লিটার আশি মাইল বেগে অন্তহীন, ঝকঝকে উজ্জ্বল পথ পাড়ি দিতে গাড়ি উড়িয়ে নিয়ে চললো।
সন্ধ্যায় ওরা বেভারলি হিল্স হোটেলের আবছা অন্ধকার ঠাণ্ডা বার-এ গিয়ে বসল। টেবিলে, ওদের মার্টিনির গ্লাসের পাশেই টেলিফোন, রিসিভার নামিয়ে রেখে বলল, যাক, সব ঠিক হয়ে গেছে। আমার বন্ধুরা তোমাদের এলিজাবেথ জাহাজে সিট করে দিয়েছে। আগামীকাল রাত আটটায় জাহাজ ছাড়বে। ওয়াশিংটন থেকে টিফানীর পাসপোর্ট পাওয়া । গেছে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটা লোক এয়ারপোের্ট থাকবে। তোমাদের দুজনকেই কয়েকটা ফর্মে সই করতে হবে।
দুপুরের খবরের কাগজে বিরাট হেড লাইনে খবরটা বেরিয়েছে, পোছড়া শহর পশ্চিমে অস্ত গেল। পুলিশের দল বন্ডকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, স্প্যাঙ্গ-এর দলও আছে। দশ হাজার ডলার মাথার দাম ধরা হয়েছে।
লীটার ঘড়ি দেখে বললো, এবার আমাদের রওনা হতে হবে। আমাকে আজ রাতেই ভেগাস যেতে হবে। শাই স্মাইলের কঙ্কালটা খুঁজে বের করা দরকার। লিটারই ওদের অ্যালোডড্রামে পৌঁছে দিল। টিফানী কেস লিটারকে বুকে জড়িয়ে ধরার পর রোগা, লম্বা মানুষটা যখন খাড়াতে-খোঁড়াতে চলে গেল, বন্ডের গলার কাছটায় তখন যেন ডেলা পাকিয়ে উঠল।
অন্ধকার মহাদেশের ওপর দিয়ে নতুন সুপার-জি কনস্টেলেশান উড়ে চলে। বন্ড বাঙ্কের সুখশয্যায় শুয়ে শুয়ে ঘুমের আরাধনা করে আর টিফানীর কথা ভাবে। বন্ড বুঝতে পারে ও প্রেমে পড়ে গেছে টিফানীর। বছরের-পর-বছরের নিঃসঙ্গতা আর বিচ্ছিন্নতার কঠিন খোলশ ভেঙে ফেলে টিফানী কি বেরোতে পারবে? একবার যদি বন্ড টিফানীর হাত ধরে আর হয়তো ছাড়তে পারবে না। জোর করে বন্ড অবাধ্য চিন্তাটা মন থেকে সরিয়ে দিল। ও এম-এর কথা, নিজের কাজ–যা তাকে শেষ করতেই হবে, তার কথা ভাবতে লাগল। কাজ আগে পরে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে চিন্তা। বন্ড ভেবে দেখল এখন জ্যাক স্প্যাঙ্গ আর এ-বি-সি হচ্ছে ওর লক্ষ্য।
চোরাপথের গোড়াটা রয়েছে আফ্রিকায়। এ-বি-সির মাধ্যমে আফ্রিকায় পৌঁছতে হবে। বন্ড ভাবে এখন ওর আসন্ন। কর্তব্য হচ্ছে, এলিজাবেথে উঠেই এম-কে সব খবর দেওয়া। তারপর লন্ডন সব ভার নেবে।
ভ্যালান্স-এর লোকেরা কাজ শুরু করবে এরপর। ফিরে যাবার পর বন্ড-এর বিশেষ কিছু করার থাকবে না, অবশ্য গাদা গাদা রিপোর্ট লিখতে হবে। কিংস রোডের কাছে বাড়তি ঘরটায় থাকবে টিফানী। সন্ধ্যায় তার কাছে ফেরা যাবে।
লস এঞ্জেলস ছাড়বার ঠিক দশ ঘণ্টা পর ওদের প্লেন লা গার্ডিয়ার ওপর দিয়ে উড়ে সমুদ্র পেরিয়ে নামলো।
রবিবারের সকাল আটটায় এয়ারপোর্টে তেমন লোজন নেই। একজন অফিসার ওদের থামিয়ে, পাশের একটা গেটে নিয়ে গেল। সেখানে পিঙ্কারটন আর স্টেট ডিপার্টমেন্ট, দু জায়গার দুটো যুবক অপেক্ষা করছিল। পিঙ্কারটনদের লোকটি অ্যাপার্টমেন্টে ওদের কয়েকটি অলস প্রহর কাটে। জেমস বন্ড যেই জাহাজে ওঠে ঠিক সেই সময় অ্যানাসটাসিয়া জাহাজের এক খালাসী কাস্টমস অফিসের একটা টেলিফোন বুথের দিকে দ্রুত এগিয়ে যায়।
তিন ঘণ্টা পরে একটা কালো সেডান দুজন আমেরিকান ব্যবসায়ীকে নামিয়ে দেয় ডেকের সামনে। ওরা কোনমতে ইমিগ্রেশন আর কাস্টমসের হাঙ্গামা সামলে জাহাজে ওঠে।
ব্যবসায়ীদের একজন ছোকরাগোছের হাতের ব্রিফকেসের ওপর লেখা বি কিটেরিজ। অন্য লোকটি ভীষণ ঘামছে। তার স্যুটকেসের গায়ে লেখা–ডবলিউ, উইন্টার।
.
