রাজবাড়ির বাইরে নুড়ি বিছানো পথটুকু সূর্যের তাপে যেন ঝলসে যাচ্ছে। হিলম্যান মিংকস গাড়িটার ভেতর টার্কিশ বাথের মত তেতে ছিল। বন্ডের বিক্ষত হাত স্টিয়ারিং হুইল চেপে ধরতে যন্ত্রণায় কুঁচকে গেল।
প্লেডেল স্মিথ জানালা দিয়ে ঝুঁকে পড়ে বললেন, আর কিছু করবার আছে তোমার জন্য? তুমি কি সত্যিই বো ডেজার্টে ফিরে যাবে? ডাক্তারেরা কিন্তু বলছিলেন যে আর এক সপ্তাহ তোমার হাসপাতালে থাকা দরকার।
ধন্যবাদ, বন্ড বলল, কিন্তু আমাকে ফিরতেই হবে। হাসপাতালে একটু বলে দেবে, যে কালকে আবার আমি আসব। আমার কর্তার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছ তো সংকেতটা?
জরুরী বার্তায় পাঠিয়েছি।
ঠিক আছে, তাহলে সেলস্টার্টারে চাপ দিল বন্ড, এই পর্যন্তই। আশা করি জ্যামাইকা ইনস্টিটিউটের কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে মেয়েটার একটা ব্যবস্থা করে দেবে। এই দ্বীপের প্রাকৃতিক ইতিহাস সম্পর্কে মেয়েটা সত্যিই অনেক কিছু জানে। বইপড়া বিদ্যে নয়। ওরা যদি ঠিকমত একটা কাজ দিতে পারে…। মেয়েটার ব্যবস্থা হয়ে গেলে আমি খুব খুশি হই। আমি নিজে ওকে নিউইয়র্ক নিয়ে গিয়ে অপারেশনটা করিয়ে দেব। তার সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই ও কাজ শুরু করতে পারবে। ভাল কথা। বন্ডকে ঈষৎ বিব্রত দেখল, মেয়েটা, বুঝেছ কিনা, সত্যিই খুব চমৎকার। ও নিউইয়র্ক থেকে ফিরে এলে…তুমি আর তোমার স্ত্রী যদি ওর একটু … মানে, দেখাশুনা করতে পার, তো ভাল হয়। যাতে ওকে আগলাবার মত কেউ একজন থাকে।
প্লেডেল স্মিথ হাসলেন। তিনি বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছেন ব্যাপারটা। বললেন, ও নিয়ে চিন্তা করো না। আমার কল্যাণী স্ত্রী এ সকল কাজ বেশ পারে। মেয়েটির দেখাশোনার ভার পেলে ও খুশিই হবে। আর কিছু বলবার নেই তো? বেশ, তোমার সঙ্গে এই সপ্তাহেই আবার দেখা হবে। নিউইয়র্ক যাবার আগে কিন্তু দু-এক রাত্রি আমাদের কাছে থাকতে হবে। তোমাকে মানে তোমাদের অতিথি হিসেবে পেলে আমরা খুব খুশি হব।
ধন্যবাদ! আর অন্যান্য সব সাহায্যের জন্যও অনেক ধন্যবাদ। বন্ড গীয়ার বদলে গাড়ি ছেড়ে দিল। এগিয়ে চলল চওড়া পথ বেয়ে। গাড়ির চাকার সংঘর্ষে ছিটকে যেতে লাগল বাঁকের মাথার নুড়িগুলো। এই রাজবাড়ি, টেনিস, তাসের আজ্ঞা ইত্যাদি থেকে অনেক, অনেক দূরে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে।
সেদিন রাত্রে তারার আলোয় নৈশ অভিযানে তেমন কিছু ঘটেনি, কেউ পিছু নেয়নি তাদের। মেয়েটাই প্রায় সারাক্ষণ নৌকা চালিয়েছে, বন্ড আপত্তি করেনি। সে মরার মত শুয়ে ছিল, এক-দুবার ঘুম ভেঙে শুনতে পেয়েছিল নৌকার গায়ে সমুদ্রের পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, দেখতে পেয়েছিল মেয়েটার শান্ত মুখচ্ছবি। তারপর আবার তার নরম কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
