মিস্টার স্প্যাঙ্গ স্রেফ ওকে উড়িয়ে দেয়। ধাপ্পা দিও না। তুমি হয় পুলিশ নয় টিকটিকি। আমি বের করছি তুমি কে কার হয়ে কাজ করছ। কি জেনেছ, কেন তুমি বন্দুক রাখো, তাছাড়া চেহারাও গোয়েন্দাদের মত। তারপর সহসা স্প্যাঙ্গ টিফানী কেসের ওপর রাগে ফেটে পড়ে। টিফানীর ক্রুদ্ধ দৃষ্টিও বন্ড-এর চোখে পড়ে। মিঃ স্প্যাঙ্গ উইল্ট-এর দিকে তাকিয়ে বলে, কিডকে ডাক, বুটগুলো নিয়ে আসুক।
বুটগুলো।
বন্ড চুপ করে বসে সাহস সঞ্চয় করতে লাগল। সে অবশ্য এর চেয়েও দুরুহ সঙ্কট থেকে বেরিয়ে এসেছে। যতক্ষণ না ওরা ওকে মেরে ফেলবে বলে স্থির করে থাকে ততক্ষণই আশা। এরনি কিউরিও আছে, ফেলিকস্ লিটার আছে হয়তো, হয়তো টিফানী কেসও আছে। বন্ড টিফানীর দিকে তাকায়, মাথা হেঁট করে সে আঙুলের নখ দেখছে মন দিয়ে।
গার্ড দুজন বন্ডের পেছনে এসে দাঁড়ালো। বন্ড শুনতে পেল, প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যাও ওকে। মিস্টার স্প্যাঙ্গ বললো, ব্রুকলীন মার্কা মারাই আশি পার্সেন্ট, বুঝলে? উইন্ট-এর গলা–ঠিক আছে গুরু।
মুখোশধারী লোকদুটো সামনে এলো। বন্ডের মুখোমুখি একটা গাঢ় লাল লম্বা চেয়ার। ওরা তাতে পাশাপাশি বসলো। পাশের মোটা কার্পেটের ওপর ফুটবল বুটগুলো রেখে ওরা নিজেদের পায়ের জুতো খুলতে লাগল।
.
আগুনের পরশমণি
বন্ড-এর গায়ে ডুবসাঁতারের কালো পোশাকটা অসম্ভব আঁট হয়েছে। সমুদ্রের নিচে কি অন্ধকার। স্রোতের কি টান! তাকে প্রবালের ওপর দিয়ে ঘষটে ঘষটে নিয়ে যাচ্ছে। এখন প্রাণপণে সাঁতার কাটতে হবে স্রোতের উল্টোদিকে। কিন্তু কে যেন তার হাত আঁকড়ে ধরেছে।
জেমস, সৃষ্টিকর্তার দোহাই…জেমস…, টিফানী ওর কানের কাছ থেকে মুখ সরিয়ে নেয়। অবশেষে বন্ড চোখ খোলে, তার চোখের পাতা ফোলা ফোলা। তার গোটা শরীর থর থর করে কাঁপতে থাকে। টিফানী ওকে টানতে থাকে। তার ভয়, ও আবার না অজ্ঞান হয়ে যায়। বন্ড মনে মনে হিসাব কষতে চেষ্টা করে তার শরীরের কতটুকু আস্ত আছে? হাত আর পা নাড়া যাচ্ছে। টিফানীর কথা শুনতে পাচ্ছে। তার সব ইচ্ছাশক্তি যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। অসহ্য যন্ত্রণা তার শরীরের ভেতর ও বাইরে ছোরার মত বিধছে।
টিফানী ফিসফিস করে জানায়, আমরা ওয়েটিং রুমে রয়েছি, স্টেশনের ওই মাথায় আমাদের যেতে হবে। বন্ডের কপাল থেকে চুলগুলো ও সরিয়ে দেয়। বন্ড দাঁতে দাঁত চেপে হামাগুড়ি দিয়ে চালোকিত প্ল্যাটফর্মে বেরিয়ে এলো। কিন্তু মাটিতে কালো কালো রক্তের দাগ দেখে তার প্রতিশোধ নেবার ইচ্ছা জেগে উঠল। টিফানীকে এক হাত দিয়ে। জড়িয়ে ধরে খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে চলল কাঠের প্ল্যাটফর্ম ধরে। সিঙ্গল লাইন সাইডিং-এ একটা রেল রোড হ্যান্ডকার দাঁড়িয়ে। হ্যান্ডকার এক কামরার গাড়ি। গাড়ির ভেতরেই ছোট মোটর ফিট করা থাকে। টিফানী স্টেশনের দেওয়ালের গায়ে জড় করা কতগুলি পেট্রোলের টিন দেখিয়ে ফিসফিস করে জবাব দিল, সবে ভর্তি হয়েছে, এই গাড়ির জন্যই। আমি এটা চালাতে পারি। লাইনের পয়েন্ট-ও আমি বদলে রেখেছি। তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে পড়ো, একেবারে সিধে রায়োলাইট।
