ট্রয়-এর আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে স্টুডিল্যাক আবার ছোটে। সারাটোগা গ্রাম আসলে (টানা টানা বড় বড় চোখের সুন্দর দেখতে এক তরুণের ছবি। তার নীচে দিয়ে লেখা শুরু হয়েছে। বন্ড পড়ে যায়) একসময় সমাজ বিরোধীদের অতি প্রিয় জায়গা ছিল। তারপর কারা যেন একদিন টেলিভিশনে সেইসব দেখিয়ে দেয়। এতে গ্রামের চাষাভুষোরা ভীষণ ভয় পায়। তারা সমাজবিরোধী দুবৃত্তদের সেখানে থেকে তাড়িয়ে দেয় লা ভেগাসে। কিন্তু দুর্বত্তের দল বহুদিন পর্যন্ত সারাটোগায় তাদের আধিপত্য বজায় রেখেছিল। এটা ছিল তাদের একটা উপনিবেশের মত। এবং তারা পিস্তল আর লাঠির জোরে তাদের প্রতিপত্তি অক্ষুণ্ণ রাখতো। সারাটোগা শেষ পর্যন্ত কেন্দ্র হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যে সব জায়গায় পুরোদমে জুয়ার আড্ডা চলত, সেই সব জায়গায় কেন্দ্র থেকে ছুটে যেত শেষ পর্যন্ত। যতো জোচ্চারে, প্রতারকারা মিলে নিজেদের এক পৌর সরকার খাড়া করত। তবু এখানে কিছু কিছু ভদ্র-নামী বনেদী লোকেরা আজো আছে যাদের ঘোড়া এই রেসে দৌড়য়। বাইরের লোক সারাটোগায় গেলে পাহারাওয়ালারা তাদের ধরে পুরো রাখতো। এই সব পাহারাওলার মাস গেলে সব মাইনে চলে যেত মেয়েমানুষের দালালের হাতে। পয়সা ছড়ালে তাদের অবাধে থাকার কোন অসুবিধা ছিল না। আর স্থানীয় কিছু ব্যাপারে তাদের আগ্রহ নিতেই হত। সব মিলিয়ে সারাটোগা হয়ত বিশ্রী জায়গা। কিন্তু বাজী ও জুয়া যেখানে চলে সেইসব জায়গা বিশ্রী, জঘন্য হতে বাধ্য।
বন্ড কাগজের টুকরোটা ভাজ করে নিজের পকেটে রাখে। একটু পরে বলে আগের চেয়ে অবস্থা এখন অনেক বদলেছে। তা বদলেছে। কিন্তু জিমি ক্যামন এমন ভাব করেছে যেন সে জানে না সেই সব পুরানো মাল কিংবা তাদের চ্যালা চামুন্ডারা আবার ফিরে আসছে। আসছে নতুন নতুন মালিক হয়ে শাই স্মাইলের মত ঘোড়াকে সামনে রেখে হরদম ধোকাবাজি করছে। সারাটোগার অনেক কিছু বদলেছে।
.
লাজভরা হাসির ঝিলিক
সুন্দর সুন্দর রাস্তার দুধারে এলম-এর সবুজ সমারোহ। বন্ডের খুব ভাল লাগে। শান্ত কেমন যেন ঘুমিয়ে থাকা ইউরোপের সেই সব জায়গার মত যেখানে নাকি প্রস্রবণ আছে। আর সব জায়গায় ঘোড়া আর ঘোড়া। শহরের বুকের ওপরেই রেসকোর্স। পথের ধারে রাস্তার মোড়ে তাদের হরদম ঘুরতে ফিরতে দেখা যায়।
জায়গাটা কেমন যেন মেলানো মেশানো। নতুন গঞ্জ-বাজারের ভাব রয়েছে আবার কুণ্ড থাকার দরুন খানিক পানি পানি ভাব। ঘোড়ার ব্যাপারে বন্ড এর কিছুমাত্র আগ্রহ নেই তবু এর সাথে জড়িয়ে এখানকার যে জীবন সেটাও তার বেশ ভাল লাগছিল।
লিটার ওকে সাগামোর এ নামিয়ে দেয়। হোটেলটা শহরের এক প্রান্তে। সেখান থেকে ঘোড় দৌড়ের মাঠ আট মাইল। ওকে নামিয়ে লিটার নিজের কাজে চলে যায়। আগেই ওরা স্থির করেছিল শুধু রাতে ওরা দেখা করবে। কিংবা মাঝে মধ্যে রেসের ভীড়ে। আর যদি শাই স্মাইলকে নামায় তাহলে ভোরবেলা ব্যায়াম করার মাঠে। লিটার বলেছে, সে খবর এবং আরো নানারকম খবর ও জোগাড় করতে পারবে। সন্ধ্যাবেলা আস্তাবলগুলোর আশপাশ দিয়ে ঘোরাফেরা করলেই ও সব খবর পেয়ে যাবে। তাছাড়া রয়েছে রাত্রিব্যাপী বার ও রেস্তোরাঁ দি-টেয়ার । এই আগাস্ট রেসের ওটাই প্রধান আড্ডা।
