এই কথাগুলো শুনে সেয় সাফ জানিয়ে দেয়, না, যায়নি। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে কোন ভ্রূক্ষেপ না করে গটগট করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।
সার্জেন্ট ভ্যাংকওয়ের্টস অবিচল। সে তার নোট বই পকেটে পুরে, হল ঘর পেরিয়ে রাস্তায় গিয়ে পড়ল। বন্ড-ও তার পিছু নিল।
গাড়িতে উঠে বন্ড কিংস রোডে তার নিজের ফ্ল্যাটের ঠিকানা বলে দিল। চলতে চলতে সার্জেন্ট ভ্যাংকওয়ের্টস মুখ চেপে হাসতে হাসতে বন্ডকে বলল, আমার মনে হয় ওই মাথামোটা লোকটা মোটেই হীরের ব্যাপারী নয়।
বিষাদ রাগিণী।
লম্বা বারান্দা, খা খা করছে। একেবারে শেষ ঘরটি ৩৫০ নম্বর ঘর। বারান্দা দিয়ে যেতে যেতে বন্ডের মনে হয় লিফট চালকটি তাকে খুব লক্ষ্য করছে। এতে সে অবাক হয় না।
ঘরের কাছাকাছি গিয়ে বন্ড পিয়ানোর সুর শুনতে পায়। খুব করুণ সুরে কে যেন পিয়ানো বাজাচ্ছে। ৩৫০ নম্বর ঘরের সামনে গিয়ে বন্ড বুঝতে পারল বাজনাটা ভেতর থেকে আসছে। সে দরজায় ধাক্কা দিল।
ভেতরে আসুন।
বন্ড ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়।
ঘরের মধ্যে একটা লংপ্লেয়ার রেকর্ড বাজছে। শোবার ঘরের দরজাটা হাঁ করে খোলা। টেবিলের তিন দিকে তিনটি আয়না। পিছন ফিরে আয়নায় নিজের ছবি দেখছিল মেয়েটি। তার গায়ে তেমন জামাকাপড় নেই। চেয়ারের পিঠে নিজের নগ্ন হাতটি আড়াআড়িভাবে শুইয়ে তার ওপর চিবুকটি রেখে বসেছিল সে। খোলা পিঠ, তাতে এক জোড়া ব্রেসিয়ারের ফিতে। কালো লেস-এর আঁটো প্যান্ট।
মেয়েটি নিজেকে দেখা থামিয়ে বন্ডকে আয়নায় সংক্ষেপে তদন্ত করে নেয়। আপনি বোধহয় সেই জাহাজের লোক। বসুন না! বসে গান শুনুন।
বাধ্য ছেলের মত বন্ড চেয়ারে বসে একটি সিগারেট ধরায়। তারপর গ্রামোফোনের কাছে উঠে গিয়ে রেকর্ডটা পরখ করে। তার নম্বরটা মুখস্থ করে নেয়। একস ৫০০। গান শুনতে শুনতে বন্ড-এর মনে হয় আয়নার ভেতরে যখন মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে ছিল তখন তার চোখে যে ধার দেখে ছিল সেই ধার ওই রেকর্ডের সুরে। মিস কেস সম্বন্ধে বন্ড এর মনে এরকম কোন ছবি ছিল না, অথচ সেই তাকে ছায়ার মত অনুসরণ করে আমেরিকা যাবে। মেয়েটির শরীরের ইতিবৃত্ত যাই হোক তার ভেতরে কোথায় যেন একটা প্রাণের লক্ষণ আছে।
মেয়েটি কখন চুপিসারে শোবার ঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, সে বাইরে বেরোবার জন্য তৈরি। জামা, জুতো সব দামী, এক হাতে পাতলা সোনার ঘড়ি, আর এক হাতে ভারি সোনার চেন দেওয়া একটা মণিবন্ধ; ডান হাতের মধ্যমাতে একটা হীরে ঝলসাচ্ছে। কানে মুক্তো বসানো দুল। মেয়েটি খুব সুন্দর দেখতে। তার চোখ দুটি অদ্ভুত, তাতে যেন রঙ বদলায়। সেই চোখ এখন বন্ড-এর ওপর। তাতে কোন ভাষা নেই। তাহলে আপনিই হচ্ছেন পিটার ফ্রাংকস? মেয়েটি মিষ্টি গলায় জিজ্ঞেস করল।
বন্ড জবাব দিল, হ্যাঁ।
মেয়েটি কি যেন ভাবল তারপর বলল, এবারে কাজের কথায় আসা যাক।
প্রথমে বলুন একাজ আপনি কেন নিলেন?
একজন টেসে গেছে।
মেয়েটি এবার প্রসঙ্গে পাল্টে বলে, পায়ে কোন খুঁত আছে কি? কোন বিশেষ শখ আছে কি?
