গভীর বিতৃষ্ণায় ও চোখ ফেরায়। কেবিনে যেন ঝড় বয়ে গেছে।
সাবধানে বাথরুমের কাছে গিয়ে ডাকে, টিফানী, দরজা খোলো, আমি বন্ড। টিফানী কানের ওপর হাত চাপা দিয়ে শুকনো বাথটাবে উপুড় হয়ে পড়েছিল। বন্ড ওকে টেনে তুলে জড়িয়ে ধরবার পরও ও যেন বিশ্বাস করতে পারে না। বন্ডের পাঁজরের ক্ষতে টিফানীর হাত লাগতেই বন্ড শিউরে ওঠে ব্যথায়। টিফানি ওর হাত ছাড়িয়ে সরে যায়। বন্ডের শার্টে রক্ত লেগে আছে। টিফানী সব আতঙ্ক ভুলে যায় নিমেষে। বন্ডের শার্ট খুলে ফেলে সাবান দিয়ে পাঁজরার কাটা জায়গাটা ধোয়।
উজ্জ্বল দৃষ্টিতে বন্ডের দিকে চেয়ে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। বন্ড যখন ওর ঠোঁটে চুমু খায় তখনো ও কোন কথা বলে না। বন্ড মাথা ঠাণ্ডা করে সব কিছু ভেবে নেয়। প্রথমেই ও ওর রক্তমাখা শার্টটার সাথে একটা অ্যাশট্রে বাঁধে। তারপর যতদূরে পারে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। লোক দুটোর পোশক দরজার পেছনে ঝুলছে। তার বুক পকেট থেকে দুটো রুমাল বের করে নিয়ে নিজের দু হাতে জড়ায়। তারপর দেরাজ হাটকে সাদা চুল লোকটার ইভিনিং-শার্ট বের করে। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে মোটা লোকটাকে তুলে বসায়, ওর শার্ট খুলে নেয়। শার্টের বুকের ওপর গুলির ফুটোটার ওপর চেপে ধরে একই জায়গায় আর একটা গুলি ছোড়ে। এখন আগের ফুটোর চারিদিক ঘিরে বারুদের ধোঁয়ার দাগ পড়ে। যেন দেখেই মনে হয় আত্মহত্যা করেছে লোকটা। লাশটাকে আবার পরীক্ষা করে বন্ড। লোকটার ডান হাতটা বেরেটার ওপর ভাল করে চেপে ধরে। তারপর, বন্দুকটা ওর হাতে গুঁজে দেয়, তর্জনীটা ট্রিগারের ওপর থাকে। আরও একটু ভেবে নিয়ে পোশাকটা হুক থেকে নামিয়ে কিডের লাশের গায়ে পরায়। তারপর লাশটা টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে পোর্টহোল দিয়ে ফেলে দেয়। টেবিলের ওপর কিছু তাস ছড়িয়েছিল, টেবিলটা উল্টে ফেলে দেয় তারপর ছড়ানো। তাসগুলোর ওপর একটা টাকার বান্ডিল লোকটির পকেট থেকে বের করে রেখে দেয়। এবার নিশ্চয় বোঝা যাবে ঘটনাটা কি। বউ ভেবে দেখল পুলিশ যতক্ষণ না এসে পৌঁচচ্ছে, ততক্ষণে সবাই যদি ভাবে ঘটনাটা এই তাহলেই যথেষ্ট। পুলিশ যখন আসবে তখন বন্ড আর টিফানী তো হাওয়া হয়ে গেছে। ঘরে বন্ডের বেরেটটা পাওয়া যাবে অবশ্য। কিন্তু গুপ্তচরদের ব্যবহৃত অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্রের মত এই বেরেটটাতেও কোন নম্বর নেই। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বন্ড কাঁধটা ঝাঁকালো। এখন চাদর দুটো নিতে হবে। সকলের অজান্তে টিফানীকে নিয়ে কেবিনে ফিরতে হবে। ওর পোর্টহোল থেকে যে চাদর ঝুলছে তা সমুদ্রে ফেলে দিতে হবে। তারপর টিফানীকে চিরদিনের মত জড়িয়ে ধরে যুগ যুগ ধরে ঘুমোতে হবে।
চিরদিনের মত!
কেবিন পেরিয়ে বাথরুমের দিকে যেতে যেতে মৃত মানুষটির চোখে চোখ পড়ল বন্ডের। তার চোখ দুটি যেন কথা কয়ে উঠলো। যেন বলতে চাইল, এই পৃথিবীতে কিছুই শাশ্বত নয়, একমাত্র মৃত্যু ছাড়া।
.
