হঠাৎ ওদের ইঞ্জিনে কোন শব্দ নেই। স্পীডোমিটারের কাঁটা পঁচিশে নেমে এল কুড়ি…পনেরো…দশ…পাঁচ। টিফানী ইঞ্জিনে লাথি মারল, ব্যাস গাড়ি থেকে গেল, পেট্রোল শেষ। চারদিকে ওরা তাকিয়ে দেখল লুকাবার কোন জায়গাই। নেই। এখান থেকে রাস্তা অন্তত দু মাইল। ডান দিকে পাহাড়। কিন্তু কতক্ষণই বা লুকিয়ে থাকা যাবে?
সামনের লাইনটা দু ভাগ হয়ে গেছে, টিফানী হাঁপায় আর বলে, আমরা যদি গাড়িটাকে ঠেলেঠুলে ব্রাঞ্চ লাইনে নিয়ে যেতে পারি, আর তুমি যদি পুরানো পয়েন্টটা নেড়েচেড়ে ঠিক কর তাহলে হয়তো স্প্যাঙ্গ আমাদের দেখতে পাবে না।
বন্ড বলে, এস, আমার সাথে গাড়িতে হাত লাগাও। একবার ঠেলতেই দিব্যি গড়গড়িয়ে চলে গাড়িটা। ওরা শুধু পেছনে ধরে থাকে। লাইনের পাশে যেখানে মরচে ধরা সুইচটা আছে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল, বলল, আমরা ক্যাথনবলকে ব্রাঞ্চ লাইনে পাঠিয়ে দেব। অনেক চেষ্টার পর শেষে লাইন দুটোকে আলাদা করা গেল। কিন্তু বন্ডের ভীষণ মাথা ঘুরছে।
ওদিকে মাটিতে ক্যাননবলের আলো এসে পড়েছে। টিফানী ওকে টানতে টানতে নিয়ে হ্যান্ডকারটার দিকে এগিয়ে যায়। ওয়ার্নিংবেলের অশুভ ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে অতিকায় জ্বলন্ত লোহার পশুটা ওদের দিকে গর্জে তেড়ে আসছে। হ্যান্ডকারের আড়ালে টিফানীকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বন্ড পিস্তলটা টেনে বের করে। লক্ষ্য রাখে আগুন ও ধোয়ার আগ্নেয়গিরির নিচে যে জ্বলন্ত বিশাল চোখটা ধেয়ে আসছে তার ওপর। ক্যাননবল এসে পড়ে। বন্ডের পাশে মাটিতে কি যেন একটা গেঁথে গেল। ড্রাইভারের কেবিনে মুহূর্তে একটা আলো ঝল্সে উঠল। আর এক ঝলক আলো। বুলেটটা এবারে লাইনে এসে লাগে। গুলির শব্দ গোঙাতে গোঙাতে রাতের বুকে মিলিয়ে যায়। ব্রাঞ্চ লাইনে যাবার আগে এমন একটা ঝাঁকুনি খায় ইঞ্জিনটা যে কাঠের পাঁজা থেকে কাঠ ছিটকে ছিটকে আসে বন্ডের দিকে। বাবার মুখে ইঞ্জিনের ছফিট ড্রাইভিং হুইল ঘষটে যায়। ধোঁয়া আর আগুনের মাঝখানে যন্ত্রপাতি সব চুরমার হয়ে ভেঙে পড়ছে। কালো রূপালি পোশাকে স্প্যাঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে কেবিনে। বন্ডের পিস্তল চারবার গর্জে ওঠে। একটুখানির জন্য দেখা গেল একটা সাদা মুখ কে যেন হ্যাঁচকায় ঠেলে তুলল আকাশের দিকে। তারপরই সোনালি কালো ইঞ্জিনটা ছুটে বেরিয়ে গেল। বন্ড কোমরে বেরেটাটা ঢুকিয়ে রাখতে রাখতে মিস্টার স্প্যাঙ্গ-এর কফিনের দিকে চেয়ে থাকে। তার মাথার ওপর কালো কালো ধোয়া ভাসছে। টিফানী ছুটে এল ওর দিকে। ওরা দেখল আগুনের যেন নিশান উড়ছে চিমনীর ওপর। দূরে পাহাড়ের বুকে শুধু গুম গুম শব্দ। তারপর এক আকাশ-পাতাল ফাটানো শব্দ। সবশেষে অতল পাতাল থেকে একটা গম্ভীর বিস্ফোরণের আওয়াজ আসে। তারপর আস্তে আস্তে সব শব্দ মিলিয়ে গেল।