সখী, ভালবাসা কারে কয়?
ঠিক আটটায় কুইন এলিজাবেথের গমগমে সাইরেনের বিপুল শব্দে নিউইয়র্কের আকাশ-ছোঁয়া বাড়িগুলোর কাঁচ কেঁপে উঠল ঝনঝন করে। ঘণ্টায় পাঁচ মাইল বেগে এলিজাবেথ নদীর মোহনার দিকে চলল। কেবিনে বসে বন্ড জাহাজের দোলানিতে কানে ক্যাচক্যাচ শব্দ শুনতে লাগল। তারপর টেলিফোন তুলে মিস কেসের খোঁজ করল। রিসিভার নামিয়ে রেখে ও স্টুয়ার্ডকে ডেকে ডিনার আনতে বলে তারপর রিপোর্ট লিখতে বসে। আজ রাতেই রিপোর্টটাকে সাংকেতিক ভাষায় রূপান্তরিত করে লন্ডনে পাঠাতে হবে।
জাহাজটা অন্ধকারে গা ভাসিয়ে চলেছে। ওদিকে ডিউটি অপারেটর রেডিওতে খবর পাঠাতে থাকে পোর্টিস হেডে। ইস্টার্ন স্ট্যান্ডার্ড টাইম ঠিক দশটায় একটা খবর পায়, এ-বি-সি. co হাউস অফ ডায়মন্ডস, হ্যাটন গার্ডেন, লন্ডন পার্টির পাত্তা মিলেছে। প্রয়োজন হলে জরুরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কি দাম পাওয়া যাবে ডলারের হিসাব জানাও।–উইন্টার।
তিনদিন কেটে যাবার পর বন্ড ও টিফানী অবজারভেশান লাউঞ্জে ককটেল আর ভেরান্ডা গ্রীলে ডিনার খাওয়া স্থির করে। দুপুরবেলা আবহাওয়া বেশ শান্ত, ককটেল বারের কোণের এক টেবিলে বসে টিফানী বন্ডকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি কাজ কর? কে তোমার মনিব? বন্ড বলে, আমি গভর্নমেন্টের হয়ে কাজ করি। গভর্নমেন্ট হীরের চোরাই চালান বন্ধ করতে চায়।
তুমি কি বিবাহিত?
না মাঝে মাঝে হয়তো ভালবেসে ফেলি কাউকে। তাছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিয়ে দুটো জীবনকে যোগ করে না, বরঞ্চ এটা থেকে ওটাকে বিয়োগ করে ফেলে। টিফানী একটু ভেবে দেখে। জেমস বন্ড হাত বাড়িয়ে ওর হাত চেপে ধরে। ও টিফানীর কথা জানতে চায়। টিফানী তার অতীতের কথা বন্ডকে শোনাতে থাকে। সে বলে, সব মেয়েই বাড়ি ফিরে হলের টেবিলে স্বামীর টুপিটা দেখতে চায়। আমার মুশকিল হল, টুপি পরবার ঠিক মানুষটি আমি কখনো খুঁজে পাইনি। একা একা থেকে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। পুরুষ মানুষের শার্ট না থাকলে কাপড় কাঁচতে বড় একলা একলা লাগে।
