.
পথে–প্রবাসে
বৃহস্পতিবার ঠিক সন্ধ্যা ছটার সময় রিজ হোটেলের ঘরে বন্ড তার জিনিসপত্র একটা সুটকেসে গোছাচ্ছিল। পোশাক এর সাথে অ্যাটাচির পেছন দিকের চামড়ার পটির তলায় একটা ছোট মাপে তার পিস্তলের সাইলেন্সার এবং প্রায় তিরিশ রাউন্ডের মত পয়েন্ট টু ফাইভ গুলি ভরে নিতে ভুলল না।
হঠাৎ টেলিফোন বেজে উঠল। বন্ড ভাবে বোধহয় গাড়িটা একটু তাড়াতাড়ি এসে গেছে। কিন্তু হল-পোর্টার জানায়, ইউনিভার্সাল একসপোর্ট থেকে একটি লোক এসেছে একখানা চিঠি নিয়ে। চিঠিটা সে নিজেই বন্ডকে দেবে।
পাঠিয়ে দাও ওপরে।
একটু পরে দরজা খুলে দেয় বন্ড। একটি লোক ভেতরে ঢুকে পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে বন্ডের হাতে দিয়ে বলে, পড়া হয়ে গেলে আমি এটা ফেরত নিয়ে যাবো।
বন্ড খাম খোলে, তার ভেতরে একটা নীল খাম। দেখেই বন্ড বুঝতে পারে এটা এম-এর ব্যক্তিগত চিঠি। লোকটিকে একটি চেয়ারে বসতে বলে নিজে জানালার ধারে গিয়ে টেবিলে বসে। চিঠিতে লেখা?
ওয়াশিংটন জানাচ্ছে রুফাস বি সেয় ওরফে স্যাক স্প্যাংগ হচ্ছে একজন পাকা দুবৃত্ত। তার নাম কেফভার রিপোর্টে আছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে অপরাধের তেমন স্পষ্ট নজির পাওয়া যায় না। সে আর সেরাফিনো স্প্যাংগ হচ্ছে যমজ ভাই। ওরা দুজনে মিলে স্প্যাংগলড মব নামে দলটি চালায়। এই দলের কার্যকলাপ সারা আমেরিকা জুড়ে। এদের একটা ওয়্যার সারভিস ও আছে। নেভাদা আর ক্যালিফোর্নিয়ার বুকমেকারদের বেআইনীভাবে মদত জোগায়। নাম সিওর ফায়ার ওভার সার্ভিস। এই স্প্যাংগল্ড মব আরো নাকি বেআইনী কাজের সাথে যুক্ত। যেমন মাদক দ্রব্য এবং সুগঠিতভাবে বেশ্যাবৃত্তি। এই দিকটা তদারকি করে মাইকেল (শেডী) ট্রী নিউয়র্ক থেকে। পাঁচবার তার বিভিন্ন। অপরাধের জন্য হাজতবাস হয়েছে। রাজ্যে, কেন্দ্রে এবং পুলিশে কলকাঠি ঘোরাবার মত যথেষ্ট প্রভাব তাদের রয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের আগ্রহের কারণ কি তা ওয়াশিংটনকে জানানো হয়নি। যদি কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের হয়–ওই দলের সাথে বিপজ্জনকভাবে মুখোমুখি হতে হয় তাহলে তৎক্ষণাৎ আমাদের জানাবে। ওই কাজ থেকে তোমাকে সরিয়ে নেওয়া হবে। এবং ব্যাপারটা তুলে দেওয়া হবে এফ-বি-আই-র হাতে। এটা আদেশ বলে গণ্য করতে হবে।
চিঠিটা পড়ে ভাঁজ করে নিয়ে বন্ড লোকটির হাতে ফেরত দেয়। লোকটি বেরিয়ে খুব সাবধানে দরজা বন্ধ করে দেয়। বন্ড জানালার কাছে গিয়ে গ্রীন পার্কের দিকে চুপ করে তাকিয়ে থাকে। বন্ড জানে এম-এর মুখ থেকে কথা খসলে তার নড়চড় হবে না। সাথে সাথে এ-ও জানে ব্রিটিশ গুপ্তচরের কাছ থেকে কাজটা আমেরিকানদের হাতে তুলে দিতে এম-এর কতখানি লাগবে।
বন্ড ঘড়ি দেখে ৬-২৫। ঘরটা একবার নজর করে নেয়। এই সময় টেলিফোনটা বেজে ওঠে। আপনার গাড়ি এসে গেছে স্যার। শুনে বন্ড রিসিভার নামিয়ে রাখে। এইবার তাহলে যেতে হবে। ভাবতে ভাবতে আবার জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। সামনে সবুজ গাছের সারি। ওই সবুজ গাছগুলোকে সে আর দেখবে না। এই ছবি মুছে যাওয়ার যন্ত্রণা তার বুকের মধ্যে হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে।
দরজায় ধাক্কা। এক ছোকরা চাকর এসে তার মালগুলো তুলে নিয়ে যায়। বারান্দা দিয়ে যেতে যেতে বন্ড সব ভাবনা চিন্তা মন থেকে মুছে ফেলে। শুধু এক ভাবনা। এই হোটেলের দরজার বাইরে ওদের চোরাপথে ঢোকবার মুখে তার জন্য কি কি বিপদ অপেক্ষা করছে কে জানে!
