সিনেমার রিলের মত বন্ডের মনের পর্দায় তরতর করে ভেসে চলে। অ্যাটাসিকেস খুলে গোপন জায়গা থেকে সাইলেন্সর বের করে। বন্দুকের সাথে এটা আটকে ফেলে। কি কি বিপদ হতে পারে তা আগাম ভেবে নেয়।
এ-ফর্টিনাইন, ওর কামরার ঠিক নিচের কেবিন। ওরা নিশ্চয় দরজায় খিল তুলে তালা বন্ধ করে দিয়েছে। বন্ড কোমরে বন্দুকটা গোঁজে, টেনে-হিঁচড়ে পোর্টহোলের একটা খোলে। নিচে গোল দুটো ফোকর দিয়ে মিটমিটে আলো আসছে। শান্ত, চুপচাপ রাত। বাতাস বইছে না একটুও।
বন্ড মাথা ঢুকিয়ে নেয়। বিছানার চাদর নিয়ে আধখানা করে গিট বাঁধতে থাকে। বন্ড যদি জেতে, তাহলে এ-ফর্টি নাইন থেকে ক টা চাদর নিয়ে নিতে হবে।
সমস্ত শক্তি দিয়ে বন্ড দড়িটায় গেরো দেয়। মনে হয় মজবুত হয়েছে। পোর্টহোলের এদিকে দড়ির একটা মুড়ো বাঁধতে বাঁধতে ও ঘড়ি দেখে নেয়। তারটা পাওয়ার পর মাত্র বারো মিনিট কেটেছে। বারো মিনিট কি বড় বেশি সময়? দাঁতে দাঁত চেপে, জাহাজের পাশ দিয়ে ও দড়িটা ঝুলিয়ে দেয়। তারপর নামতে থাকে। আস্তে, শক্ত করে ধর…।
রাতের বাতাস ওকে টানছে, দোলাচ্ছে। অনেক অনেক নিচে সমুদ্রের কল্লোল ভেসে চলেছে। বন্ড ভাবনা চিন্তাগুলোকে মন থেকে সরিয়ে দেয়। ওর লক্ষ্য এখন শুধু ওর হাত দুটো। পা দুটো নিচে পোর্টহোলে একটু দাঁড়াবার জায়গা খুঁজে পায়ে। কাপড়ের মত কি লাগল যে? আর একটু নামে বন্ড। এখন ওর মুখ পোর্টহোলের সাথে সমান্তরাল। হাতের পেশী যেন ছিঁড়ে যাচ্ছিল। এখন ও একহাতে বন্দুক ধরে ঘরের ভিতর লাফিয়ে পড়ার জন্য তৈরি হয়।
কান পেতে শোনে ও। গোল পোর্টহোলের পর্দা দুলছে। বন্ড যে কুইন এলিজাবেথ -এর মাঝামাঝি জায়গায় মাছির মত লেপ্টে ঝুলছে তা মনে করতে চায় না। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ও বুকের তোলপাড়কে শাসনে আনতে চায়।
ঘরে কে যেন বিড়বিড় করে। একটি পুরুষকণ্ঠ। তারপর নারী-কণ্ঠে আর্তনাদ, না!
