ঘড়ি দেখল, মাঝ রাত। বিশাল ঘরটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে কাঁচের দরজা ঠেলে বাইরে বের হল বন্ড। লন পেরিয়ে টারকোয়েস বিল্ডিংয়ে পড়ল। তারপর নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল।
.
প্রেক্ষাগৃহে অন্ধকার
পরের দিন সন্ধ্যায় এরনি কিউরিওর ট্যাকসি জুয়াপট্টি ধরে আস্তে আস্তে চলছিল লা-ভেগাস শহরের দিকে। একটা কিছু ঘটবে এই ভেবে বন্ড অপেক্ষা করছিল। বন্ড বলে, কাল রুলেতে ওদের কিছু মালকড়ি খসিয়েছি। তাতে অবশ্য মনে হয় না ওদের কিছু গায়ে লাগবে। ড্রাইভার জানায় পুরানো আমেরিকার বিষয়ে একদম পাগল। হাইওয়ে নাইনটি ফাইভ-এর ওপর একটা আস্ত পোড়ো শহর কিনে বসে আছে। সেটাকে পুরানো আমলের করে সাজিয়েছে। নাম দিয়েছে প্রেতপুরী।
স্প্যাঙ্গ লোকটাকে সকালে এক ঝলক দেখেছিল বন্ড। দশটা নাগাদ সে গিয়েছিল নাপিতের কাছে চুল ছাঁটতে। বন্ড যখন মাথার পেছনটা দেখছে তখনই ঘটনাটি ঘটল। হঠাৎ একটা চাপা গর্জন। বাথ-রোব পরা বিশাল চেহারার একটা লোক চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে, মুখ থেকে তোয়ালে টেনে ফেলে দিয়ে, যে মেয়েটি পরিচর্যা করছিল, তাকে মারল এক থাপ্পড়। এনামেল পাত্র, যন্ত্রপাতি সব ঝনঝন করে ছড়িয়ে ছত্রাকার হয়ে গেল ঘরময়। তারপর সে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
বন্ড চুল কাটতে কাটতে শুনতে পায় মেয়েটি হাঁটু গেড়ে বসে কান্না কান্না গলায় বলছে, আমার কোন দোষ নেই। মিঃ স্প্যাঙ্গ আজ বড় নার্ভাস ছিলেন। বন্ড মনে মনে খুশি হয় যে মিঃ স্প্যাঙ্গ-এর তাহলে অস্থিরতা হয়েছিল। এরনি কিউরিও হঠাৎ বলল, মিঃ আমাদের পেছনে ফেউ লেগেছে। গোটাকতক ফুর্তিবাজ পাজী মাস্তান। আমাদের ওরা বহুদিন থেকে জ্বালাচ্ছে। বন্ড তার বেরেটা পিস্তল বের করে খাপ থেকে। চল্লিশ মাইল স্পীডে ওরা গাড়ি চালাচ্ছিল। জাওয়ারটা ঠিক ওদের পিছনে। আর কালো সেডনটা ঠিক ওদের আগে আগে। হঠাৎ বন্ড সামনের দিকে ছিটকে পড়ে, এরনি কিউরিও জোরে ব্রেক কষে। জাওয়ারটা এসে এরনির গাড়িতে প্রচণ্ড ধাক্কা মারে। এরনি কোনরকমে সামলে নিয়ে ফের ছুটে চলে। অন্ধকার হয়ে আসছে। পিছনের গাড়িটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। কিউরিও অদ্ভুত চাপা গলায় বলে, সাবধান। শেভ্রলেটা তাড়া করে আসছে।
বন্ড নিজেকে গুছিয়ে নিল। চাকায় চাকায় প্রবল চিৎকার। শেভ্রলেটা টাল সামলাতে না পেরে গাছের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ল। বন্ড দেখতে পেল গাড়িটা থেকে ধিকধিক্ করে আগুন বেরুচ্ছে। সে রাস্তা পার হতে গিয়ে শুনল তাদেরই গাড়ির মধ্যে থেকে এক গোঙানির আওয়াজ। দেখল ড্রাইভারটির গোটা বা হাত রক্তে জবজব করছে। কোনরকমে তাকে তুলে বসাবার চেষ্টা