নৌকার তলাটা পাথরের ওপর ঘষে যাওয়ার শব্দে বন্ডের ঘুম ভেঙে গেল। প্রবাল প্রাচীরের গা ঘেঁষে তারা মর্গানস। হারবারে ঢুকছে। চতুর্থীর চাঁদ উঠেছে। প্রবাল প্রাচীরের ভেতরে সমুদ্রের পানি রূপালি আয়নার মত দেখাচ্ছে। উপসাগরের ওপর দিয়ে ভেসে এসে এক টুকরো বেলাভূমির ওপর থামল তারা। নৌকা থেকে নেমে, মখমলের মত লনটা পেরিয়ে বাড়িতে ঢুকতে বন্ডকে হানির সাহায্য নিতে হল। মেয়েটা যতক্ষণ তার জামাকাপড় গা থেকে কেটে কেটে খুলে ফেলছিল, বন্ড ততক্ষণ তাকে মৃদু গলায় গালাগালি দিল। তারপর হানি তাকে শাওয়ারের নিচে নিয়ে গেল। আলোর সামনে তার থ্যাতলানো শরীর দেখেও মেয়েটা কিছু বলল না। জোরে কল খুলে দিল এবং বন্ডের সর্বাঙ্গে সাবান মাখিয়ে গোসল করিয়ে দিল।
তারপর বন্ডকে কলের তলা থেকে এনে খুব আস্তে গায়ের পানি মুছে দিল তোয়ালে দিয়ে। তোয়ালেটা রক্তের দাগে ভরে গেল। শেষে দেখল হানি ওষুধের শিশির দিকে হাত বাড়াচ্ছে। কাতর আর্তনাদ করে উঠল বন্ড। সজোরে ওয়াশবেশিন আঁকড়ে ধরে চোখ বুজল। ওষুধ লাগাবার আগে হানি তার সামনে এসে ঠোঁটে চুমু খেল। নরম গলায় বলল, শক্ত করে ধরে থাক, লক্ষ্মীটি। আর চিৎকার কর। খুব জ্বালা করবে। বলেই সেই মারাত্মক ওষুধ তার সর্বাঙ্গে ঢেলে দিল। তীব্র যন্ত্রণায় বন্ডের চোখ বেয়ে, গাল বেয়ে অশ্রুর স্রোত নেমে এল।
উপসাগরের বুকে তখন ভোরের আলো ফুঠে উঠছে। তারা দুজনে আরাম করে প্রাতঃরাশ খেল। তারপর বন্ড গাড়ি করে অতিকষ্টে কিংসটনের হাসপাতালে পৌঁছল। এমার্জেন্সী বিভাগে সার্জারী কক্ষের সাদা টেবিলে শোয়ানো হল তাকে। প্লেডেল স্মিথকে ডেকে পাঠানো হল। কেউ কোন প্রশ্ন করেনি। ক্ষতগুলোতে মার্থায়য়ালেট ও পোড়া জায়গায় ট্যানিক অয়েন্টমেন্ট লাগানো হল। সুদক্ষ নিগ্রো ডাক্তারটি ডিউটি রিপোর্টে ব্যস্তভাবে অনেক কিছু লিখলেন। কি লিখলেন? অজস্র আঘাত ও পোড়া দাগই বোধহয়। তারপর আগামীকাল থেকে দিন সাতেকের জন্য হাসপাতালে এসে থাকবার কথা দিয়ে বন্ড প্লেডেল স্মিথের সঙ্গে রাজবাড়ি রওনা হল। পরপর কয়েকটা বৈঠক বসল সেখানে। সর্বশেষে এই সর্বোচ্চ পর্যায়ের কনফারেন্স। বন্ড কলোনিয়াল অফিসের মাধ্যমে M-কে ছোট্ট একটি বার্তা পাঠাল। খুব ঠাণ্ডা মেজাজে বার্তার সঙ্গে জুড়ে দিল। দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আবার অসুস্থতার জন্য ছুটি চাই। সার্জনদের রিপোর্ট পাঠানো হচ্ছে। দয়া করে আর্মারারকে জানিয়ে দেবেন যে আগুন-ছোঁড়া যন্ত্রের সামনে স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন কোন কাজে লাগেনি। ইতি।