বন্ড বলে, আমি খোঁড়া নই আর আমি তাস বা গলফ, খেলি।
মেয়েটি বন্ডকে বলল, একটা মার্কিন ভিসা আর একটা টিকের সার্টিফিকেট ঠিক দুদিনের মধ্যে জোগাড় করতে হবে। এখন তাহলে শুনুন ইমিগ্রেসনে এটা দরকার পড়বে। আপনি স্টেটস-এ যাচ্ছেন ট্রী নামে একটি লোকের কাছে। আপনি নিউইয়র্কে অ্যাস্টর হোটেলে থাকবেন। সে আপনার এক মার্কিন বন্ধু, যুদ্ধের সময় তার সাথে আপনার পরিচয়। ঐ নামে লোক যদিও আছে তবে বন্ধু-বান্ধবদের কাছে সে ছায়াময় বৃক্ষ বলে পরিচিত। বন্ড হেসে ওঠে। মেয়েটি একটি পাঁচ পাউন্ডের টাকার গোছা নিয়ে বন্ড-এর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, ব্রিজ হোটেলে একটি ঘর আপনি ভাড়া করবেন এবং সেখানকার ঠিকানা দেবেন ইমিগ্রেশনকে। আপনি যাচ্ছেন গলফ খেলে ছুটি কাটাতে সুতরাং সেই মত জিনিস একটা স্যুটকেশে ভরবেন। যথা সম্ভব নজর এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করবেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যে বি-ও-এ-সি মনার্ক-এ আপনি নিউ ইয়র্ক যাচ্ছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যে সাড়ে ছটায় গাড়ি রিজ থেকে আপনাকে তুলে নেবে। আর আমি তো লন্ডন এয়ারপোর্টে থাকছিই। ওখানে একজন ড্রাইভার অপেক্ষা করবে সেই আপনাকে বলে দেবে কি করতে হবে। আমি আপনাকে আড়াল থেকে লক্ষ রেখে যাব। আর যদি কোন ঝামেলায় পড়েন তবে ব্রিটিশ কনসালের কাছে দরবার করবেন।
বন্ড এবারে উঠে দাঁড়াল এবং মেয়েটিকে বলল, যদি সব ঠিকঠাক হয়ে যায় তবে কি নিউইয়র্কে আবার আপনার সাথে দেখা হতে পারে?
মেয়েটি ওর দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবে। উত্তর দিতে গিয়ে যেন কথা জড়িয়ে যায়। তারপর আস্তে আস্তে বলে, শুক্রবার তেমন কোন কাজ নেই। রাতের খাওয়াটা আমরা একসাথে খেতে পারি। ফিফটি সেকেন্ড স্ট্রীটে, টোয়েন্টি ওয়ান ক্লাব। ঠিক রাত আটটা। মেয়েটি এবার বলল, একটু তাড়া আছে। সে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে আবার পিছন ফিরে বন্ডের দিকে তাকিয়ে বলে, ঠিক পারবেন আপনি। ঠিক মত করতে পারলে আমি আপনাকে আরো কাজ পাইয়ে দেবো। মেয়েটি দরজা খুলে দেয়।
বন্ড লম্বা বারান্দা পেরিয়ে লিফট-এর দিকে হাঁটতে থাকে। যতক্ষণ না তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে যায় ততক্ষণ মেয়েটি বন্ধ দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর গ্রামোফোনের কাছে গিয়ে একটা রেকর্ড চড়ায়। বাজনা শুনতে শুনতে তার মনে হয়, কে এই লোকটি! হঠাৎ যেন আকাশ ছুঁড়ে তার জীবনে এসে পড়ল। রেকর্ডটা যখন শেষ হয়ে গেল তখন তাকে খুব খুশী খুশী লাগল। বাইরে বের হবার জন্য সে সম্পূর্ণ তৈরি। বাইরে বেরিয়ে সে ঘড়ি দেখে ছটা বেজে দশ মিনিট। ঠিক ছটা পনেরো মিনিটে সে ওয়েলবেক-এর একটা নম্বর ডায়াল করে। কিছুক্ষণ পরে একটা অস্পষ্ট গলায় স্বর ভেসে আসে বল। এই তার না দেখা অদৃশ্য মালিক এবং প্রভু। খুব তাড়াতাড়ি এবং স্পষ্টভাবে মেয়েটি তার কথাগুলো বলে যেতে লাগল। সমস্ত খবর জানাবার পর সে রিসিভারটা নামিয়ে রাখে তারপর হোটেলে ফিরে আসে। একটা বড় ড্রাই মার্টিনি তার ঘরে দিয়ে যেতে বলে। সেটা এলে রেকর্ড বাজায়, তারপর একটা সিগারেট ধরায়। ৭-১৫ পর্যন্ত এইভাবে অপেক্ষা করে। এর মধ্যে ফোন না পেয়ে সে আবার ফিরে গিয়ে ৮-১৫ য় ফোন করে। সেই অস্পষ্ট জড়ানো গলাটা টেলিফোনের তারের ভিতর দিয়ে আবার ভেসে আসে।
