খুব জোরে একটা শব্দ হয়ে ফটকটা খুলে যায়। গাড়িটা গিয়ে ঢোকে এর সরু কাঁচা রাস্তায়। তার ওপর লোহার পাত ফেলা। ওরা ঢোকার সাথে সাথেই ফটক আবার বন্ধ হয়ে যায়। কাঁচা রাস্তাটা প্রায় মাইল খানেক গেছে। চারপাশে ঘিরে আছে রুক্ষ মরুভূমি আর পাথুরে পথ। এদিক ওদিক গোটা কুড়ি বাড়ি। আলোয় ঝলমল করছে।
ওদের গাড়িটা গিয়ে থামে কতগুলো কাঠের বাড়ি আর দোকানের সামনে। সুড়িখানায় পিয়ানোতে নাকিসুরে বাজছে এক পুরোনো গানের সুর।
বেরোও ব্যাটা ইংরেজ-ভূত! ড্রাইভারটা হাঁক পাড়ে। ওরা তিনজন নেমে দাঁড়াল। ম্যাকলনিগৃল তার হাতের বন্দুক দিয়ে আলতো তো দেয় বন্ডকে। বন্ড আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়। ম্যাকলনিগল আগে যাচ্ছিল সুতরাং সুইং ডোরটা বন্ডের মুখে এসে লাগে। ও দাঁড়িয়ে পড়ে। কিন্তু পেছন থেকে ফ্র্যাসো-র বন্দুক ওকে খোঁচায়। বন্ড নিজেকে গুছিয়ে সুইং ডোের ঠেলে লাফিয়ে পড়ে ভিতরে। তার সামনে বার-এর ঘরে লোক নেই আলো জ্বলছে আর অটোমেটিক পিয়ানো বেজে চলেছে। বন্ড খপ করে লোকটার কনুই দুটোর ওপরে জোরে চেপে ধরে। তারপর শূন্যে তুলে ধরে ছুঁড়ে মারে সুইং ডোর আর ফ্রাসের ওপর। দুটো শরীরে প্রবল সংঘর্ষে কাঠের বাড়িটা যেন কেঁপে ওঠে। ম্যাকলনিগুল ছিটকে খানিকটা পিছিয়ে যায়। তার শরীরটা দুমড়ে ওঠে। তার হাত প্রচণ্ড থাবার মত বন্ড-এর দিকে এগিয়ে যায়। কিছুক্ষণ ধরে ওদের নিঃশব্দ লড়াই চলে। লোকটা মাথা দিয়ে বন্ডের পাঁজরায় প্রচণ্ড ঢু মারে সাথে সাথে দুটো প্রবল ঘুষি। যন্ত্রণায় বন্ডের মুখ দিয়ে হাওয়া বের হয় শিসের মত। বন্ড একটু সামলে নিয়ে লোকটার ওপর এলোপাথাড়ি ঘুষি চালাতে থাকে। তারপর তাকে তুলে শূন্যে একপাক ঘুরিয়ে ছুঁড়ে দেয় পিয়ানোর ওপর। শেষ শক্তিটুকু নিয়ে বন্ড কোন মতে পা দুটোকে খাড়া রেখেছে। বার-এর দিক থেকে কোন মেয়ের গলা ভেসে এলো। বন্ড নিজেকে ঝাঁকিয়ে তুলে ঘুরে দাঁড়ালো। সে বুঝতেই পারেনি কখন এ ঘরে এসেছে। সামনে দাঁড়িয়ে প্রেতপুরীর প্রধান নাগরিক শ্রীযুক্ত মিঃ স্প্যাঙ্গ। তার চওড়া দুই হাত স্থির অনড়। চোখ দুটি ভয়ংকর। স্প্যাঙ্গ-এর ডান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে টিফানী কেস। তার চোখ দুটি চক্ করছে। কালো মুখোশধারী দুজনের হাতে ৩৮ পুলিশ পজিটিভ। বন্ডের পেটের দিকে তাক করা। সব মিলিয়ে দৃশ্যটা যেন বন্ডের কাছে গা ছমছমে মৃত্যুপুরীর মত ঠেকে।
নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে স্প্যাঙ্গ বললো, ওকে এখানে নিয়ে এসো। আর আগের মালেদের চেয়ে ভাল দুজন লোক পাঠাও। মিঃ স্প্যাঙ্গ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। টিফানীও যায় তার পিছু পিছু। যাবার আগে শেষ বারের মত তাকায় ওরে দিকে। মামুলি সাবধান করা ছাড়াও চোখ দিয়ে যেন সে আরো কিছু বলতে চায়। ওরা চলল। বার-এর ঠিক পেছনের এক দরজা। সেটা ঠেলতে স্টেশনের এক ওয়েটিং রুম। বন্ড যেতে যেতে দাঁড়িয়ে পড়ল। পাঁচরে বন্দুকের খোঁচা ও গ্রাহ্যই করল না। পেতলের রেলিং দেওয়া অবজারভেশান প্ল্যাটফর্ম। বন্ড তাতে উঠল। কোটিপতি হবার সুখ সুবিধা যে কি ক্রমেই সে বুঝতে পারছিল। পুলম্যান কোচের ভেতরটায় ভিক্টোরীয় বিলাসিতার ছড়াছড়ি। এদিকে ওদিকে রূপো বসানো কাট গ্লাসের ফুলদানি আর বাতিদান–সব কিছু থেকে আলোর চোখ যেন জ্বলছে আর নিভছে। প্রথমে এলো একটা খাবার ঘর-এর পর একটা সংকীর্ণ করিডোর। তাতে তিনটে দরজা। তারপর গিয়ে ঢোকে এক খাসকামরায়। খাসকামরায় এক কোণে ছোট্ট একটি ফায়ার প্লেস। সেই ফায়ার প্লেসের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে মিঃ স্প্যাঙ্গ। পাশে সিগারেট হাতে টিফানী কেস। স্প্যাঙ্গ-এর মুখের ঠিক মাঝখানে একটা চুরুট। তার চোখ দুটো জ্বলে উঠল। বন্ডের দিকে তাকিয়ে বলে উঠেলো, তুমি কে বটে? আর এসব হচ্ছিটা কি?
বন্ড বলল, কথা বলতে চাইলে আমার আগে একটা ড্রিঙ্ক লাগবে।
স্প্যাঙ্গ ঠাণ্ডা চোখে তাকে দেখে বলল, উইন্ট, ওকে একটা ড্রিঙ্ক দাও তো। ড্রিঙ্ক এলো, স্প্যাঙ্গ-এর মুখ কঠিন উত্তেজনায় টানটান।
বন্ড তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, দেখুন আমি বেকার ঝামেলা ভালবাসি না। আমার কাজ আমি করেছি। টাকা পেয়েছি। টাকা নিয়ে যদি জুয়া খেলে থাকি, সেটা আমার নিজস্ব ব্যাপার।
মিঃ স্প্যাঙ্গ চাপা গলায় বলল, তোমাকে তবে খুলেই বলি। কাল লন্ডন থেকে একটা সাঙ্কেতিক খবর এসেছে। লন্ডন থেকে এক বিশ্বাসী বন্ধু লিখেছে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ পিটার ফ্রাঙ্কসূকে অনির্দিষ্ট অভিযোগে ধরে রেখেছে। তার বদলে যে গেছে তাকে যেমন করে হোক ধরা চাই। যদি বোঝ এতে আমাদের কারবার ঢিলে হয়ে যাচ্ছে তাহলে লোকটাকে খতম কর, করে জানাও। স্প্যাঙ্গ-এর চোখ দুটো আগুনের মত জ্বলতে লাগল বন্ডের মুখের ওপর।
বন্ড বুঝতে পারল তার নিস্তার নেই। মনের একদিক দিয়ে খবরটা হজম করতে করতে ভাবতে লাগল কেমন করে ওরা তাকে খতম করবে। আবার মনের আর এক দিক দিয়ে কেউ যেন তাকে বলে দিল, যার খোঁজে সে আমেরিকায় এসেছিল তা তার জানা হয়ে গেছে। হীরে চালানের চোরপথে দুই মুখে, শুরুতে এবং শেষে আছে দুই স্প্যাঙ্গ। এখন যেমন করে থোক এম -কে উত্তরটা পাঠাতে হবে। যে কাজ করতে এসেছিল বন্ড এই মুহূর্তে তা সম্পূর্ণ হল। উত্তর সে পেয়ে গেছে। বন্ড স্প্যাঙ্গ-এর দিকে তাকিয়ে বলে, আমি পিটার ফ্রাঙ্কস-এর কাছ থেকে কাজটা নিই। ওর কাজটা পছন্দ হয়নি অথচ আমার টাকার দরকার ছিল।
