ব্লোফেল্ড বাছা বাছা সব গুপ্ত খবর পাচার করতে লাগলেন এবং তার হাতে মোটা অংকের টাকাও পোঁছতে লাগল। সমস্ত টাকাই তিনি আমেরিকান ডলারে নিতেন। নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে বোধহয় ব্লোফেন্ডের এক ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করত। প্রতিটি দেশের সাথে তার গুপ্ত কারবার চলত অন্য দুটি দেশের অজান্তে। এরকম বেশিদিন চলতে পারে না, তিনি বুঝতে পারলেন। তাঁর গুপ্তকথা ফাঁস হয়ে যেতে পারে। তার হাতে প্রচুর টাকা প্রায় দু লক্ষ ডলারের মত। টাকাগুলো গুছিয়ে নিয়ে পৃথিবীর কোন নিরাপদ প্রান্তে সরে পড়তে হবে। ব্লোফেল্ড তার পলায়ন পর্বটি খুব সুন্দরভাবে। সমাধা করলেন। তিনি তাঁর সমস্ত টাকা দিয়ে কোম্পানীর কাগজ কিনে সেগুলিকে জুরিখের একটি ভাল ব্যাংকের সেফ ডিপোজিট ভল্ট-এ স্থানান্তরিত করলেন। এই ব্যবস্থাটুকুর জন্য তার এক বন্ধুকে হাজার ডলার ঘুষ দিতে হল। তিনি দু হাজার ডলারের বিনিময়ে এক ক্যানাডিয়ান নাবিকের জাল পাসপোর্ট জোগাড় করে নৌপথে সুইডেন রওনা হয়ে। পড়লেন। সেখানে কিছুদিন বিশ্রাম করে তাঁর আসল পোলিশ পাসপোর্ট নিয়ে তুরস্কে গিয়ে পৌঁছলেন। জুরিখ থেকে তাঁর সমস্ত টাকা এনে ইস্তাম্বুলের অটোম্যান ব্যাংকে জমা করলেন, এবং পোল্যান্ডের পতনের অপেক্ষায় থাকলেন। পোল্যান্ড খুব অল্প দিনের মধ্যেই আত্মসমর্পণ করল জার্মানীর কাছে। সাথে সাথে উদ্বাস্তু হিসাবে তুরস্কের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন। কিছু টাকা হাত বদল হল এবং তিনি অনুমতি পেয়ে গেলেন।
এখানে ব্লোফেল্ড বেশ জমিয়ে বসলেন এবং শীঘ্রই Rahi, নামক একটি গুপ্তচক্রের সৃষ্টি করলেন। তাঁকে আর একটি কাজ করতে হত। যুদ্ধের গতি লক্ষ্য করে যে পক্ষের বিজয় সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হতেন, তাঁদেরই কেবল সংবাদ বিক্রি করতেন। উত্তর আফ্রিকায় রোমেলের বিরাট পরাজয়ের পর, ব্লোফেল্ড খোলাখুলিভাবে মিত্রপক্ষকে সাহায্য করতে শুরু করলেন। ফলে মহাযুদ্ধের শেষে আকাশছোঁয়া খ্যাতি-প্রতিপত্তির সাথে তার ভাগ্যে জুটল ব্রিটিশ, আমেরিকান ও ফরাসীদের কাছ থেকে অজস্র সম্মান ও বিভিন্ন উচ্চস্তরের পদক। তারপর ব্লোফেল্ড তাঁর ব্যাংকে জমানো পাঁচ লক্ষ ডলার সাথে নিয়ে একটি জাল সুইডিশ পাসপোর্টের সাহায্যে দক্ষিণ আমেরিকায় সরে পড়লেন। সেই আনন্ট স্রাভো ব্লোফেল্ড আজ প্যারিসের এক প্রাসাদের নিঃশব্দ কক্ষে কুড়িজন সহকর্মীর সামনে দাঁড়িয়ে। তার কালো চোখের গভীর। দৃষ্টিতে এক আশ্চর্য নির্লিপ্ততা আছে। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ফুটে ওঠে এক বিরাট আত্মবিশ্বাস। কারণ দীর্ঘ সংঘাতপূর্ণ জীবনে কখনো কোন বড় কাজে তিনি ব্যর্থ হননি। তিনি কখনো জীবনে মদ স্পর্শ করেননি এবং কোন মেয়ের সাথে একশয্যায় রাত্রিযাপন করেননি।
