করেছেন। এবং ব্রাইটনের হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া মাত্র সতর্কভাবে বন্ডের পিছু নিয়েছেন। এই গাড়িটা তিনি ভাড়া করেছেন একটা ভুয়া নামের সাহায্যে। বন্ডকে শেষ করে সোজা লন্ডন এয়ারপোর্টে গিয়ে পরবর্তী ইউরোপগামী প্লেনে উঠে পড়বেন। কাউন্ট লিপ আশাবাদী মানুষ। অতি নির্মম প্রতিহিংসাপরায়ণ তিনি। তিনি বিবেচনা করে দেখেছেন যে SPECTRE যদি এই খুনের কথা জানতেও পারে তাদের অসন্তুষ্ট হওয়ার কোন কারণ নেই।
বন্ড নিজের বেন্টলিতে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। রাস্তার বিপরীত দিকে ভত্সওয়াগনের প্রায় একশ গজ পেছনে SPECTRE-এর ৬নং গগলস জোড়া চোখের ওপর নামিয়ে তার বিরাট ট্রায়াম্ফ মোটর সাইকেল স্টার্ট করে রাস্তার নেমে এলেন। অভ্যস্ত ভঙ্গিতে গাড়ির ভিড় কাটিয়ে সাব অপারেটর G, অর্থাৎ কাউন্ট লিপের গাড়ির পেছনের চাকার দশ গজের মধ্যে এসে পড়লেন সহজেই। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, সামনের বেন্টলি গাড়িতে কে আছে আর কেনই বা তাকে অনুসরণ করছে। অবশ্য তার কাজ হচ্ছে শুধু ঐ ভওয়াগনের চালককে খুন করা। ছনম্বর তাঁর কাঁধ থেকে ঝোলানো চামড়ার থলের ভেতর হাত ঢোকালেন, বার করে আনলেন একটা ভারী হাতবোমা।
সাব অপারেটর G-ও অপেক্ষা করছিলেন ভীড় হালকা হওয়ার জন্য। আস্তে আস্তে সামনের গাড়ির সংখ্যা কমে এল। বেন্টলির চালকের আসনে বসা বন্ডকে দেখা যাচ্ছে। কাউন্ট শেষ বারের মত সামনের দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে পিস্তল তুলে নিলেন। ঠিক এক চুলের জন্য কাউন্টের প্রথম গুলিটা বন্ডের চোয়ালের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। এক সহজাত প্রবৃত্তির বশেই হয়ত সজোরে ব্রেক কষে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল বন্ড। সে ভালভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে নিয়ে ঘাড় তুলল।
প্রায় সাথে সাথে গুলির শব্দের বদলে শোনা গেল এক বিস্ফোরণের আওয়াজ। হৈচৈ আর প্রবল আর্তনাদ।
