বড় একটা সিগারেট ধরিয়ে আরাম করে বসে। টিফানী কেস তার পাশ দিয়ে নিচের ডেকে ককটেল লাউঞ্জের দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর এক প্রচণ্ড আওয়াজে তার কানে তালা লেগে যাবার উপক্রম হয়। বিমানটা সজোরে নামছে পঞ্চাশ মাইল নিচে আয়ার্ল্যান্ড-এর পশ্চিম উপকূলে। রাতের খাবার বড় বড় মাংসের ফালি এবং শ্যাম্পেন। তারপর সুন্দর সুন্দর বাটিতে আইরিশ হুইস্কি মেশানো পুরু ক্রীম। দেখতে দেখতে বিমান ১৫০০০ ফিট উঁচুতে উঠে পড়ে। বেশ এক ঘুম ঘুমিয়ে নেয় বন্ড। কেবিনকে রাঙিয়ে দিয়ে পৃথিবীর কানায় কানায় দিনের সূর্য ওঠে। বন্ড খুব খুশী হল। আস্তে আস্তে বিমানটা যেন প্রাণ পায়। বিশ হাজার ফিট নিচে বাড়িগুলোকে দেখায় বিশাল গালিচায় বিছানো চিনির দানার মত।
প্রথমে বি.ও.এ.সি.-র বিশেষ প্রাতঃরাশ আসে। তারপর প্রধান স্টুয়ার্ড আমেরিকার শুল্ক বিভাগের ফর্ম নিয়ে উপস্থিত হয়। রাজস্ব বিভাগের ৬০৬৩ নং ফর্ম। তাতে ছোট ছোট অক্ষরে লেখা ছিল, কোন মিথ্যা বিবৃতি দিলে জেল, জরিমানা দুটোই হতে পারে। বন্ড অম্লান বদনে নিজের মালপত্র বিষয়ে মিথ্যে সই করে দিল।
এরপর আরো তিনঘণ্টা বিমানটি মাঝ-পৃথিবীতে খাড়া ভেসে থাকে। দূরে আঁকাবাঁকা ছড়িয়ে থাকা বোস্টন দেখা যায়। তার একটু পরে কর্ণার মত খোঁচা খোঁচা রেলিংয়ে ঘেরা নিউ জার্সি। বন্ড এর কানে ফের তালা ধরে। প্রচণ্ড শব্দে বিমান ধীরে ধীরে নিউইয়র্ক-এর আবছা শহরতলীর দিকে নামছে। এক সময়ে তারা পৌঁছে গেলো।
.
মহীরূহের ছায়া ঘন হয়
কাস্টমস অফিসারটি বেশ হৃষ্টপুষ্ট লোক। তার ছাই ছাই রঙের সরকারী পোশাকের হাতাটা ঘামে ভিজে উঠেছে। লোকটি অলস ভঙ্গিতে ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়াচ্ছে। বি চিহ্ন দেওয়া সুপার ভাইজারের টেবিলের সামনে বন্ড দাঁড়িয়ে ছিল। কাছেই তার তিনটি মাল রাখা। পাশের দরজাটা-ই হচ্ছে সি চিহ্ন দেওয়া। মেয়েটি ব্যাগ থেকে এক প্যাকেট পার্লামেন্ট বার করে একটি সিগারেট মুখে দেয়। বন্ড সব লক্ষ্য করছে।
মিঃ বন্ড, এই সুটকেসে কি শুধু নিজের জিনিসপত্র রয়েছে?
হ্যাঁ, আর কিছু নেই।
কি আছে। একটা শুল্ক-টিকিট বই থেকে ছিঁড়ে লোকটি তার স্যুটকেসে এঁটে দেয়। অ্যাটাচিকেশটাতেও তাই করে। তারপর আসে গলফ-ক্লাবগুলোর কাছে। টিকিট বইটা হাতে নিয়ে একটু দাঁড়ায়। মুখ তুলে তাকায় বন্ডের দিকে।
আপনি কি শিকার করেন? নিজের হাত কামড়াতে ইচ্ছা করছে বন্ড-এর। ছি-ছি এই মার্কিন কথার ধরন সে বুঝতে পারেনি। ও, আশির মাঝামাঝি বোধহয়।
আমি তো মশাই একশ র কোঠা ছুঁতে পারলাম না। কাস্টমস অফিসারটি জানায়। তারপর সেই অতি আকাঙ্ক্ষিত টিকিটটি ব্যাগের গায়ে এঁটে দেয়। চোরাই মালগুলো যেখানে আছে তার কয়েক ইঞ্চি তফাতে। একসাথে এতো চোরাই মাল আইডল ওয়াইন্ড থেকে কখনও ফসকে গেছে কিনা সন্দেহ।
শেষ ধাক্কা দরজার কাছে ইনসপেক্টার। সেটা পেরোতে পারলেই হয়। লোকটি ঝুঁকে পড়ে দেখে ব্যাগগুলোতে ঠিক টিকিট লাগানো আছে কি না। তার উপরে আবার ছাপ মারে এবং কুলিকে হাত নেড়ে যেতে বলে।
আপনি মিঃ বন্ড?
