পাইলট সব শুনে বলল, ওদের ওপর চাপ না দেওয়াই ভাল। দরকার হলে ওরা শক্ত হতে পারে। শুধু এদিককার ঘাঁটিতেই গত এক বছরে তিন-তিনটে নোক খতম হয়ে গেছে।
স্মাগলার লোকটি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, ঠিক আছে, শুধু এইটুকুই ওদের বললে হবে যে, একটু অসুবিধার মধ্যে আছি, আমার টাকার খুব প্রয়োজন।
আর দেরি না করে পাইলট ককপিটে গিয়ে ঢোকে। তারপর সিঁড়িটা তুলে নেয়। মাটিতে দাঁড়ানো লোকটি হঠাৎ যেন এক হয়ে যায়। হেলিকপ্টারটা উঁচুতে উঠে দ্রুত ছুটে যায় চাঁদের আলোর পানে। ১,০০,০০০ পাউন্ড হীরেও ওই সাথে চলে যাচ্ছে। গত এক মাস ধরে খনি কাটার সময় স্মাগলারের লোকেরা একটু একটু করে সরিয়েছে, লুকিয়ে রেখেছে তাদের জিভের তলায়। সে নিজে দাঁড়িয়ে থেকেছে দাঁতের ডাক্তারের পাশে। তারপর দাঁত পরীক্ষার আলোর সামনে ওদের মুখগুলো তুলে ধরে। অত্যন্ত নরম গলায় বলতে থাকে–৫০, ৭৫, ১০০;-তারা ঘাড় নেড়ে সায় দেয়। টাকা নিয়ে কাপড়ের খাজে লুকিয়ে রাখে। ওরা নিজেরা কেউ এক টুকরো হীরেও বের করতে পারবে না। ওরা বছরে একবার বেরোতে পারে। তবে একবার ধরা পড়লে তাদের ভবিষ্যৎ ভয়ংকর।
সামনে সিয়েরা লিয়োন-এর সীমান্ত-পাহাড়। লোকটি সরু, এবড়োখেবড়ো পথ দিয়ে তার মোটর সাইকেল ছোটায়। ভোর হবার আগে তাকে বাড়ি পৌঁছতে হবে। ওই ১,০০,০০০ পাউন্ড হীরে মানে ১০০০ পাউন্ড করে টাকা। কিন্তু বেশি দিন নয় ২০,০০০ পাউন্ড যেই হবে তখনই সে ওসব ছেড়ে দেবে। তারপর? লোকটি স্বপ্ন দেখে…রঙিন স্বপ্ন। তার মোটর সাইকেল লাফিয়ে ছুটে চলে।
.
হীরে–জহরতের রঙিন নেশা
জুলাইয়ের শেষ, সুন্দর ঝকঝকে রোদ। বন্ড সুন্দরভাবে কাটা একটা পাথরের টুকরো আলোর সামনে তুলে ধরে। তার আঙুলের ফাঁকে রংধনুর সাতটি রঙ যেন ঝলমল করে ওঠে। M তার দিকে সপ্রশ্নভাবে তাকালেন, কি সুন্দর পাথর, তাই না?
চমৎকার! বন্ড বলে, নিশ্চয়ই এর দাম অনেক। বন্ড স্ফটিকের টুকরোটা মোড়কে পুরে ফেলে দ্বিতীয় নমুনা তুলে নিয়ে পাথরটা আলোতে তুলে ধরে। বিশ ক্যারেটের পাথরটা থেকে নীল-সাদা একরকম অদ্ভুত আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। আলোটা যেন অনেক ভেতর থেকে আসছে। হীরের সেই অদ্ভুত দ্যুতির কাছে আগের পাথরটাকে তার অত্যন্ত নীরস লাগে। হীরেটাকে দেখতে দেখতে বন্ডের মনে হয় এই জন্যই হীরে যুগান্তর ধরে মানুষকে পাগল করেছে। এর সৌন্দর্য এমন নির্মল যে, এর মধ্যে যেন জগতের এক অমোঘ সত্য লুকানো রয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই যেন বন্ড হীরের গোপন রহস্য টের পেয়ে যায়। একটা কাগজের টুকরোর মধ্যে হীরেটাকে মুড়ে রেখে দেয়।
M চেয়ারে হেলান দিয়ে বলেন, আমাকে জানতে হবে এর পেছনে কি দুরন্ত নেশা কাজ করছে! তিনি টেবিলের ওপরে রাখা কাগজের মোড়কগুলো দেখলেন। একটা মোড়ক খুলে বন্ডের দিকে ঠেলে দিয়ে বললেন, এই যেটা দেখছ, এটা একটা সুন্দর শ্বেতকমল–সবচেয়ে সেরা জিনিস। আর এটা হচ্ছে দশ ক্যারেটের টপ-কৃস্টাল । এতে তুমি হাল্কা হলুদ রঙের আভা দেখতে পাবে। এর পরেরটা হল কেপ । এতে বাদামী আভা আছে। এরপর আরো পনের মিনিট ধরে M বন্ডকে সবরকম হীরে লাল, নীল, হলুদ, সবুজ যত রকমের চুনি এবং অন্যান্য রঙিন পাথর আছে তার রহস্য বোঝালেন। শেষে দেখালেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল হীরে।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বন্ড দেখে সাড়ে এগারোটা বাজে। M পাইপটা মুখ থেকে নামিয়ে বন্ডকে জিজ্ঞেস করে, ফ্রান্সে ছুটি কাটিয়ে তুমি কতদিন হল, ফিরেছ?