সত্যি। তুমি একটা মেয়ে বটে। কিন্তু আমার গাড়ি স্টার্ট দিলে ভয়ংকর আওয়াজ হবে যে! বন্ড পেট্রলের টিনগুলোর ওপর ঝুঁকে পড়ে তার মুখ খুলতে থাকে। কাঠের দেওয়াল আর প্ল্যাটফর্মে আচ্ছা করে পেট্রল ছিটিয়ে দেয়। ছটা টিন খালি করে সে টিফানীর কাছে গিয়ে বলে এইবার চালাতে শুরু কর।
ইঞ্জিনটা চলতে শুরু করল।
বন্ড লাইটার জ্বালাল, কাগজটা দপ করে জ্বলে উঠল। পেট্রলের টিনগুলোর ওপর বন্ড সেই কাগজ ছুঁড়ে ফেলল। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। গাড়ি চলতে শুরু করল লাইন ধরে। মেয়েটির সোনালী চুল নিশানের মত উড়ছে বন্ডের দিকে। ঘুমন্ত মানুষগুলো ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে কোলাহল করতে করতে। চাঁদ এখন নেমে গেছে। তবে কি চারটে বাজে? টিফানীর কাঁধে হাত রাখল বন্ড। টিফানী মুখ ফিরিয়ে ওর চোখে চোখ রেখে হাসল।
সে বন্ডকে বললো–আমাকে ঠায় বসে থাকতে হয়েছিল, ভান করতে হয়েছিল যেন আমার কিছুই এসে যায় না। স্প্যাঙ্গ বসেছিল, আমাকে লক্ষ্য করছিল। তারপর ওরা দড়ির গিঁট ঠিক আছে কিনা দেখে নিয়ে তোমাকে ওয়েটিং রুমে ফেলে রেখে ঘুমোতে চলে গেল। আমি আমার ঘরে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করলাম। তারপর লাগলাম কাজে। তোমার হুশ ফিরিয়ে আনতেই সবচেয়ে বেগ পেতে হয়েছে।
বন্ড ওকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যখন এতো যন্ত্রণা আর হবে না তখন বলব আমি তোমাকে কি চোখে দেখি। কিন্তু তোমার কি হবে টিফানী? ওরা যদি আমাদের ধরে ফেলে, তোমার ভীষণ বিপদ হবে।
বন্ডের মুখটা থেঁতলে কুঁচকে গেছে। টিফানী ওকে আড়চোখে দেখে বলল, আমার জন্য ভেবো না। ওর চোখ মুখ খুশিতে ঝলমল করছে। আমাদের প্রথম কাজ হবে এখন এই ইঞ্জিনটা নিয়ে রায়োলাইটে পৌঁছান। তারপর যে ভাবেই হোক একটা গাড়ি জোগাড় করে এই রাজ্যের সীমা ছাড়িয়ে চলে যেতে হবে ক্যালিফোর্নিয়া। আমার সাথে প্রচুর টাকা আছে তারপর ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো তোমাকে।
বন্ড পকেটে হাত দিয়ে দেখল তার পাসপোর্ট এবং পার্সটা ঠিকই আছে, পিস্তলটা টিফানীর কাছে ছিল, সে সরিয়ে রেখেছিল, দেখল তাতে তিন রাউন্ড গুলি আছে। সেটা নিয়ে কোমরে গুঁজে রাখল। এরপর কিছুক্ষণ ধরে শুধু ইঞ্জিনের আওয়াজ আর চাকার শব্দ রাতের বিশাল, বিস্তীর্ণ নীরবতাকে ছিন্নভিন্ন করতে লাগল। হ্যান্ডকারটা লাইন ধরে জোরে ছুটছিল। মাঝে মাঝে বন্ড অনেক কষ্টে পেছন ফিরে দেখতে লাগল আকাশের গায়ে টকটকে লাল আভা কেমন ফুটে উঠেছে। ঘণ্টাখানেক চলার পর বন্ড-এর সমস্ত শরীর যেন শক্ত হয়ে আসে। পোছড়া শহর প্রেতপুরী জ্বলছে। সেই আগুনে আকাশ লাল, হঠাৎ ওরা দেখতে পায় জোনাকির মত ছোট আলোর বিন্দু এগিয়ে আসছে। রেললাইনে একটা শব্দ হচ্ছে লাইনটা কাঁপছে। ওরা গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেয়। বন্ড দেখতে পেল পাঁচ মাইল পেছনে ইঞ্জিনের বড় আলোটা রাতের আবছা অন্ধকার কেটে এগিয়ে আসছে। লাইনটা ভীষণ কাঁপছে।
