বন্ড-এর মৃত্যুর পরোয়ানা জারী করেছিল যেই লোকটি-টিফানীর মৃত্যুর হুকুম দিয়েছিল যে লোকটি, সেই জ্যাক স্প্যাঙ্গ। এইমাত্র যে একটা লোককে খুন করেছে। সেই স্প্যাঙ্গড মব এর মিঃ স্প্যাঙ্গ। বন্ড যেন সব অনুমান করতে পারছিল, বিশাল লোকটি কন্ট্রোল বাগে আনার চেষ্টা করছে, ওর চোখে আতঙ্ক…লাল আতঙ্ক। সোজা ঝোঁপের পিছনে পড়বে বলে মনে হচ্ছে। আকাশের শব্দকে ছাপিয়ে করপোর্যাল চেঁচিয়ে ওঠে। গেছে, আর কোন আশা নেই। ওরা রুদ্ধনিশ্বাসে দেখতে লাগলো হেলিকপ্টারটা আকাশে শেষ ডিগবাজী খেয়ে দোলনার মত দুলতে থাকলো তারপর তীরের মত তেড়ে এল ঝোঁপের দিকে, শেষে বিশ গজ বেঁকে রোটর সমেত ক্রুদ্ধ ঝাঁপ দিল একগাদা কাঁটাঝোঁপের মধ্যে। ভেঙে পড়ার শব্দ মিলোতে না মিলোতে একটা শূন্যগর্ভ শব্দ ভেসে এল কাঁটা ঝোঁপের ভেতর থেকে, তার সাথে ধ ধ করে আগুনের গোলা হাওয়া পেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। চাঁদকে যেন ম্লান করে সেই আগুন সমস্ত প্রান্তর ব্যেপে এক গোলাপী আভা ছড়িয়ে দিল। ক্যাপ্টেন হাতের দূরবীন নামিয়ে রাখল তারপর বন্ডকে বলল, তাহলে স্যার এদিকে তো চুকল। মনে হচ্ছে না, কাল সকালের আগে আমরা ওই জায়গার কাছাকাছি পৌঁছতে পারবো। এতে আবার ফরাসী সীমান্ত রক্ষীরাও এসে পড়েছে। সৌভাগ্যবশত ওদের সাথে আমাদের সম্পর্কটা ভালই।
অফিসারটি যেন তার চোখের সামনে স্তূপীকৃত নথিপত্র দেখতে পায়। তখনি সে যথেষ্ট ক্লান্ত ছিল কিন্তু ওই সম্ভাবনা যেন তাকে আরো ক্লান্ত করে তোলে। অফিসারটি অদ্ভুতভাবে তাকাল বন্ড-এর দিকে। প্রায় নীরব, প্রায় প্রহেলিকার মত ওই লোকটি হঠাৎ এসে উপস্থিত হয়েছে এখানে। তাদের আগে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে এর যা কিছু কাজ সব যেন সর্বাগ্রে বিবেচিত হয়।
বন্ড আস্তে আস্তে ট্রিগারের পাদানি থেকে তার পা সরিয়ে নেয় এবং সেই লোহার দিকে ঠেস দিয়ে বসে। চোখ তার দূরে লাফিয়ে ওঠা আগুনের দিকে, হাতটা আপনা আপনি বিবর্ণ খাকি বুশ শার্টের পকেটে চলে যায়। সিগারেট বের করে ধরায়।
তাহলে হীরের চোরাপথের এইখানেই সব শেষ। এখন কেবল ফাইলের শেষ পাতাটি লেখা বাকি। আগুনের টকটকে লাল আভায় বন্ড-এর শক্ত পাতলা মুখ লালচে দেখায়। তার ক্লান্ত চোখের তারায় যেন সেই আগুনের ফুলকি নেচে ওঠে।
তাহলে স্প্যাঙ্গলড মব-এর এখানেই ইতি। তাদের হীরচুরির দুরন্ত কারবারেরও ইতি। কিন্তু যে হীরেগুলো এখন আগুনের আঁচে সিদ্ধ হচ্ছে তার তো মৃত্যু নেই। হীরের ক্ষয় নেই, মৃত্যুর মত শাশ্বত। বন্ড ট্রাক থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ে আগুনের দিকে হাঁটতে থাকে আস্তে আস্তে। আপন মনে হেসে ওঠে; সে হাসি বড় বিষণ্ণ, বিমর্ষ। এসব মৃত্যু এবং হীরেরই গাম্ভীর্য আছে, মর্যাদা আছে। অথচ বন্ডের কাছে শুধুমাত্র আরেকটা অ্যাডভেঞ্চারের শেষ বই ছাড়া তো আর কিছু নয়। আরেক অ্যাডভেঞ্চার যাতে টিফানী কেসের একটা অপ্রিয় কথাকে বাঁধিয়ে রাখা যায়। বন্ড যেন চোখের সামনে দেখতে পেল টিফানীর সেই আকর্ষণীয় মুখ, মুখে বিদ্রূপ। সে বলছে? ঘটনার চেয়ে রটনা শুনতে অনেক ভাল।
থান্ডারবল
থান্ডারবল
