বন্ড খুব নরম হয়ে বলে, ও আচ্ছা। কিন্তু মনে মনে ভাবে এ মেয়ের কাছ থেকে কি করে এ-বি-সি-র টেলিফোন নম্বরটা বের করা যায়? বন্ড মনে মনে ভাবল সন্ধ্যাটা আজ মাটি হল। এ কথা ভেবে তার আফসোস হয়। বন্ড বলে, আমি এবার ফিরতে চাই। সে একটিও কথা না বলে বিল মিটিয়ে দেয়। তারপর ঠাণ্ডা রেস্তোরাঁ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। বাইরে গরম ভ্যাপসা রাত।
গাড়িতে উঠতে উঠতে টিফানী বলে, আমি ও অ্যাস্টারে আছি। পেছনের সিটে এক কোণে গিয়ে সে বসে। তারপর বন্ডের দিকে তাকিয়ে থাকে। বন্ড ও কোন কথা বলে না। নিজের এই বিশ্রী কাজের জন্য মনে মনে অভিসম্পাত দিতে থাকে। মেয়েটিকে হয়তো সে একটু আশ্বস্ত করতে পারত, তার এই একাকীত্ব ঘোচাতে পারত একটু। ওর সাথে কোনরকম চালাকি সে করতে চায়নি। অথচ তার কাজই এমন যে ওকে নিজের দরকারে লাগাতে হবে। তবু কাজ যাই হোক, ওকে সে যথেচ্ছ ব্যবহার করবে না।
অ্যাস্টরের সামনে ফুটপাতে বন্ড ওকে ধরে নামায়। বন্ড ট্যাক্স ভাড়া মেটায় আর ও বন্ডের পিঠে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর নীরবে সিঁড়ি বেয়ে ওরা ওপরে ওঠে। লিফ্টম্যানকে বলে, পাঁচতলা। বলে দরজার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকে। পাঁচ তলায় নেমে খুব জোরে জোরে হাঁটতে থাকে। তারপর মেয়েটি তার দরজার সামনে এসে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখে যে বন্ডও তার পেছনে দাঁড়িয়ে। বন্ড লক্ষ্য করল মেয়েটির চোখের পাতা ভেজা। তারপর হঠাৎ মেয়েটি বন্ডের গলা জড়িয়ে ধরে, মুখে মুখ রেখে অনেকক্ষণ ধরে চুমু খেল তারপর বলল, নিজের প্রতি একটু খেয়াল রেখো, জেমস্। আমি তোমাকে হারাতে চাই না। তার সেই চুমুতে ভয়ংকর মমতা ছিল কিন্তু কোন কাম গন্ধ ছিল না। বন্ডও তাকে জড়িয়ে ধরে এবং পাল্টা চুমু খেতে যায়। কিন্তু হঠাৎ যেন মেয়েটি কেমন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। জোর করে ছাড়িয়ে নিল নিজেকে। ছিটকে দরজার কাছে চলে গেল। ফুরিয়ে যায় সেই সুন্দর মুহূর্ত টুকু। দরজার কড়ায় হাত রেখে ও ঘুরে বন্ডের দিকে তাকায়। ওর চোখে সেই অস্বস্তিকর ছায়া। যাও, যাও আমার সামনে থেকে যাও এখন। এই বলে মেয়েটি জোরে দরজাটা বন্ধ করে দেয়।
.