চোরাপথ বন্ধ হল
খনির সেই স্মাগলার লোকটি কাঁটাঝোপে লুকিয়ে বসে থাকতে থাকতে ক্রমে অধীর হয়ে পড়ে। সে স্থির করে ফেলে যে এই শেষ, ওদের সাথে আর দেখা সাক্ষাৎ নয়। তবে আগে থেকে হুঁশিয়ার করে দেবে যে, ও ছেড়ে দিচ্ছে। এবং এর কারণও সে বাতলাবে। স্মাগলার লোকটি নড়ে চড়ে বসে। প্লেনটা এখনো আসছে না কেন? একমুঠো ধুলোবালি তুলে নিয়ে সার সার পিঁপড়ের মাঝখানে ছুঁড়ে মারে। সার ভেঙে যাওয়াতে পিঁপড়েদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। কালো শয়তান! লোকটি তার নিজের আফ্রিকান ভাষায় গালাগালি করে। যেখানে যত কালো তার প্রতি লোকটির প্রবল ঘৃণা; সে কথা সে ভুলে যায়। উত্তর দিকে তার মাথাটা ঘুরে যায়। যা তাড়াতাড়ি সে ঝোঁপের ভেতর গিয়ে ঢোকে, টর্চগুলো আর হীরের মোড়রুটা যন্ত্রপাতির বাক্স থেকে নিয়ে আসতে। একমাইল দূরে নিচু ঝোঁপের তলায় সাউন্ড ডিটেকটরের প্রকাণ্ড লৌহ-কণ্ঠ ততক্ষণে সব খোঁজাখুজির শেষ করেছে। আমি স্টাফের পাশে তিনজনের একটি দল।
বন্ড হাতের ঘড়িটা দেখে। মনে হচ্ছে মাঝরাতে পূর্ণিমার চাঁদের দেদার আলোয় ওদের অভিসার এবং চালাচালি চলে।
আজ কিন্তু দশ মিনিট দেরি হয়ে যাবে লোকটার, বন্ড বলে।
তাই তো মনে হচ্ছে স্যার। ফ্রী টাউন গ্যারিসন ফোর্স-এর অফিসার লোকটি বলে। সে বন্ডের পাশেই দাঁড়িয়েছিল। তৃতীয় লোকটি হচ্ছে করপোর্যাল।
ট্রাকটা দাঁড়িয়ে ছিল নিচু ঝোঁপের তলায় লুকিয়ে। কাঁচা রাস্তার ওপরেই আলো ছাড়া নিঃসাড়ে গাড়ি চালিয়ে এসেছে তারা। ট্রাকের ওপর দিয়ে, সন্ধানী যন্ত্র আর বোফরস-এর ওপর দিয়ে ওরা এক ছদ্ম জাল খাঁটিয়ে রেখেছে। তখন থেকে ওরা অপেক্ষা করছে। কিন্তু এই মোটর সাইকেলের অভিসারে সাড়া দিতে কে আসবে ওরা জানে না। হেলিকপ্টার। এ ছাড়া অবশ্য এই কারবার আর কিছুতে সম্ভব নয়।
বন্ড বলে, নামবার সাথে সাথে জালটা গুটিয়ে ফেলতে হবে। আমাদের স্পীকারটায় সুইচ দেওয়া আছে তো? হ্যাঁ স্যার, সন্ধানী-যন্ত্র থেকে করপোর্যাল জানায়। লোকটি এসে পড়েছে।
বন্ড চারটে পাতলা আলোর ফলা দেখল। ওদের দলের শেষ অথচ প্রথম ব্যক্তিটি তাহলে আসছে। হ্যাটন গার্ডেন এ বন্ড প্রথম তাকে একবার দেখেছিল। এক ওকেই এখনো মারতে কিংবা মরমর করে ফেলতে হয়নি বন্ডকে। তবে আর একজনও বাদ গেছে সেডী ট্রী। বন্ড যদিও কাউকে মারতে চায়নি। এম. তাকে যে কাজের ভার দিয়েছিলেন তাতে শুধু ওদের খুঁজে বের করার কথা ছিল। ওদের অস্ত্র ছিল হিংসা এবং নিষ্ঠুরতা। লা-ভেগাসে শেভ্রলে থেকে সেই দুটো লোক তাকে গুলি ছোঁড়ে এবং শেষ পর্যন্ত এরনি কিউরিয়কে আহত করে। মারামারি করতে এসে তারাই আগে বন্দুক বের করেছিল। অত্যাচারের পর অত্যাচার চালিয়ে সেরাফিমো স্প্যাঙ্গ প্রথমে তাকে মৃত্যুর মুখে পাঠাতে চেয়েছিল, তারপর রেললাইনের ওপর তাদের হয় গুলি করে, নয় ট্রেনের সাথে পিষে মারতে চেয়েছিল। উইন্ট আর কিড প্রথমে টিংগালিং বেলকে সেই ভয়ংকর দাওয়াই দেয় তারপর তাকে আর টিফানী কেসকে। ওদের সাতজনের মধ্যে বন্ড মেরেছে পাঁচজনকে মেরেছে, মারতে তার ভাল লেগেছে বলে নয়। কাউকে না কাউকে মরতে হতো। তার বরাত আর বন্ধুভাগ্য ভালো তাই ফেলিক্স রেনি আর টিফানীর মত বন্ধু পেয়েছে কপালজোরে। এবং সেই ভয়ংকর খারাপ লোকটা মারাই গেছে শেষ পর্যন্ত। আর এই আসছে খারাপদের শেষ খারাপ লোক। এমে-এর কথা অনুযায়ী, যে লোক হীরে চুরির এই গোপন কারবার ফেঁদেছে, বিশাল চোরাপথ সংগঠিত করে রেখেছে, এবং বছরের পর বছর নির্মম দক্ষতার সাথে সেটা চালিয়ে এসেছে, বিমান দপ্তরের লাউঞ্জে এমে-এর সাথে তার কথাবার্তা হয়।
