বন্ড যখন ভেবে কোন কুলকিনারা পাচ্ছে না তখন তারা বম্বার্ডটি ঘুরিয়ে নিল একটি পুরানো ভাঙ্গা জেটির দিকে। তীরের কাছে পৌঁছানোর পর সঙ্গে সঙ্গেই অন্ধকারের ভিতর থেকে একটি তীব্র আলো পড়ল তাদের গায়ের উপর। দড়ি দিয়ে নৌকাটি বেঁধে দিল। কাদা মাখা কয়েক ধাপ কাঠের সিঁড়ি। গুণ্ডাদের মধ্যে একজন আগে তীরে উঠে এল, তারপর মেয়েটি, ওর সাঁতারের পোশাকটা খুব স্পষ্ট হয়ে উঠল। তার যৌবনটাও সাথে সাথে চোখে পড়ল। এবার উঠে পড়ল বন্ড আর তার পিছনেই দ্বিতীয় গুণ্ডাটি। এবার দড়ি খুলে দিয়ে বম্বার্ড আবার ছুটতে শুরু করল সে যেখানে যাবে সেই দিকে।
তীরে আরো দু জন দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় একই রকম গড়ন ও হাবভাব। জেটি থেকে একটা সরু পথ বেরিয়ে গেছে। চুপচাপ হাঁটতে শুরু করল তারা। তাদের ঘিরে রয়েছে চারটি লোক। একশ গজ দূরে বালিয়াড়ির ওপাশ থেকে আলোর চিহ্ন এসে চোখে পড়ল। কাছে আসতেই বন্ড দেখতে পেল আলো আসছে এক বিরাট অ্যালুমিনিয়ামে তৈরি মালগাড়ির মধ্যে থেকে। সামনে আছে ড্রাইভারের কেবিন। এই রকমের ট্রাক ফ্রান্সের পথে মাঝে মাঝেই দেখা যায়। শহরে গর্জন করে ছুটে যাচ্ছে, শহর থেকে গ্রামে, ডিজেলের ধোঁয়া ছড়িয়ে আর হাইড্রলিক ব্রেকের শব্দ করে।
কিন্তু এ গাড়ির সব কিছু বনেদি ব্যাপার স্যাপার। গাড়ির গাটা ঝকঝক করছে। যার হাতে ফ্ল্যাশলাইট আছে সে আলো জ্বালিয়ে ইশারা করল। গাড়ির পেছনের দরজাটা খুলে গেল। গাড়িতে ওঠবার আগে প্লেট পড়ল সে, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
গাড়ির ভিতরটা বেশ গরম দেখে খুশি হল। দু পাশের সাজানো কার্ডবোর্ডের বাক্স, মাঝখানে প্যাসেজ, সেখানে ভাঁজ করা কয়েকটি চেয়ার। একটু এগিয়ে গেলেই কেবিনের সারি। ট্রেসী গিয়ে একটা কেবিনের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বন্ডের কোটটা ট্রেসীর হাতেই ছিল, বন্ডকে ফেরত দিয়ে বলল, থ্যাঙ্ক ইউ। গম্ভীর ধন্যবাদ। দরজাটা ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল। দরজা বন্ধ হওয়ার পূর্বেই কেবিনের ভিতরটা এক ঝলক নিয়ে দেখে নিল আর কোটটা গায়ে দিয়ে নিল। পিছনের লোকটা ধমক দিয়ে বলল, যাও শীঘ্র এগিয়ে যাও।
বন্ড একটু ভেবে নিল লোকটার ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে কিনা, কিন্তু তার পিছনে আরো তিনটি লোক আছে। শেষ কেবিনের বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হল তাকে। দরজার ওপাশে রহস্যের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। মনে হয় এটাই ওদের সর্দারের ঘর। হয়ত এবারে একটা সুযোগ এসে যাবে। ট্রাউজারের পকেটে ছুরির হাতলটা সে জোরে চেপে ধরল। হঠাৎ বাঁ-হাতের ধাক্কায় দরজাটা খুলে যেতেই বন্ড ভিতরে ঢুকে গিয়ে আবার পা দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। পকেটের বাইরে উদ্যত হাতে চকচক করে উঠল ছুরিটা।