বন্ড লম্বা নিঃশ্বাস টানল, স্প্যাঙ্গড মব যারা গড়েছিল সেই নির্দয় বিকৃত পিশাচ মানুষ দুটোর একটা তাহলে এইভাবে শেষ হল। টিফানী তাড়া দিল। এখান থেকে চল তার সহ্য করতে পারছি না। বন্ডের মাথার ভেতরটা এবারে হালকা লাগছে। অতীত স্মৃতি থেকে মনটা ফিরিয়ে নিতে পেরে বন্ড খুশিই হল।
দু মাইল হাঁটতে ওদের দেড়ঘণ্টা লাগল। টিফানীই ওকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে গেল। সে না থাকলে বন্ড সিধে হাঁটতেই পারত না।
টিফানী ওর মাথাটা আস্তে আস্তে নিয়ে বসে নিজের শার্টের কোণ দিয়ে মুখের ঘাম মুছিয়ে দিতে লাগল। সে রাস্তার এদিক-ওদিক চোখ বোলাচ্ছিল। এর মধ্যে রাস্তার দুই প্রান্ত ভোরের তাপ প্রবাহে কাঁপতে শুরু করেছে।
এক ঘণ্টা পরে শার্টটা কোমরে খুঁজতে খুঁজতে টিফানী লাফিয়ে উঠে পড়ল। বহুদূরে লা-ভেগাস উপত্যকা। তাকে আড়াল করে এক আবছা কুয়াশা কাঁপছে। সেই কুয়াশা ভেদ করে ছুটে আসছে একটা কালো গাড়ি।
টিফানীর সামনে এসে গাড়িটা থামল। জানালা দিয়ে বাজপাখির মত একটা মুখ তীক্ষ্ণ চোখে টিফানীকে ভাল করে দেখল, পথের পাশে ধুলোয় পড়ে থাকা মানুষটাকে দেখল। তারপর ড্রাইভারটি অমায়িকভাবে বলল, ফেলিক্স লিটার ম্যাডাম! আপনার সেবার জন্য হাজির। এই সুন্দর সকালে আপনার জন্য কি করতে পারি বলুন?
.
হৃদয়ের কাছাকাছি
…শহরে পৌঁছে আমার বন্ধু এরনির সাথে দেখা করতে যাই। জেমস্ তাকে চেনে। এরনির মুখে সব শুনলাম। মনে মনে ভাবলাম জেমসূকে মদত দিতে হবে। অতএব এই কালো ঘোড়ায় চেপে রওনা হলাম। প্রেতপুরীর কাছাকাছি। এসে দেখি কোন জনমানব নেই, আকাশ টকটকে লাল। শুধু একটা লোক হামাগুড়ি দিয়ে পালাতে চেষ্টা করছে। কিউরিও বলেছিল বন্ডকে যারা ধরে নিয়ে যায় তাদের মধ্যে ছিল ডেট্রয়টের মাস্তান ফ্রাসো। মনে হল এ নিশ্চয় সে। গেট পর্যন্ত আসতে আসতে দেখি একটি মেয়ে। তারপর এইতো!
টিফানীর হাত বন্ডের চুলের ভেতর। ঝড়ের বেগে গাড়ি ছুটে চলেছে কোন নিরাপদ জায়গায় যেখানে ডাক্তার পাওয়া যাবে, একটু গোসল, খাওয়া এবং ঘুমের ব্যবস্থা হবে। টিফানী বলল, এ রাজ্যের সীমানা যত তাড়াতাড়ি ছাড়াতে পারা। যায় ততোই ভাল। লিটার বলল, আর আধঘন্টার মধ্যেই আমরা বর্ডার ছাড়িয়ে যাব। আমার মনে হয় আপনার আর । জেমস্-এর আমেরিকা ছেড়ে তাড়াতাড়ি চলে যাওয়া উচিত। ওরা আপনাদের দুজনকে সবরকম বিপদে ফেলার চেষ্টা করবে। সবচেয়ে ভাল হয় আজ রাতে যদি আপনাদের নিউইয়র্কের প্লেনে তুলে দেওয়া যায় আর কাল ইংলন্ড রওনা হওয়া যায়। তারপর জেমস্ যা পারে করবে।