দু সপ্তাহ স্যার। M বলে, তোমার জন্য এক জবরদস্ত কাজ আমি রেখেছি। শুধু দেখে নিতে চাইছি তুমি পারবে কিনা!
নিশ্চয়ই পারব, স্যার। বন্ড যেন একটু সন্ত্রস্ত বোধ করে।
কাজটাকে তুমি যেন আবার হাল্কা মনে কোরো না, 007। আমি তোমাকে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলি, তারপর তুমি ঠিক করবে–কাজটা করবে কি-না। M বলতে থাকেন, ট্রেজারীর একজন হোমরা-চোমরা বাণিজ্য দপ্তরের সেক্রেটারিকে সাথে নিয়ে আসেন আমার কাছে হীরে-সংক্রান্ত ব্যাপারে। পৃথিবীর বেশির ভাগ হীরে ব্রিটিশ এলাকার খনিগুলোতে আছে এবং তার নব্বই ভাগ বিক্রিবাট্টা হয় লন্ডনে বসেই। পরে ব্রিটিশের হাতে ওই ব্যবসা আসে। বছরে প্রায় পঞ্চাশ মিলিয়ন পাউন্ড করে আয় হয় ওর থেকে। প্রতিবছর কম করে হলেও বিশ লক্ষ পাউন্ডের হীরে আফ্রিকা থেকে চোরাচালান হয়। আমেরিকাই হচ্ছে হীরের সবচেয়ে বড় বাজার। আর এই দরের দুর্দান্ত ক্রিয়াকলাপ চালাতে ওখানকার দুবৃত্তরাই পারে।
বন্ড বলে, মাইন কোম্পানিগুলো কি করে? তারা থামাতে পারে না?
তারা যা করার সবই করেছে। আমাদের সিলিটো যখন এম-১৫ ছেড়ে দেয় তখন ডাবীয়ার্স ওকে নিয়ে নেয়। সে এখন দক্ষিণ আফ্রিকার নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে কাজ করছে। আমি যতদূর শুনেছি তাতে সে তো খুব কড়া রিপোর্ট দিয়েছে এবং নতুন নতুন সব মতলব ভেঁজেছে, যাতে এসব বন্ধ করা যায়। কিন্তু ট্রেজারী আর বাণিজ্য দপ্তর তাতে খুব মাথা ঘামাচ্ছে না। তাদের কথা হল, মাইন কোম্পানিরা আলাদা আলাদাভাবে জিনিসটার সুরাহা করতে পারবে না। তাছাড়া স্মাগল করা হীরের একটা মস্ত প্যাকেট রয়েছে লন্ডনে। প্যাকেটটা যাবে আমেরিকায় এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চ জানে–কে নিয়ে যাবে সেটা। লোকটির ওপর নজর রাখার জন্য আরেকজনও যাচ্ছে। রনি ভ্যালান্স। প্রথম খবরটা পেয়ে ট্রেজারীতে এসে জানায়, ট্রেজারী মারফত বাণিজ্য দপ্তরের মন্ত্রিরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ধরনা দেন। তিনি হুকুম দিয়েছেন, এ ব্যাপারে আমাদের কাজে লাগান যেতে পারে।
