সব শুনে বন্ড ড্রাইভারকে ধন্যবাদ জানায়। গাড়ি চলতে থাকে। ওরা এইবার সেই বিখ্যাত পট্টিতে প্রবেশ করে। আস্তে আস্তে দু একটা গ্যাস স্টেশন এবং মোটেল দেখা যায়। একটা মোটেল গেল, তাতে সুইমিং পুল। বড় সড়কটা অনেক লাল-নীল চিহ্ন আর বাড়ি হোটেল ইত্যাদির সামনে চত্বরের গা দিয়ে পথ কেটে সোজা শহরে মিশেছে। শহর যেন অগ্নিকুণ্ড।
এই আমার খোদ পট্টিতে ঢুকলাম। আর, এই যে আপনার ডান দিকে ফ্লেমিংগো। এরিনি কিউরিও। নিচু ধরনের এক আধুনিক হোটেল দেখিয়ে বলে, বাইরে নিয়মের প্রকাণ্ড টাওয়ার। সেটা এখন জ্বলছে না। তারপর এই হল গিয়ে ডেজার্ট-ইন, উইলবার ক্লার্ক-এর। আর ওই যে লোহার ফলক দেওয়া জায়গাটা দেখছেন, ওটা দি সাহারা। ওর যারা মালিক তারা ওরেগো-এর সব ছোটোখাটো জুয়াড়ী। মজার ব্যাপার হচ্ছে যে দিন ওটা খোলে সে রাত্রে ওদের ৫০,০০০ ডলার লোকসান হয়। ওটা হল দি লাস্ট ফ্রন্টিয়ার। ওয়েস্টার্ন ডাউনের একদম নকল। ওইখানে দি থান্ডারবার্ড আর রাস্তার ওধারে দি টায়ার । ভেগাসের সবচেয়ে মন মাতানো জায়গা। লোকটি আস্তে আস্তে স্প্যাঙ্গ হোটেলের উল্টো দিকে গাড়ি থামায়। হোটেলের মাথায় চমৎকার উজ্জ্বল আলো জ্বলছে, নিভছে।
বন্ডের হঠাৎ মনে হয়, অনেক হয়েছে। এই আড্ডা ও পট্টির ঝলমলে চেহারা ঢের দেখা হয়েছে। এখন লাঞ্চ সেরে একটু সাঁতার কাটা তারপর একটু গড়ানো। চলুন না রাত পর্যন্ত এই রকম গড়িয়ে গড়িয়ে। বন্ড ড্রাইভারকে তার ইচ্ছার কথা জানিয়ে দেয়।
ভাল কথা। পয়লা রাতেই যেন হাঙ্গামা বাধিয়ে বসবেন না। কিউরিও বলে বেশি হচড়-পাঁচড় করবেন না। খুব সহজভাবে নেবেন। ভেগাসে যদি কিছু করতে হয় আপনাকে, তাহলে আগে সব জমাতে হবে। আর জুয়ার রকমখানা দেখবেন।
কিউরিও মুখ টিপে হাসে। টাওয়ার অফ সাইলেন্স -এর কথা জানেন? ভারতে আছে। শুনেছি। ড্রাইভারটি গাড়ি ফার্স্ট গীয়ারে নিয়ে আসে। আয়নায় দেখে পিছন থেকে গাড়ি আসছে কি না। একটা লোক কোনমতে এক লাখ নিয়ে ভেগাস থেকে ভাগতে পেরেছিল। রাস্তা পেরোবার জন্য দাঁড়ায়। অবশ্য যখন খেলতে নামে তখন লোকটার হাতে ছিল পাঁচ লাখ।
গাড়ি সোজা গিয়ে গাড়ি বারান্দার নিচে থামে। সামনেই বিরাট বিরাট কাঁচ ঢাকা দরজা। প্লাস্টার করা গোলাপি বাড়ি। বেয়ারা এসে ট্যাক্সির দরজা খোলে। বন্ডের ব্যাগটা তুলে নেয় হাত বাড়িয়ে। বন্ড রোদের মধ্যে নেমে পড়ে।
কাঁচের দরজা ঠেলে ঢুকতে ঢুকতে বন্ড শুনতে পেল এরনি কিউরিয়ো বেয়ারাটাকে বলছে, একটা খ্যাপা ইংরেজ ভূত। দিনে ৫০ ডলার করে আমার সাথে কড়ার হয়েছে, কিছু বুঝলে?