জেমস বন্ডের জীবনে মাঝে মাঝে এমন একটা সময় আসে যখন তার কাছে সবকিছুই একেবারে অর্থহীন বলে মনে হয়। আজ ছিল সেই রকমই একটা খারাপ দিন।
প্রথমত, সে নিজের কাছে নিজেই খুব লজ্জা পাচ্ছিল। শরীর তার দারুণ খারাপ লাগছিল। সেই সাথে আবার মাথাব্যথা আর দেহের গাঁটে গাঁটে যন্ত্রণা। খুব বেশি সিগারেট আর মদ খাওয়ার ফলে কাশির সাথে সাথে তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল ধোয়ার মত একগাদা কালো কালো ফুটকি। গত রাতে সেই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে এগারো নম্বর গেলাস শেষ করার পর স্বভাবতঃই বন্ড নিজের মস্তিষ্কের করুণ অবস্থাটা আন্দাজ করতে পেরেছিল। তা সত্ত্বেও সে রাজী হয়ে গেল, আর এক বাজি তাস খেলতে–একশো পাউন্ড পাঁচ পাউন্ড হিসেবে! এর ওপর আবার মদের ঝোঁকে শেষ দানটায় রি-ডাবল দিয়ে দিল, আর খেলল একটা গাধার মত।
নিজের ফ্ল্যাটে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গালের কাটাটায় ওষুধ লাগাচ্ছিল বন্ড। আয়নার নিজের বিষণ্ণ চেহারা দেখে তার নিজেকে ঘেন্না করতে ইচ্ছে হল। এসব কিছুর আসল কারণ হল এই যে, বন্ডকে গত এক মাস ধরে স্রেফ অফিসে বসে কলম পেশার কাজ করতে হচ্ছে। তার ওপর তার সেক্রেটারী পড়ল জ্বরে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। বন্ড ওষুধের বড়ি দুটো গিলে ফেলল। এমন সময় শোবার ঘরের টেলিফোনটা হঠাৎ দারুণ জোরে বাজতে শুরু করল।
***
জেমস বন্ড লন্ডনের রাস্তা ধরে ঝড়ের বেগে গাড়ি চালিয়ে সদর দপ্তরে এসে পৌছোল। লিফটে উঠে নতলায় গিয়ে উপস্থিত হল, গুপ্তচর বিভাগের বড় কর্তার সামনে। অফিসে সবাই যাকে M বলে জানে।–সুপ্রভাত, জেমস্। এত সকালে তোমাকে ডেকে আনলাম বলে কিছু মনে করো না। M-এর গলা অন্তরঙ্গ ও সদয় শোনাচ্ছে–বড় কোন উত্তেজক খবর জানাবার সময়ের মত উত্তেজিত নয় মোটেই। বন্ড খুব সন্দিগ্ধভাবে আন্দাজ করতে চেষ্টা করল যে কাজটা কি হতে পারে।
M ডেস্ক থেকে একটা কাগজ তুলে নিয়ে পড়তে পড়তে জানতে চাইল বন্ড কেমন আছে? বন্ড নিজের অধীরতাকে চাপা দিয়ে বলল, আমি একেবারেই ভাল আছি। মাথাব্যথা তো সকলেরই হয়ে থাকে মাঝেসাঝে। অল্পস্বল্প অসুস্থতাও। গোটাদুয়েক অ্যাসপিরিন খেয়ে নিলেই আবার সব ঠিকঠাক। M খুব রাগতস্বরে বললেন, খুব ভুল করেছ জেম্স। ওষুধ অসুস্থতার লক্ষণগুলো চাপা দিতে পারে, কিন্তু সারাতে পারে না। এই সব চাপাচুপির ফলে অসুখ হয়ে। ওঠে মারাত্মক। M অধীরভাবে বলল, হতে পারে হয়তো তুমি রুটি বেশি খাও না কিন্তু ভাল ভাল খাবার যেমন কাঁচা সজি, বাদাম, ফল, দই ইত্যাদি অবশ্যই খাওয়া দরকার। M একটা ট্রে সামনে টেনে নিয়ে বোধহয় ইঙ্গিত করলেন যে, আর বিশেষ কিছু বলার নেই। মিস মানিপেনী তোমার রিজার্ভেশন করে রেখেছে। দু সপ্তাহেই তুমি শ্রাভল্যান্ডে ভাল প্রাকৃতিক চিকিৎসালয়ে গিয়ে একেবারে সেরে আসবে। জোশুয়া ওয়েন ওখানে একটা প্রাকৃতিক চিকিৎসালয় পরিচালনা করেন। ভদ্রলোক এ লাইনে বেশ বিখ্যাত। চমৎকার মানুষ। তিনি তোমাকে দেখাশোনা করবেন। আর তোমার কাজকর্মের কথা একেবারে ভুলে যাও। 007-কে আমি সে সব দেখার ভার দিয়েছি।