একটা লম্বা লোক কুতকুতে চোখ, পরেছে কফি-রঙের শার্ট আর গাঢ় বাদামী প্যান্ট। আপনার জন্য গাড়ি নিয়ে। এসেছি। লোকটা যখন ঘুরে বউকে নিয়ে বেরোচ্ছে, তখন বন্ড নজর করে ওর হিপ পকেট চৌকো হয়ে ফুলে আছে। কম ক্যালিবারের অটোমেটিক নিশ্চয়, বন্ড ভাবে। গাড়িটা এক কালো ওল্ডস্ মোবাইল। বন্ডকে আর বলতে হল না। সে আগেই গিয়ে সামনের সীটে বসে পড়ে। মালপত্র থাকে পিছনে। ওরা গাড়ি চালিয়ে এক খালি-রাস্তায় এসে পড়ে। বন্ড ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করে এর পরের ঘটনা কি?
ড্রাইভার এক পলক দৃষ্টি হেনে বলে, শেডি মোলাকাত করতে চায়। বন্ড মনে মনে বিরক্ত হলেও করার কিছুই নেই।
গাড়ি সবেগে ম্যানহাটান-এর বসতি এলাকায় গিয়ে পড়ে। তারপর বহুক্ষণ একটা নদীর পাশে পাশে চলতে থাকে। ওয়েস্ট ফরটি সিক্সথ স্ট্রীটের মাঝামাঝি গিয়ে গাড়িটা থেমে যায়। এ জায়গাটাকে বলা হয় আমেরিকার হ্যাটন-গার্ডেন। সহজে চোখে পড়ে না এমন একটা দরজার কাছে গাড়িটা ঢোকায় ড্রাইভার। কালো পাথরের ওপর রূপালী অক্ষরে লেখা দোকানের নামটি সহজে নজরে আসে না। পাশের একটি দোকান নামটি দি হাউস অব ডায়মন্ডস। ইনকরপোরেশন। ড্রাইভার বন্ডকে বলে, আমরা এবার এসে পড়েছি। বন্ড বেরিয়ে সুটকেশটা বার করে নেয়। ড্রাইভার ক্লাবগুলি হাতিয়ে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। এবার বন্ড ড্রাইভারের পিছু পিছু প্রায় গোপন দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকে। ভেতরে ছোট একটা দালানের মত। দালানের শেষ লিফটের কাছে গিয়ে বন্ড এবং ড্রাইভার দাঁড়ায়। তারা পাঁচতলার বোম টেপে। নিঃশব্দে ওরা ওপরে ওঠে। ওরা গিয়ে একটা কাঁচের দরজার সামনে থামে। ড্রাইভার। দুবার টক্ টক্ শব্দ করেই ভেতরে ঢুকে যায়। বন্ডও তার পেছন পেছন ভেতরে ঢুকে যায়।
টেবিলের সামনে একটি শান্ত গোছের লোক বসেছিল, তার মাথার চুল আশ্চর্য লাল এবং মুখটা চাঁদের মত গোল। লোকটির সামনে এক গ্লাস দুধ রাখা। লোকটির পিঠে একটি কুঁজ আছে। সেই লোকটি বন্ডকে খুব ভালভাবে লক্ষ্য করে। মুখে তার কোন কথা নেই। একটু পরেই বন্ডকে বলল, লন্ডন থেকে আমাকে জানিয়েছে আপনি একটা লোককে সাবাড় করেছেন। আমি ওদের কথা বিশ্বাস করি। এখন আমি দেখছি আপনি তো খুবই পারেন। আমাদের হয়ে আরও কাজ কি আপনি করতে চান?