দরজার বাইরে থেকে লোকগুলি ধাক্কা দিচ্ছে। কিন্তু বন্ড পিঠ দিয়ে আছে দরজায়। তারা দরজাটা খুলতে পারল না। দশ ফুট দূরে টেবিলের ওদিক থেকে তার ছুরির আওতার মধ্যে, লোকটা আনন্দের সাথে কি যেন বলতে চাইল। দরজার ধাক্কাটা থেমে গেল। বন্ড ভাষাটা বুঝতে পারল না।
লোকটি মধুর ভাবে হেসে উঠল। চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে হাত দুটি তুলে বলল, আমি এবার ধরা দিলাম। হ্যাঁ, এবার তুমি আমাকে মারতে পার। কিন্তু আমাকে তোমরা হত্যা কর না, অন্তত যতক্ষণ না আমরা হুইস্কি সোডায় গলাটা ভিজিয়ে নিলাম। তারপর আমি সুযোগ করে দেব। ঠিক আছে? বউ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাসিটা পুনরায় ফিরিয়ে দিল। আর না হেসে সে পারল না। লোকটির মুখটা খুব মিষ্টি। সেই মুখে যে শুধু কৌতুক ছিল তাই নয় ছিল একটা আকর্ষণও। ছুরি চালানোটা মুলতুবি করে রাখল বন্ড।
লোকটির পিছনে একটা ক্যালেন্ডার ছিল। উষ্ম একটু কমানো ভাল। ১৬ই সেপ্টেম্বর ক্যালেন্ডার-এর দিকে তাকিয়ে নিয়ে বন্ড বলল। ছুরিটা এবার সে ছুঁড়ে দিল। লোকটার পাশ থেকে এক ঝলক আলো ছিটকে উঠল। ক্যালেন্ডারে ছুরিটা বিদ্ধ হয়ে গেল। লোকটি কৌতূহল নিয়ে মুখটা ফেরাল। হ্যাঁ ঠিক আছে, ১৬ তারিখই বটে। ভালই বলতে হবে। তোমাকে বরং আমার লোকদের পিছনেই লাগিয়ে দেব। তবে আমি বাজি ধরে বলতে পারি তুমিই ওদের শাস্তি দিতে পারবে।
লোকটি একটা আলমারির পিছন থেকে বেরিয়ে এল। তামাটে রং, মাঝ বয়সী ও আকৃতিটা একটু ছোটখাটো। জামার উপর থেকে বুকটা বেশ স্পস্ট হয়ে দেখা যাচ্ছে। এবার লোকটি তার হাতটা বাড়িয়ে দিল। হাত মেলাল তার হাতে বন্ড। ওর হাতটা গরম অথচ শক্ত। আমার নাম হল মার্ক অ্যাজে ড্রাকো। এবার আমার নামটা জানলে?
আচ্ছা! কিন্তু আমি তোমার নামটা জানি। কমান্ডার জেমস্ বন্ড। অবশ্য তোমার একটা উপাধিও আছে সি, এম, জি। তুমি ইংল্যান্ড সাম্রাজ্যের একজন প্রথম শ্রেণীর গুপ্তচর। অবশ্য তুমি এখন কোন একটি কাজে লিপ্ত নেই। তোমাকে কোন এক বিশেষ কাজে বাইরে পাঠিয়েছে। তার মুখে হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল, ঠিক বলেছি তাই না?
বন্ড বেশ বিরক্ত হল, আর সেটা লুকানোর জন্য সে ক্যালেন্ডার-এর দিকে গিয়ে ছুরিটা তুলে নিল। তারপর পকেটে সেটা ঢুকিয়ে রাখল। মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে বলল, তোমার মনে হচ্ছে তুমি কি ঠিক বলেছ?
সে এই কথার জবাব না দিয়ে বলল, এস আমরা বসি। অনেক কথা তোমাকে এখন বলা দরকার। কিন্তু তার আগে আনা দরকার হুইস্কি ও সোডা, তাই না? একটি আরাম দায়ক একটি কেদারা দেখিয়ে দিল। একটি রূপার বড় বাক্স। ঠেলে দিল বন্ডের দিকে নানা রকমের সিগারেট আছে তার ভিতর। দেওয়ালের কাছে গিয়ে একটি ক্যাবিনেটের ডালা সরিয়ে দিল, দেখল একটি ছোট বার–এক বোতল হেইগ এ্যান্ড হেইগ আর এক বোতল হারপার–দুটোই বার করে আনল। আর নিল দুটি পাইট গ্লাস আর বরফের পাত্র। টেবিলে সাজিয়ে রাখল সব।
