একবার গ্লাস ভর্তি করে বন্ডের দিকে এগিয়ে দিল। বন্ড গ্লাসটা হাতে নিয়ে বলল, এখন আর একটু এয়েজ হলে। মন্দ হয় না। আর, ভাল কথা, আমাকে বিয়ে করবে? আজ পর্যন্ত তোমাকেই দেখলাম একমাত্র মেয়ে যে একজন পুরুষকে ঠিকঠাক ম্যানেজ করতে পারে। প্যাট্রিশিয়া হেসে উঠে বলল, ইয়ার্কি পরে হবে, এখন শুয়ে পড় ন। দেখি, আপনার পিঠে মালিশ দরকার।
দুদিন পরের কথা। বন্ড আবার প্রাকৃতিক চিকিৎসালয়ের সেই ঝিমধরা পরিবেশে ফিরে এসেছে। বন্ডের সবচেয়ে ভাল লাগে দৈনিক চায়ের দোকানে খাওয়াটা। আজ তার কাছে তিন কাপ চা পুরো আধ বোতল শ্যাম্পেনের মতন লোভনীয় ও শক্তিদায়ক।
চিকিৎসার ফাঁকে ফাঁকে অভ্যস্ত গুপ্তচর সুলভ রীতিতে বন্ড কাউন্ট লি-এর বিভিন্ন খবর সংগ্রহ করতে লাগল। বন্ড জানতে পারল, কাউন্ট পৃথিবীর সর্বত্র ঘোরাফেরা করে। কাউন্ট লি অতি স্বাস্থ্যবান লোক কিন্তু কোমর সরু রাখার। ব্যাপারে বেশি নজর দেন। তাই প্রত্যহ টার্কিশ বাথ নেন। বন্ড শ্রাবল্যান্ড-এ তার শেষ দিনের জন্য সমস্ত প্ল্যানটি ঘড়ির কাঁটা ধরে সাজিয়ে রাখল। সেইদিন সকাল ঠিক দশটার সময় বন্ড মিঃ ওয়েন-এর সাথে দেখা করল। মিঃ ওয়েন তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ দেখে খুশি হল। বন্ড একতলায় নেমে এল শেষ মালিশ নেওয়ার জন্য। সে মালিশ নিতে নিতে তার শিকারের পায়ের আওয়াজ শোনবার জন্য কান খাড়া করে থাকল। সে একটা সপ্তাহ ধরে মালিশওয়ালাদের দৈনিক রুটিন লক্ষ্য করছিল। সে জানত এরা প্রত্যেকে লাঞ্চের ছুটির কয়েক মিনিট আগেই কাজকর্ম শেষ করে পালায়। মালিশঘর পুরো খালি। এবার শুধু কাউন্ট লি আর জেমস বন্ড। সে টার্কিশ বাথ-এর ঘরটাতে ঢুকল। বক্সের একটা দিক খুলে রোগীরা ঢোকে, তার পর সেটা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভেতরে ছাদের ফুটো দিয়ে মাথাটুকু বের করে রেখে বসবার ব্যবস্থা আছে। ট্রাকের ভেতরের দেওয়ালে সারি সারি ইলেকট্রিক বালব। এদের সবটুকু উত্তাপ গিয়ে লাগে রোগীর সর্বাঙ্গে। বন্ড খুব শান্তভাবে সুইচটা বেশ খানিকটা ঘুরিয়ে দিল। কাউন্ট টার্কিশ বাথের ভিতরে। সাংঘাতিক গরমে চিৎকার করে উঠলেন। বহু যন্ত্রের ডায়ালের দিকে একবার তাকাল, ১২০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। বন্ডের ইচ্ছা ওকে একটু ভালমত শিক্ষা দেওয়াই, খতম করা নয়। বন্ড সুইচ ঘুরিয়ে ১৮০-তে তুলে দিল। কাউন্ট লি এবার মরিয়া গলায় চিৎকার করে উঠলেন। বন্ড বলে উঠল–আমার মনে হয় এইরকম গরমে আধঘণ্টা থাকলে আপনার অনেক উপকার হবে। এতক্ষণে কাউন্টের কাছে পুরো ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর চাপা গলায় ঘৃণা ও ক্রোধ গোপন করার চেষ্টা– তোমাকে দশ হাজার পাউন্ড দেব ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেল, ঠিক আছে…পঞ্চাশ। বন্ড বাইরে বেরিয়ে দরজা বন্ধ করল তার পর দ্রুত করিডোর দিয়ে বেরিয়ে গেল। বন্ড নিজেকে সান্ত্বনা দিল–খুব খারাপ কাজ সে কিছুই করেনি।
***
জেমস্ বন্ড ঠিকই আন্দাজ করেছিল শ্রাবল্যান্ড-এর বিচিত্র পরিবেশে এই দুর্দান্ত দুই পুরুষের ছেলেমানুষি ঝগড়ার ঢেউ বন্ডের সম্পূর্ণ অজান্তে গিয়ে আঘাত করল একটা বিশাল অথচ নিখুঁত ষড়যন্ত্রে সাজানো সময়-ব্যবস্থাকে, যে ষড়যন্ত্র আর কিছুদিন পরেই সমগ্র পাশ্চাত্ত্যজগতের শক্ত ভীত ধরে নাড়া দিয়েছিল।
.