কালো আর্মস্ট্রং সিডলি গাড়ি, তাতে লাল নম্বর প্লেট। ড্রাইভারের গায়ে উর্দি, হাতে চামড়ার দস্তানা, গাড়ি চালানোর হাত খুব পাকা। কথায় ক্ৰকালনের টান। বন্ড গাড়িতে চুপচাপ বসে ভাবতে থাকে। গ্রেট ওয়েস্ট রোডের কাছাকাছি এসে ড্রাইভার গাড়িটা একধারে দাঁড় করায়। গ্লোভ কমপার্টমেন্ট থেকে ছটা নতুন ডানলপ ৬৫ বল বার করে। বলগুলি কালো কাগজে মোড়া এবং ছাপ মারা। ইঞ্জিন চালু রেখেই সে গাড়ি থেকে বেরোয়। পিছনের দরজা খুলে বন্ড-এর। গলফ ব্যাগে সেগুলো এক এক করে অন্য পুরনো বলের সাথে চালান করে দেয়। বন্ড ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করে। একটিও কথা না বলে ড্রাইভারটি ফের নিজের জায়গায় ফিরে আসে। তারপর গাড়ি আবার চলতে থাকে।
লন্ডন বিমান বন্দরে টিকিট এবং মালপত্রের নিয়ম মাফিক অনুষ্ঠান। বন্ড নির্বিকার। একটা ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ড কেনে।
ওই যে হলুদ আলোটা দেখছেন স্যার ওখানেই ইমিগ্রেশন। ড্রাইভার বন্ডকে শুভরাত্রি জানিয়ে বিদায় নেয়।
বন্ড অ্যাটাচি হাতে নিয়ে এক প্রশান্ত দর্শন যুবকের কাছে তার পাসপোর্ট দেখাল। যুবকটি তার নামের পাশে যাত্রীর তালিকায় দাগ মারে। বন্ড গিয়ে ডিপারচার লাউঞ্জে বসে। তার পিছনেই সে টিফানী কেস-এর নিচু গলা শুনতে পেয়েছিল। নরম সুরে ধন্যবাদ বলছে। পিছু পিছু সে ও এসে লাউঞ্জে বসে। যে চল্লিশজন যাত্রী লাউঞ্জে এসে জড়ো হয়েছে তার মধ্যে একটিও চেনা মুখ নেই।
বিমান কখন ছাড়বে না-ছাড়বে যার দায়িত্ব–সেই মেয়েটি বন্ড-এর খুব কাছাকাছি ছিল। সে এই সময় টেলিফোন তুলে খুব সম্ভব ফ্লাইট কন্ট্রোলের সাথে কথা বলল। বন্ড এবং আর সবাই টারমার্ক পেরিয়ে প্রকাণ্ড বোয়িং-এ গিয়ে ওঠে। প্রধান স্টুয়ার্ড লাউড স্পীকারে ঘোষণা করে যে, বিমান এর পরে গিয়ে থামবে ম্যামনে। সেখানেই রাতের খাওয়া দাওয়া সারা যাবে। সময় লাগবে দেড় ঘণ্টা। ক্যাপ্টেন একটু গতি বাড়ায়, চার চারটে ইঞ্জিন গর্জন করে ওঠে। প্লেনটা কাঁপতে থাকে। তারপর প্রকাণ্ড বিমানটি আস্তে আস্তে অস্তমান সূর্যের দিকে ছোটে। ব্রেকটা ছেড়ে দেওয়ার দরুন একটা ঝাঁকুনি লাগে। শানবাঁধানো দু মাইল রানওয়ে ছেড়ে বি.ও.এ.সি মনার্ক পশ্চিম আকাশে উঠে পড়ে।
