টেবিলটা ছোট। আটজন লোক উঁচু উঁচু টুলের ওপর বসে খেলছিল। তাদের ঠিক সামনে ডিলার লোকটি। কাপড়ের ওপরে আট নম্বর ঘরটি ঠিক স্টোকের কাছে। লোকটি দুটো তাস সেই ঘরের ওপর দেয়। টেবিলে কোন কথাবার্তা নেই। খেলা হচ্ছে খুব তাড়াতাড়িভাবে। সেই ঘর থেকে বেরিয়ে অনেকগুলো টেবিলের পাশ দিয়ে বন্ড ফিরে গিয়ে আর একটা দরজায় ঢোকে। একটু নিচু ধরনের চক্রবেড় রেস্তোরাঁ। হস্টেস মহিলা ছুটে এসে বন্ডকে কোণের একটা টেবিলে নিয়ে যায়। ঝুঁকে পড়ে টেবিলের ফুল ঠিকঠাক করে এবং সেই ফাঁকে বোধহয় তার সুন্দর বুকটাও একবার দেখিয়ে দেয়। অত্যন্ত মধুর একটা হাসি হেসে সেখান থেকে চলে যায়। দশ মিনিট পরে এলো একজন ওয়েট্রেস। একটুকরো মাখন আর একটা রোল তার প্লেটে দিয়ে যায়। বন্ড ভাবে, এদের আনুষ্ঠানিকতার শেষ নেই। সে চুপচাপ বসে থাকে। সে মনে মনে ভাবে, কি কুক্ষণেই না সে এই কাজটা নিয়েছিল। এখানে বন্ডের মনে হওয়া না হওয়ায় কি এসে যায়? ওটা তার নিজের মনের বিরক্তি। সাময়িক ক্ষোভ। ক্ষোভ তো হবারই কথা, যে এতকাল এত বেশি এসব জিনিসের মধ্যে থেকেছে–এই তুখোড় দুবৃত্তদলের আগাপাশতলা তার জানা। এসব বারুদের গন্ধ মেশানো মধুর সৌজন্যতা আর অর্বাচীন আভিজাত্য সে ঢের দেখেছে, তাকে আজ সব জেনেশুনেও সব কিছুই বাইরে থাকতে হচ্ছে। বন্ড ঘড়ি দেখল। ঠিক ১০টা বাজে। উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে আস্তে আস্তে ক্যাসিনোর দিকে চলল।
.
এবং ধন্যবাদ
জুয়াখোরের চেহারা এর মধ্যে পাল্টে গিয়েছিল। পরিবেশ এখন অনেক শান্ত। রুলেৎ টেবিলে সুন্দর পোশাকে শুধু কয়েকজন সুশ্রী তরুণী। খেলা ঝিমিয়ে পড়লে ওরা মাতিয়ে তুলবে তার জন্য ৫০ ডলার করে ওরা পেয়েছে।
আর এক মস্ত পরিবর্তন হয়েছে। বার-এর সবচেয়ে কাছের ব্ল্যাকজ্যাক টেবিলে এখন টিফানী কেস। সেই তাস বাটছে। এবার তবে ও-ই ডিলার। বন্ড ১০টা বেজে ৫-এ টেবিলে গেল। বসল টিফানীর ঠিক মুখোমুখি।
গুড ইভিনিং।
হাই। খুব কায়দা করে সামান্য একটু হাসল টিফানী।
সবচেয়ে বেশি দান কি ধরা যাবে?