মুহূর্তের নীরবতা, চড় মারার আওয়াজ। পিস্তলে গুলি ছোঁড়ার মত জোর আওয়াজ। বন্ডের শরীরটা ঝাঁকুনি খেয়ে দুলে ওঠে।
বন্ড তার মাথাটা বাঁকিয়ে তিন ফুট চওড়া গোল ফোকরটার ভেতর দিয়ে ঘরের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারপর নিচু হয়ে পিঠ বাঁচিয়ে পোর্টহোলের দিকেই পিছুতে থাকে। অসম্ভব উত্তেজনায়, যে হাতে বন্দুক, সে হাতের আঙুলের গাঁটগুলো সাদা দেখায়। ওর ধূসর চোখ দুটো এদিক-ওদিক ঘোরে। কালো পিস্তলটা দুটো লোকের ঠিক মাঝামাঝি জায়গাটা টিপ করে থাকে।
মোটা লোকটা বলে, তোমাকে কে ডেকে পাঠিয়েছে? তাসে বারো নম্বর খেলোয়াড় হতে এসেছ নাকি? লোকটার চোখ দুটো চকচক করছে। ওর সামনে বন্ডের দিকে পেছন ফিরে একটা টুলে বসে আছে টিফানী কেস। ওর পরনে শুধু খাটো প্যান্ট। হাঁটু দুটো ওই পেল্লায় লোকটার উরুর ভেতরে বন্দী। ওর মুখটা বন্ডের দিকে ফেরানো। ফ্যাকাশে মুখে লাল লাল দাগ, অসহায় চাহনি।
লোকটি এতক্ষণ বিছানায় পড়ে ছিল, এখন তার একটা হাত শার্টের বগলের দিকে চলে যায় যেখানে পিস্তল আছে। বন্ডের দিকে ও নিস্পৃহ চোখে তাকায়; কোন কৌতূহল নেই চোখে। লোকটির হাসি হাসি মুখ থেকে একটা দাঁত হড়কে বেরিয়ে থাকে। ঠিক যেন সাপের জিভের মত।
বন্ডের পিস্তলের নল দুটো লোকের মাঝখানে টিপ করা।
বন্ড খুব আস্তে আস্তে বলে, টিফানী মাথা নিচু করে ঘরের মাঝখানে চলে এস। টিফানী উঠে দাঁড়িয়ে বন্ডের দিকে তাকায়। বন্ড লক্ষ্য করে, টিফানীর সাদা চামড়ার ওপর একটা হাতের পাঞ্জার লাল দাগ ফুটে উঠেছে। তারপর টিফানী ওর কথা মত কাজ করে। বাথরুমের দরজা বন্ধ হবার শব্দ হয়। দুটো লোকের মাঝে তফাৎ ঠিক পাঁচ গজের। ফর্টি এইট-সিক্সটি ফাইভ-এইটি সিক্স!
শব্দগুলো আমেরিকান ফুটবল খেলায় বলা হয়। এই শব্দগুলো মোটা লোকটার মুখ থেকে ঠিকড়ে বের হয়। সাথে সাথে লোকটা মেঝেতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, ওর হাত চলে যায় কোমরবন্ধের দিকে।
বিদ্যুৎগতিতে অন্য লোকটা বিছানা থেকে নেমে পড়ে। বুকের কাছে হাতটা চমকে ওঠে ওর।
থাড।
বন্ডের পিস্তলে একটা চাপা আওয়াজ। সাদা চুলের নিচে কপালের ঠিক মাঝখানে একটা নীল ছোট্ট ফুটো। অন্তিম আক্ষেপে মৃত লোকটির আঙুলগুলো চেপে বসে। বু! ওর বন্দুকের আওয়াজ হয়। গুলিটা ওরই বিছানায় বিধে যায়। মোটা লোকটা মেঝেয় বসে আর্তনাদ করে ওঠে। বন্দুকটা যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে লোকটার ওপর এতটুকু দরদ নেই ওর। বভের শরীর শিকারী বেড়ালের মত উত্তেজনায় টানটান। বন্ডের মুখোমুখি দাঁড়ায় লোকটা। ওর হাত দুটো এখন দু পাশে ঝুলতে থাকে। হঠাৎ ডান হাতটা শক্ত টানটান হয়, সামনে ছোঁ মারে। আঙুলের ফাঁক থেকে ছুরিটা সাদা। আগুনের মত ঝলসে ওঠে।
থাড!
বুলেটটা আর ছুরিটা একই সাথে ছুটে যায়। দুটো যখন বিধে যায় তখন দুজনের চোখই চমকে ওঠে। তারপর মোটা লোকটার চোখের তারা উলটে যায়, ওপর দিকে। বন্ড দেখে ওর শার্টের ওপর রক্তের দাগটা বড় হচ্ছে। চুরিটার বাট ওর শার্টের ভাজে বিধে আলগা হয়ে ঝুলছে শুধু। মোটা লোকটা চেয়ার সমেত আছড়ে পড়ে মাটিতে। বন্ড একবার ওর দিকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। ধীরে ধীরে বন্ডের শরীর, স্নায়ু থেকে উত্তেজনা নেমে যেতে থাকে। কিছুক্ষণ পর ও শার্ট থেকে ছুরিটা তুলে নেয়। পর্দা সরিয়ে বাইরের অন্ধকারে ফেলে দেয় ছুরি।