টেবিলের চারপাশ ঘিরে যে কুড়িজন ব্যক্তি ধৈর্যের সাথে ব্লোফিল্ডের কথা বলবার অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁদের সকলের দৃষ্টি কঠিন, সতর্ক ও শিকারীসুলভ। অবশ্য অন্য দুজন বৈজ্ঞানিকের চোখ স্বপ্ন ও সুদূরপ্রসারী।
আঠারজনের প্রত্যেকেই ষড়যন্ত্র ও সর্বাপেক্ষা জটিল ধরনের গুপ্ত সংবাদের আদান-প্রদানে বিশেষজ্ঞ। এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য এই যে, বহুদিন যাবত পাকা অপরাধী হওয়া সত্ত্বেও কোন দেশের পুলিশ বাহিনী অথবা ইন্টারপোলের খাতায় কারো নামে একটি আঁচড় পর্যন্ত পড়েনি। লোকের চোখে তাঁদের পরিচয় বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসাবে। তাঁরা যে গুপ্ত প্রতিষ্ঠানের সদস্য সেই প্রতিষ্ঠানের নাম SPECTRE-The Special Executive for Counter Intelligence, Terrorism, Revenge and Extortion, অর্থাৎ প্রতিগুপ্তচর বৃত্তি, সন্ত্রাসবাদ, প্রতিহিংসা ও অত্যাচারে বিশেষ কার্যনির্বাহক সংস্থা।
FIRCO নামক এক ভুয়া প্রতিষ্ঠানের আড়ালে এর কাজ চলে। SPECTRE -এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আর্নস্ট স্ত্রাভ ব্লোফেল্ড।
.
সুগন্ধি নিঃশ্বাস
ব্লোফেল্ড উপস্থিত সকলের মুখের ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন একজোড়া চোখ অস্বস্তির সাথে তার দৃষ্টিকে এড়িয়ে গেল। তিনি আস্তে করে নিজের দুটি হাত টেবিলের নিচে নামিয়ে আনলেন। একটি হাত রইল উরুর ওপর এবং অন্যটি তার পকেট থেকে বের করে আনলো একটি পাতলা সোনার টিউব। ব্লোফেল্ড টিউবের ঢাকনা খুলে একটি সুগন্ধি ট্যাবলেট বার করে মুখে পুরলেন। এটা তার এক ধরনের বাতিক। যখনই তিনি কিছু অপ্রিয় কথা বলতে যান তখনই নিজের নিঃশ্বাসকে সুগন্ধি করে নেন। ব্লোফেল্ড এবারে বলতে শুরু করলেন– আমাদের আগামী বড় কাজ অর্থাৎ Plan Omega সম্বন্ধে রিপোর্ট পেশ করবার আছে। আমাদের হিসাব মত আজ পর্যন্ত সংস্থার আয়ের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে মোটামুটি পনেরো লক্ষ্য পাউন্ড স্টার্লিং। আমাদের হিসাব অনুসারে এই উপার্জনের শতকরা দশ ভাগের কিছু অংশ সংস্থার মূলধনের সাথে যোগ করা হয়েছে এবং বাকি অংশ জমা হয়েছে বিভিন্ন খরচপত্রের জন্য। আমি নিয়েছি শতকরা দশ ভাগ এবং বাকিটা আপনাদের কুড়িজনের মধ্যে সমান করে ভাগ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যেক সদস্যের লাভের পরিমাণ প্রায় ষাট হাজার পাউন্ড।
আমার মনে হয় বছরে কুড়ি হাজার পাউন্ড মোটেই যথেষ্ট নয়। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে Plan Omega আমাদের প্রত্যেককে প্রচুর অর্থ এনে দেবে, এবং যদি আমরা ইচ্ছা করি তবে ঐ কাজটির শেষে আমাদের বর্তমান প্রতিষ্ঠান উঠিয়ে দিয়ে যে যার নিজের কাজে মন দিতে পারি। কুড়ি জোড়া চোখ একসাথে সভাপতির চোখের ওপর স্থির হল। এরা প্রত্যেকেই খুশি হয়েছেন।