করে। ড্রাইভারটি বলে, এখান থেকে তাড়াতাড়ি চলুন, জাগুয়ারটি আমাদের পিছু নিতে পারে। শীঘ্রই ডাক্তারখানায় যাবার ব্যবস্থা করুন। বন্ড প্রচণ্ড জোরে গাড়ি চালিয়ে ছুটে চলে। ট্যাক্সিটা গিয়ে থামে ছয় সারি গাড়ির পিছনে। তখন ছবি চলছে প্যাসান পিট নামে একটি সিনেমা হলে। এর মধ্যে অন্ধকার চেপে বসেছে। বন্ড একটু ঘুরে বসে যাতে কোন গাড়ি ঢুকলে দেখতে পায়। কাছাকাছি গাড়িগুলোকে ভাল করে দেখে নেয়। একটা গাড়ির পেছনের সিটে চাপচাপ অন্ধকার।
তারপর একটা উগ্র গন্ধ নাকে ভেসে আসে। হঠাৎ এক ছায়ামূর্তি যেন মাটি খুঁড়ে উঠে দাঁড়ায়। একটা বন্দুকের নল এসে ঠেকে বন্ডের মুখে। বন্ড তাকিয়ে দেখে এক দলা চর্বির মত হলদে মুখ। ঠাণ্ডা একজোড়া চোখ হাসছে। লোকটি বলে ওটে, চল আমাদের সাথে ইংরেজ ভূত, নয়তো তোমার ঐ দোস্তকে কিমা বানিয়ে ছাড়বো।
বন্ড বলে, এরনি, আমি ওদের সাথে যাচ্ছি, ফিরে এসে তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।
হঠৎ একটা ধপ করে শব্দ হয়। এরনিকে বন্দুক দিয়ে কাঁধের পিছনে মারতে সে মুখ থুবড়ে পড়ে, তারপর একদম চুপ হয়ে যায়।
বন্ডের হাতের পেশী নিশপিস করতে থাকে। এই সময়ে যদি তার পিস্তলটা বের করা যেত। কিন্তু চারদিকে তাকিয়ে বন্ড বুঝল সে আশা দুরাশা। কিন্তু খুনের একটা কথা ওর মনের তলায় চাপা রইল তখনকার মত। চর্বিমুখোটা বলল, সামনের দিকে এগোও, মনে রেখো আমরা তোমাকে ঘিরে থাকছি।
বন্ডের দুপাশে দুটি লোক এসে দাঁড়ায়। ওরা তিনজন দ্রুত প্রবেশ পথের দিকে এগিয়ে চলে। ওদের সামনে গলির রাস্তা। পাহাড়ের ওপারে তখন চাঁদ উঠেছে। মনে হচ্ছে ওদের তিনটে ছায়াকে চাঁদ যেন টেনে নিয়ে চলেছে বালির ওপর দিয়ে।
.
প্রেত–পুরী
ফটকে ঢোকার মুখে সেই লাল জাগুয়ারটা দাঁড়িয়ে আছে। ওরা বন্ডের বন্দুক নিয়ে নেয়। বড় বাধা দেয় না। গাড়িটা ছুটে চলে শহরের দিকে। একটু পরেই তারা নিয়নের অরণ্যে প্রবেশ করে।
মস্ত সাইনবোর্ডে লেখা ৯৫। এরনি কিউরিওর কথা বন্ডের মনে পড়ে যায়। তখনই বুঝতে পারে ওরা চলেছে প্রেতপুরীর দিকে। একটা চিন্তাই বন্ডকে পেয়ে বসে : এরনির প্রতিশোধ কি করে নেওয়া যায়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, এদের আর সেই শেভ্রলের লোক দুটোকে পাঠানো হয়েছিল, তাকে স্প্যাঙ্গ-এর কাছে ধরে নিয়ে যেতে। ক্যাসিনিতে স্প্যাঙ্গ-এর হুকুম অমান্য করেছিল বলেই কি এই স্পর্ধিত জবাব? বন্ডের মনে হয় স্প্যাঙ্গড মব-এর কাছে তার সব পরিচয় কি তবে ফাঁস হয়ে গেছে? সে যে ওদের শত্রু, এটা ওরা জেনে ফেলেছে? বন্ড গুটিশুটি হয়ে বসে। ওর সামনে ডায়ালগুলো জ্বলছে। ঘণ্টা দুই পরে গাড়ির স্পীড যেন একটু একটু করে কমে আসে। সামনে একটা নোটিশ বোর্ডে লেখা আছে প্রেতপুরী। সেখানে এসে গাড়িটা থেমে যায়।