প্রেতাত্মা সংঘ
বুলেভার্ড হাউসমান হচ্ছে প্যারিসের একটি লম্বা রাস্তার নাম। রাস্তাটা যেমন লম্বা তেমনই বর্ণহীন। কিন্তু এটাই বোধহয় প্যারিসের সবচেয়ে সুগঠিত পথ। এর দুধারে বড় বড় সব সেকেলে বাড়ি। একটু এগিয়ে গেলে দেখা যাবে, একটি বিরাট বাড়ির গায়ে চক্চকে পিতলের ফলকে লেখা আছে FIRCO । কথাটি কতগুলি ফরাসী শব্দের আদ্যাক্ষর নিয়ে গঠিত। প্রাকৃতিক চিকিৎসালয় থেকে ছাড়া পাওয়ার দুদিন পরে সেদিন বন্ড মনের আনন্দে স্প্যাগেটি আর কিয়ান্তী খেল এবং প্যাট্রিশিয়ার সাথে একটি উত্তপ্ত সন্ধ্যা কাটাল, তার ঠিক আগের রাতে সাতটার সময় FIRCO -এর সব ক জন ট্রাস্টিকে এক বিশেষ জরুরী বৈঠকে ডাকা হল।
ঘড়িতে সাতটা বাজবার আগেই এই প্রতিষ্ঠানের মোট কুড়িজন বড়কর্তার সকলে চারতলার একটি নির্দিষ্ট ঘরে একত্রিত হলেন। উপস্থিত একুশজন ব্যক্তি প্রত্যেকে এক-একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা দ্বারা পরিচিত। এই সংখ্যাগুলি ১ থেকে ২১-এর মধ্যে।
পৃথিবীতে এক ধরনের মানুষ আছেন যাদের চেহারায় যেমন থাকে অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, তেমনি থাকে এক অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণীশক্তি। বর্তমান মিটিং-এর সভাপতি এই দুর্লভ জগতের মানুষ। অপরিচিত কোন লোক যদি রাস্তায় এঁকে দেখত, তাহলে তার দৃষ্টিতেও সম্ভ্রম জাগাত সন্দেহ নেই। এঁর নাম আর্নস্ট স্রাভো ব্লোফেল্ড। জন্মেছিলেন ১৯৮০ সালে পোল্যান্ডের এক প্রান্তে। এঁর বাবা পোলিশ, মা গ্রীক। বোফেল্ড ইতিমধ্যে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে একটি চমৎকার সত্য আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন যে, পৃথিবীর সব বড় বড় শক্তিধরদের শক্তির মূলে। রয়েছে দ্রুত এবং নিখুঁত সংবাদ আদান-প্রদান ব্যবস্থা। জার্মানী যখন পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে তোড়জোড় শুরু করল তখন ব্লোফেল্ড তাঁর এই ধারণাটি কাজে লাগাবেন বলে ঠিক করলেন। তার হাত দিয়ে যে সব জরুরী টেলিগ্রাম ইত্যাদি। যাওয়া-আসা করছিল, তার কাছে সেগুলোর মূল্য হয়তো কিছুই নয়, কিন্তু শত্রুপক্ষের কাছে এ খবরগুলো অমূল্য। সুতরাং তিনি পাকা হাতে এই সমস্ত চিঠিপত্রের নকল সংগ্রহ করতে লাগলেন। বিভিন্ন দূতাবাস এবং অস্ত্রাগারের বড়কর্তাদের নামে এই সব জরুরী চিঠিগুলো যেত। ব্লোফেল্ড সুকৌশলে এই সব ছোট অথচ ক্ষমতাশালী লোকদের নাম সংগ্রহ করলেন। এগুলি তাঁর পরে কাজে লাগবে। তারপর ব্লোফেন্ড তার গুপ্ত সংবাদের দু একটি নমুনা ঈষৎ বাকা রাস্তা দিয়ে জার্মান রাষ্ট্রদূতের হাতে পৌঁছে দিলেন। এগুলি পেয়ে জার্মানরা তৎক্ষণাৎ তার গুরুত্ব বুঝে ফেলল।