বন্ড সাগামোর-এর সদর অফিসে গিয়ে নাম লেখায়। সই করে জেমস বন্ড, হোটেল অ্যাস্টর, নিউইয়র্ক -এই। বলে। তিন দিনের জন্য তিরিশ ডলার দিয়ে বন্ড উনপঞ্চাশ নম্বর ঘরের চাবি পেয়ে যায়।
বিউটি পুল আর গ্ল্যাডিওলির কেয়ারী পেরিয়ে বন্ড ছিমছাম এক ঘরে ঢোকে। বিছানার পাশে টেবিল, আরামকেদারা।
বন্ড গোসল সেরে জামাকাপড় বদলে সামনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত খাবার জায়গায় ২.৮০ ডলার দিয়ে দুটো বুরবো এবং চিকেন ডিনার সেরে এল। তারপর ঘরে ফিরে বিছানায় শুয়ে সারাটোগিয়ান পড়তে লাগল। রাত দশটার পর লিটার এসে আস্তে আস্তে দরজায় ঘা দিতে থাকে।
আরাম কেদারায় বসে লিটার একটি সিগারেট ধরায়। বন্ডকে বলে কাল ঠিক ভোর পাঁচটায় উঠতে হবে। খবর হচ্ছে এই যে শাই স্মাইলকে ওরা কাল ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ চার ফার্লং ছুট করিয়ে সময়টা দেখবে। এই মহড়ার সময় সাথে কে কে থাকে আমি দেখতে চাই। মালিকের নাম শুনলাম–পিসারো। একবার মেক্সিকোর বর্ডার পার করতে গিয়ে মাল সমেত ধরা পড়ে। তখন স্প্যাঙ্গ ওকে এই চাকরিটা দেয়। বেচারা জেল খেটেছিল বলে। এখনতো ও নিজেই ভ্যান্ডারবিল্টের মত এক ঘোড়ার মালিক। দিব্যি আছে। লোকটাকে একবার স্বচক্ষে দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে। আমি ওর সাথে একটু আলাদা করে কথা বলতে চাই। ওকে আমি একটা টোপ দেবো। ঘোড়ার ট্রেনারটা হল আর এক শয়তান। নাম–রোজীবাড। এরাই হচ্ছে ঘোড়ার নাটকের আসল চরিত্র। পর পর এরা হাজির হবে মঞ্চে। অভিনয়টা বানচাল করার তালে আছি।
বন্ড এই রহস্যে অবাক হয়। সে বলে, তুমি এদের ধরিয়ে দিচ্ছ না কেন? আর তোমার আসল লোকেরাই বা কে?
লিটার বলে কেন বড় বড় ঘোড়র মালিকেরা। তারা প্রথমে খানিকটা দেয় তারপর ফলাফল দেখে বাকি টাকা দেয়। ভেটারিনারী ঘোড়াকে ছাড়পত্র দিয়েছে আর ওরা আসল শাই স্মাইলকে মেরে পুড়িয়ে ফেলেছে। যাক্ ঠিক ভোর পাঁচটায় আমি তোমার এখানে আসছি।
ভোরের আবছা আলোয় বন্ড লিটারের পিছন পিছন এই সব প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে চলে–আস্তাবলের ঘোড়ারা জেগে উঠেছে, হাওয়ায় নির্মল গন্ধ। পূর্ব আকাশ রাঙা হয়ে উঠেছে তারা যাচ্ছে ঘোড়দৌড়ের মাঠের পাশে কাঠের সাদা ঘেরা জায়গাটায়। প্রত্যেকটি ঘোড়র গায়ে কম্বল। ওরা কাঠের রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সকাল হওয়া দেখে। গাছপালার মাথায় এই সময় বাঁ দিকের গাছের ফাঁকে তিনটে লোককে দেখা গেল। তারা বেরিয়ে এল গাছের ফাঁক থেকে। তাদের একজনের হাতে মস্ত এক বাদামী ঘোড়ার লাগাম ধরা। ঘোড়াটার মুখের কাছে সাদা ছোপ এবং চারটে সাদা মোজা পা।
