বন্ডের শোবার ঘরটা ঠাণ্ডা ও অন্ধকার। বিশৃঙ্খল বিছানার পাশে এক প্লেট স্যান্ডউইচ ও এক ফ্লাস্ক কফি রাখা আছে। বালিশের ওপর এক টুকরো কাগজ। তার ওপর বড় বড় ছেলেমানুষী হরফে লেখা–আজকের রাতটা তুমি আমার কাছে থাকবে। আমি আমার জানোয়ারদের ছেড়ে যেতে পারছি না। ওরা ভারি চেঁচামেচি করছে। আর তোমাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারব না। মনে রেখ তুমি আমাকে দাসখৎ লিখে দিয়েছ। আমি সাতটায় আসব। ইতি, তোমার হ।
তখন গোধূলী। হানি লনের ওপর দিয়ে এগিয়ে এল যেখানে বসে বসে বন্ড বুরে-অন-দ্য-রস্ এর তৃতীয় গ্লাসটি শেষ করেছিল। তার পরনে সাদাকালো ডোরাকাটা স্কার্ট ও আঁটোসাঁটো হালকা গোলাপী ব্লাউজ। সোনালি চুল থেকে সস্তা শ্যাম্পুর গন্ধ বেরোচ্ছে। ভারি পরিষ্কার ও সুন্দর দেখাচ্ছে। হানি হাত বাড়িয়ে দিল। বন্ড হাতটা নিজের হাতে টেনে নিল। তারপর তার পিছু পিছু হেঁটে চলল আখ ক্ষেতের ভেতর দিয়ে। পায়ে চলা সরু পথ বেয়ে। রাস্তাটা এঁকেবেঁকে অনেক দূর গেছে। দু ধারের মিষ্টি গন্ধে ভরা আখের অরণ্য থেকে শিরশির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তারপর দেখা দিল পরিষ্কার এক টুকরো ঘাস জমির ওপারে বিশাল ভাঙাচোরা পাথরের দেওয়াল। একটা সিঁড়ি নিচের দিকে নেমে এক ভারি দরজার গায়ে শেষ হয়েছে।
হানি দরজার কাছ থেকে ফিরে তাকিয়ে, ভয় পেয়ো না, আখ বড় হয়েছে। জানোয়ারদের প্রায় সবই এখন ঘরের বাইরে।
বন্ড ঠিক বুঝতে পারছিল না জায়গাটা কেমন। ভাসা ভাসা আন্দাজে যে স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালে ঘেরা মেটের মেঝেওয়ালা একটা ঘর হবে। হয়ত কিছু ভাঙাচোরা আসবাবপত্র আছে, আর ন্যাকড়ায় ঢাকা এক বিছানা ও দারুণ বোটকা গন্ধ। সে বেশ সতর্ক ছিল যাতে তার ভাবগতিক দেখে মেয়েটার মন না খারাপ হয়।
কিন্তু তার বদলে ঘরটা এক বিরাট সিগারের বাক্সের মত দেখতে। বেশ পরিচ্ছন্ন। মেঝে আর ছাদ চমৎকার পালিশ করা সীডার কাঠে তৈরি। তার থেকেই সিগারের বাক্সের গন্ধটা বেরুচ্ছে। দেওয়ালে চওড়া বাঁশের প্যানেল। আলো আসছে ঘরের মাঝখানের ঝুলন্ত এক দামী ঝাড়লণ্ঠন থেকে। তার মধ্যে ডজন খানেক মোমবাতি জ্বলছে। দেওয়ালের গায়ে অনেক ওপরে তিনটে চৌকো জানলা। তার ভেতর দিয়ে বন্ড ঘননীল আকাশ ও একঝাঁক তারা দেখতে পেল। বেশ কয়েকটা ভাল ভাল উনবিংশ শতাব্দীর আসবাবপত্র রাখা আছে। ঝাড়লণ্ঠনের নিচে দামী চেহারার সেকেলে রূপার ও কাঁচের বাসনে দুজনের খাবার সাজানো।
বন্ড বলল, কি চমৎকার ঘর, হানি। তোমার কথা শুনে তো আমি ভেবেছিলাম তুমি চিড়িয়াখানা গোছের একটা জায়গায় থাক।