দরজাটা খোলে এবং আপনি বন্ধ হয়ে যায়। ভেতরের ঠাণ্ডা হাওয়া বক্তকে স্বাগত জানায় সেরাফিমো স্প্যাঙ্গ-এর জলমলে প্রাসাদে।
.
দি টায়ারা
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বন্ড তার খাওয়া সারল। পাশেই মস্ত সুইমিং পুল। টায়ারার ছ টা বাড়ির মণি-মাণিক্যের নামে নাম। তাতে শুধু থাকার এবং শোবার ঘর। বন্ড ছিল একটা বাড়ির দোতলায়। তার নাম নীলকান্ত মণি। বাড়িটার রঙ হালকা আশমানী। বন্ডের নিজের ঘরটা খুব আরামপ্রদ। বন্ড বিছানায় শোবার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়ল। প্রায় চার ঘণ্টা ঘুমিয়ে, সাতটার সময় ওঠে। রিসিভার তুলে সে টিফানী কেসকে চায়। টেবিলের তলায় অতি সন্তর্পণে যে টেপ রেকর্ডার লুকানো আছে তাতে সব কথাবার্তা লেখা হয়ে যেতে লাগল। বন্ড গোসল সেরে সাড়ে সাতটা নাগাদ বাইরে বেরিয়ে গেল।
আবোরা আধঘণ্টা পরে টেবিলের নিচে লুকানো সেই যন্ত্রটা দরজায় ধাক্কা শুনতে পেল। তারপর দরজাটা সশব্দে খুলল। বেয়ারার পোশাক পরা একটা লোক হাতে এক ঝুড়ি ফল নিয়ে ঘরে ঢুকল। লোকটা তাড়াতাড়ি টেবিলের কাছে। গিয়ে দুটো স্কু খুলে ফেলল। পুরানো রীল বের করে নিয়ে তাতে নতুন রীল ভরে দেয়। তারপর দরজা বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে আসে। তারপর কয়েক ঘণ্টা রেকর্ডারটা নিঃশব্দে শুধু ঘুরে চলে, একটা আওয়াজও তাতে লেখা হয় না।
তখন বন্ড গিয়েছিল বার-এ। টায়ারার লম্বা, প্রকাণ্ড বার। প্রথমেই একটা বিশেষত্ব সে লক্ষ্য করল। লা-ভেগাসের বাড়ি-ঘর-দোরে এক নতুন কায়দা আয়ত্তের চেষ্টা আছে। লোভ দেখিয়ে ইঁদুরকে খাঁচায় পোরার মত সব রকম ব্যবস্থাই এতে রয়েছে। খদ্দের ইঁদুর না চাইলেও জুয়ার লোভনীয় ফাঁদে তাকে পা দিতেই হবে। ঢোকার রাস্তা দুটো। এক বাইরে থেকে আরেকটা ভেতর বাড়ি এবং সুইমিং পুল থেকে। পাশা খেলার তিনটা টেবিল। রুলেত-এর চাকা অবিরাম ঘুরছে। যেন কেবলই ফুসলে ডেকে নিয়ে যেতে চায়। এই লোভনীয় ফাঁদে ইঁদুরের পা না দিয়ে উপায় নেই। বন্ডের মনে হয় ফাঁদ পাতার এই সমস্ত আয়োজনটাই অত্যন্ত দৃষ্টিকটু আর অশ্লীল। যখন বরাত খোলে তখন মেশিন থেকে রূপালি ডলার বৃষ্টি হয়। আর লিটার যা বলেছিল–মেশিনের ব্যাংকগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকে এক পাল বয়স্ক মেয়ে।
হঠাৎ একটি মেয়ে জ্যাকপট বলে চেঁচিয়ে ওঠে। তখন সমস্ত দৃশ্যটা যেন বদলে যায়। বন্ড লক্ষ্য করে মেয়েগুলো কেউ-কেউ মুখ তুলে কাতর চোখে সেই দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের দেখে বন্ডের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। বন্ড মুখ ঘুরিয়ে নিজের মার্টিনিতে চুমুক মারে। তারপর রেস্তোরাঁর বিল চুকিয়ে দেয়। ব্ল্যাকজ্যাক টেবিলের আশপাশ দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। গিয়ে দাঁড়ায় মাঝের টেবিলটায়। এখানেই খেলতে হবে। ঠিক ১০টা বেজে ৫ মিনিটে। এখন সবে সাড়ে আটটা।