এক হাজার ডলার।
অনায়াসে টিফানী টেবিলের ওপর তাসগুলো রেখে ভাজতে থাকে। কিন্তু তাসের দুটো ভাগ যে সমান সমান হয়নি। তাসগুলো তুলে ফের যখন ভাঁজবে তখনো তো দুটো ভাগ কম-বেশি হয়ে থাকবে। টিফানী সেই চালাকিই করল। মনে মনে টিফানীর তারিফ না করে পারল না। তাসের জুয়ার জোচ্চুরিটি সে কেমন একা হাতে চালিয়ে গেল। টিফানীর চোখে ও চোখ রাখে। টিফানী ওকে দুটো তাস দিয়ে নিজে দুটো নেয়। বন্ডের হঠাৎ খেয়াল হয় তাকে যথেষ্ট হুঁশিয়ার থাকতে হবে। তার খেলার একচুল এধার-ওধার হলে, যে নিয়মে তাস সাজানো হয়েছে তা একেবারে ভণ্ডুল হয়ে যাবে।
বন্ড নিজের হাত দেখল, ১০ আর গোলাম। টিফানীর হাতে ১৬। ও একটা তাস তুলল। সাহেব। একটা লোক। এসে টিফানীর হাতে ১,০০০ ডলারের একটা ফলক ধরিয়ে দিল। ও সেটা ছুঁড়ে বেটিং-লাইনের ওপারে ঠেলে দেয় এবং টাকাগুলো পেয়ে পকেটে ভরে। বন্ডের হাতে ১৭, টিফানীর হাতে ছিল ১২, ও তোলে তিরি আর নওলা। এবার ওর হাতে ২৪। টিফানী আবার হেরে যায়। লোকটি এসে আর একটি ফলক দিয়ে গেলে বন্ড সেটা পকেটে ভরে। তার বাজি রাখা ১,০০০ ডলার এই করে ছড়িয়ে যায়। এরপর ওর হাতে ১৯, টিফানীর হাতে ৭ আর ১০। নিয়ম অনুযায়ী ওকে ১৭টা টাকা দিতে হবে। সুতরাং বন্ডের পকেটে আর একটি চাকতি চলে এল। এবার বন্ডের শেষ খেলা। তারপর তাকে টেবিল দিতে হবে। টিফানী তার দিকে অধীর চোখে তাকাচ্ছে। বন্ডের হাতে ১৯, টিফানীর ১৬। ব্যাস, খেল খতম। লোকটি এবার চাকতিটি বন্ডের দিকে ছুঁড়ে দিল। বন্ড ফলকটি পকেটে ভরতে ভরতে উঠে দাঁড়ায়, টিফানীর দিকে তাকিয়ে বলে, ধন্যবাদ! সে টেবিলের দিকে পিছন ফিরে ঘুরতে ঘুরতে টিফানীর কথা ভাবতে লাগল। অন্যদেরও নিশ্চয় তার মত টিফানীকে চোখে ধরে ছিল। বন্ডের মনে এক প্রবল ঈর্ষা খোঁচা মারে। ওখান থেকে সে বার-এ চলে যায়। ৫,০০০ পাওয়ার আনন্দে সে শুদ্ধ পানির সাথে বুরৰ্বোর অর্ডার দিয়ে বসে। লিটারের কথা তার মনে পড়ে যায়।
ড্রিঙ্ক শেষ করে বন্ড সোজা চলে যায় রুলেৎ টেবিলে। অল্প কয়েকজন জুয়াড়ী বসে খেলছে। সবচেয়ে বেশি বাজি এখানে ধরা যায় ৫,০০০। বন্ড চারটা ১,০০০ ডলারের ফলক আর নগদ দশখানা ১০০ ডলারের নোট বের করে পকেট থেকে। সে বলে, লালে খেলব। তার হাত কাঁপে না। অদ্ভুত এক মুক্তির বোধ তার মধ্যে। চাকাটা আস্তে আস্তে থামছে। ছোট বলটা লাফিয়ে গিয়ে পড়ল তার ঘরে। ৩৬, লাল। হাই অ্যান্ড অল। লোকটি বিরাট এক ফলক নিয়ে বন্ডের পাশে রাখে। টেবিলের চারপাশে গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়। ১৭, কালো। লো অ্যান্ড অড। স্টিকম্যান হেঁকে ওঠে। দেখা গেল প্রকাণ্ড ফলক বন্ডের পাশে নামিয়ে রাখা হল। এবারই শেষ খেলা তারপরই স্প্যাঙ্গ-দের ২০,০০০ ডলার হাতিয়ে নিয়েই চম্পট। ৫ লাল। লো অ্যান্ড অড।
স্টেক নেব আমি এবং খেলতে সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ।
তিনটা ৫,০০০ আর পাঁচটা ১,০০০-এর নোট। ক্যাশিয়ার বন্ডের চারটা ফলক নিয়ে টাকা গুনে দেয়।
বন্ড এয়ার মেল খাম কিনে, তার ওপরে লেখে : ব্যক্তিগত। দি ম্যানেজিং ডাইরেক্টর ইউনিভার্সাল এপোর্ট, রিজেন্টস পার্ক, লন্ডন, এন, ডরু, তার পর টিকিট কিনে ইউ.এস.মেইল লেখা ফোকরের ভেতর খামটা গলিয়ে দেয়। এটি আমেরিকার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।