হানি খুশির হাসি হেসে বলল, রূপা আর কাঁচের পুরনো বাসনগুলো আজ বার করেছি। এ কটাই ছিল। সারাদিন ধরে পালিশ করেছি। এর আগে কখনো এ গুলো বার করিনি। বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে, তাই না? জানো, ঐ দেওয়ালের গায়ে সাধারণত ছোট ছোট খাঁচাগুলো রাখি। সঙ্গী হিসেবে ওদের আমার ভারি ভাল লাগে। কিন্তু আজ তুমি আছ বলে… মেয়েটা থেমে গেল। অন্য দরজার দিকে দেখিয়ে বলল, ঐখানে আমার শোবার ঘর। খুব ছোট কিন্তু আমাদের দুজনকে বেশ ধরে যাবে। এবার এসো। খাবারগুলো কিন্তু ঠাণ্ডা–কেবল কাঁকড়া আর ফল।
বন্ড এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে সজোরে চুমু খেল ঠোঁটের ওপর। উজ্জ্বল নীল চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে বলল, হানি তুমি একটি চমৎকার মেয়ে। আমার জানা সবচেয়ে চমৎকার মেয়ের মধ্যে তুমি একজন। আশা করি বাইরের জগৎ তোমাকে খুব বেশি বদলাবে না। সত্যিই কি তুমি অপারেশনটা করতে চাও? তোমার মুখ এখন যেমন আছে। তেমনটিই আমার ভাল লাগে। ভাঙা নাকটা তোমার আর এই সবকিছুর এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
হানি ভুরু কুঁচকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। আজ তুমি ওসব গম্ভীর গম্ভীর কথা বলবে না। আমিও বলব না। আজকের রাত শুধু তোমার আর আমার। ভালবাসার কথা বল। অন্য কোন কথা আমি শুনতে চাই না। কথা দিচ্ছ? এবার এসো। ঐ চেয়ারটায় তুমি বসো।
বন্ড বসল, মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাসল, বেশ কথা দিচ্ছি।
হানি বলল, এইটা মেয়োনাইস। বাজারের নয়। আমি নিজে তৈরি করেছি। রুটিতে মাখন লাগিয়ে নাও। বন্ডের উল্টোদিকের চেয়ারে বসে সে খাওয়া শুরু করল। কিছুক্ষণ পরে, যখন বন্ড বেশ খোশমেজাজে খাচ্ছে বলে মনে হল, সে বলল, এবার তুমি প্রেমের কথা শুরু করতে পার যা কিছু আছে। যা কিছু তুমি জানো।
বন্ড রক্তিম সোনালি মুখটার দিকে তাকাল। চোখ দুটো মোমের আলোয় উজ্জ্বল ও নরম লাগছে। কিন্তু এখনো তাতে ফুটে বেরুচ্ছে সেই রাজকীয় দ্যুতি। প্রথমবার যখন বন্ড সমুদ্রতীরে মেয়েটিকে দেখে, তখনও তার চোখে এই দ্যুতি ছিল। পুরন্ত লাল ঠোঁট দুটো উত্তেজনা ও অধীরতায় বিস্ফারিত। কোন সংকোচ নেই তাতে। তারা যেন দুই প্রেমাসক্ত জন্তু। লজ্জার চিহ্ন নেই মেয়েটার আচরণে। বন্ডকে সে যে কোন প্রশ্ন করে উত্তর চাইতে পারে। যেন দুই প্রেমিকের মত তারা একসঙ্গে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। আঁটো সুতির বডিসের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে তার দুই স্তনাগ্র-কঠিন ও উদ্ধত।
বন্ড বলল, তুমি কি কুমারী?
ঠিক তা নয়। বলেছিলাম তো তোমাকে। সেই লোকটা।
তা …বন্ড আর খেতে পারছে না। মুখের ভেতরটা কেমন শুকিয়ে উঠেছে। বলল, হানি, আমি হয় খেতে পারি না হয় তোমার সঙ্গে প্রেম করতে পারি। দুটো একসঙ্গে হয় না।