সারাটোগা–র পথে স্টুডিল্যাক
শনিবার সারাদিন বন্ড অ্যাস্টরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে কাটালো। বাইরে গরমে পা দিল না। তারপর তারবার্তার একটা খসড়া তৈরি করল। এই তার যাবে লন্ডনে। ইউনিভার্সাল এক্সপোর্টের চেয়ারম্যান-এর কাছে।
রিপোর্টটা শেষ করল এই ভাবে যে, রুফাস বিসেয় হচ্ছে জ্যাক স্প্যাঙ্গ। হীরাঘটিত চোরাপথ তার কাছাকাছি কোন জায়গা থেকে শুরু হয়েছে আর শেষ হয়েছে জ্যাক স্প্যাঙ্গ-এ এসে। মাঝ পথে রয়েছে শেডী ট্রী। খুব সম্ভব তার মারফত হীরাগুলো হাউস অফ ডায়মন্ডস এ যায়। পরস্পর সেখানে কাটাকুটির পর বাজারে ছাড়া হয়। লন্ডন-কে বন্ড অনুরোধ করে যে, রুফাস বিসেয়-র ওপর যেন কড়া নজর রাখা হয়। এই বলে ও সাবধান করে দেয় যে এ-বি-সি নামে কোন লোক যাবতীয় চোরাই চালানের আসল পাভা। স্প্যাঙ্গড় মব-এর হয়ে সেই সব করে। এই লোকটির হদিশ মনে হয় লন্ডনেই মিলবে। এর পাত্তা করতে পারলে হীরে চুরির আসল রহস্য উদ্ঘাটিত হবে। খুব সম্ভব আফ্রিকার কোন জায়গা থেকে গোপন হীরে আসে। সে আরো জানায় যে, তার ইচ্ছে এই চোরাপথে এগিয়ে সেরাফিমো স্প্যাঙ্গ-কে কজা করতে পারা। এই কাজে টিফানী কেস নামে একজন এজেন্টের সে সাহায্য নিচ্ছে। তারটা পাঠায়। ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে।
বন্ড হোটেলে ফিরে সোজা গিয়ে শুয়ে পড়ে। রবিবার সকাল নটায় ফুটপাতের ধার ঘেঁষে একটা হুডখোলা স্টুডিবেকার এসে থামে। বন্ড তার স্যুটকেস নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল।
স্যুটকেসটা পিছনের সীটে ছুঁড়ে দিয়ে বন্ড গিয়ে লিটারের পাশে বসে। গাড়ি দ্রুত সেন্ট্রাল পার্ক পেরিয়ে ছুটে চলে। লিটার বলল, আমরা টেকেনিক রাস্তা ধরবো। খুব তাড়া যখন নেই তখন আস্তে আস্তে যাই। অকারণ আমি ট্রাফিক পুলিশের হাতে নাজেহাল হতে চাই না। সামনে ছড়ানো ফাঁকা রাস্তা। লিটার গাড়ির গতি বাড়িয়ে সত্তর মাইল স্পীডে ব্রীজটা পেরোয়। ওরা ওয়েস্ট চেষ্টার কাউনটিং চুঙ্গি মানায় গিয়ে পৌঁছায়। পনেরো মিনিট পরে টেকেনিক-এর রাস্তা ধরে। বন্ড সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে করতে চলে। তার মধ্যে অবশ্য টিফানীর কথাও তার মনে পড়ে। সাড়ে বারোটায় ওরা দুপুরের আহারের জন্য গাড়ি থামায়। রাস্তার ধারে লম্বা হোটেল, নাম চিকেন ইন দি বাস্কেট । পাশেই একটা ঝকঝকে জুপ বক্স তাতে লাল নীল আলো জ্বলছে। ঘরের ভেতর এক ডজন কি তার বেশি পাইন কাঠের টেবিল পাতা। দেওয়ালে মেনুর বোর্ড ঝুলছে।
স্ক্র্যা লড এগ, সসেজ, মাখন দেওয়া টোস্ট এবং মিলারের হাইলাইফ বিয়ার দিয়ে যায় চটপট। খেতেও ভাল। বরফ দেওয়া কফি আসে শেষে। দু গ্লাস করে খেতে ওরা দোকান থেকে বের হয়। আবার মারা টোগার পথে পাড়ি দেয়।
বছরে এগারো মাস জায়গাটা যেন শ্মশান হয়ে থাকে। লিটার জানায়। লোক পানি আনতে যায় আসে। রাত নটায় লোক জন সব খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ে। আমেরিকার দুরন্ত ঘোড়দৌড় বলতে এই জায়গা। ভাড়াটে বাড়িগুলো তখন দশগুণ ভাড়া বাড়িয়ে দেয়। রেস কমিটি পুরান গ্যালারিতে রঙচঙ করে। ট্র্যাকের মাঝখানে যে পুকুর আছে, কোত্থেকে যেন হাঁস ধরে এনে তাতে ছেড়ে দেয়। একটা আদিবাসী সালতি-ও বাঁধা থাকে। তারপর ফোয়ারাটা দেয় খুলে। এই আদিবাসী সালতি কি ভাবে এলো, এ কথা কেউ জানে না। বন্ড একথা শুনে হেসে ওঠে। আর কি? এই দেখ বলে সে একটা কাগজের কাটা অংশ পকেট থেকে বার করে। এটা পড়লেই তুমি সব জানতে পারবে। আজ সকালে এটা পোসট থেকে কেটেছি। খেতে খেতে পড়ো। এবারে আমাদের বেরিয়ে পড়া দরকার।
