আমি ব্রিগ্রেডিয়ারের সঙ্গে একমত, স্যার। পুলিশ সুপারিন্টেডেন্ট ধারাল গলায় বললেন–এখনও যদি রীতিমত তাড়াতাড়ি হাত চালাতে পারেন, তাহলে হয়তো বড় কর্তাদের বকুনির হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। বললেন, তাছাড়া এ ব্যাপারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জ্যামাইকানদের বিরুদ্ধে এখুনি ব্যবস্থা অবলম্বন করা দরকার। মোনা সরোবরে ডুবুরী নামাতে হবে। মিস্টার ইয়ে কম্যান্ডার বন্ড বলেছেন যে সেই নিগ্রো গুণ্ডারা এতক্ষণে কিউবা পালিয়ে গিয়ে থাকবে। সুতরাং আমাকে হাভানায় পুলিশ প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঐ গুণ্ডারা যাতে পাহাড়ে পালিয়ে যাবার বা গা ঢাকা দেবার আগেই ধরা পড়ে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। আমার মত এক্ষুনি আমাদের কাজে লেগে পড়া উচিত, স্যার।
আপনার কি মনে হয়, কালোনিয়াল সেক্রেটারি, রাজ্যপাল তাড়াতাড়ি প্রশ্ন করলেন।
বন্ড প্লেডেল স্মিথের জবাবের প্রথম ক-টা কথা শুনল। বোঝা গেল যে তিনি অন্য দুজনের সঙ্গে একমত। তারপর আর সে কিছু শুনল না। তার মন ভেসে গেল অনেক দূরে। মনে পড়ল ক্র্যাব কী-র কথা, মনে পড়ল সেই বিশ্রী গরম হাওয়ার কথা, জলাভূমি থেকে উঠে আসা দুর্গন্ধ মার্শ গ্যাসের কথা। পাখিদের বসতিতে পাখিরা এখন অগভীর পানিতে মাছ ধরছে, লড়াই করছে, বা বাসা বাঁধছে। অনেক ওপরে গুয়ানেরা-র গায়ে গুয়ানে পাখিরা প্রাতঃরাশ সেরে এসে তাদের দৈনিক ভাড়া জমা করছে। অবশ্য দ্বীপের মালিক আর কোনদিন সে ভাড়া গুণে নিতে আসবেন না।
দ্বীপের মালিক এখন কোথায়? ব্লা জাহাজের লোকেরা নিশ্চয়ই তার দেহ গুয়ানোর স্তূপ খুড়ে বার করেছে। তারা প্রথমে দেখবে সে দেহে প্রাণের চিহ্ন আছে কিনা। তারপর কোথাও সরিয়ে রাখবে। তারা কি তার দেহ থেকে হলুদ রঙের গুড়ো ঝেড়ে ফেলে তার কিমানোটা পরিয়ে দেবে? আচ্ছা, ডক্টর নো-র আত্মা কোথায় গেছে। ভদ্রলোক কি সত্যিই খারাপ ছিলেন, না কি একটু পাগলাটে।
জলাভূমির বুকে কোয়ারেলের পোড়া, কোঁকড়ানো দেহের কথা তার মনে পড়ল। তার বিশাল শরীরের সহজ চালচলন, তার ধূসর, দিগন্ত প্রসারী নিষ্পাপ চোখের দৃষ্টি, তার নির্দোষ কামনা, লালসা, কুসংস্কার ও প্রবৃত্তির ওপর তার দৃঢ় বিশ্বাস, ছেলেমানুষি ভুলভ্রান্তি সবকিছু বন্ডের মনে পড়ল। সে ভুলতে পারবে না কোয়ারেলের উষ্ণতার কথা–হ্যাঁ, উষ্ণতা ছাড়া অন্য কোন কথা খাটে না। ডক্টর নো যেখানে গেছেন, কোয়ারেল নিশ্চয় সেখানে যায়নি। মরণের পর যাই হোক না কেন, প্রাণের উত্তাপে ভরা একজন মানুষ এবং আর একজন ঠাণ্ডা মনের মানুষ কখনো এক জায়গায় যেতে পারে না। আচ্ছা, সময় যখন আসবে, বন্ড তখন কোন জায়গায় যাবে?
কলোনিয়াল সেক্রেটারি বন্ডকে নিয়ে কি যেন বলছেন। বন্ড এবার সেদিকে মন দিল।
..তিনি মৃত্যুকে পরাস্ত করেছেন, তা সত্যিই অসাধারণ। আমার ধারণা স্যার, যে কম্যান্ডার বন্ডও তাঁর সংস্থার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হলে তার কথামতই চলা উচিত। মনে হয় বারো আনা কাজ তিনি ইতিমধ্যেই সেরেছেন। অন্তত বাকি চার আনা কাজের দায়িত্ব আমরা নিশ্চয় নিতে পারি।
রাজ্যপালের নাক দিয়ে অসন্তুষ্ট আওয়াজ বের হল। একবার আড়চোখে বন্ডের দিকে তিনি তাকালেন। লোকটা এদিকে তেমন মনোযোগ দিচ্ছে বলে মনে হয় না। অবশ্য এই গুপ্তচরগুলোর ব্যাপার স্যাপার বোঝা মুশকিল। ধারে কাছে থাকা ভারি বিপজ্জনক–সর্বক্ষণ যেন খুঁতখুঁত করছে আর উঁকিঝুঁকি মারছে। এদের বড়কর্তার আবার মন্ত্রীমহলে দারুণ হাত আছে। একবার তার বিপক্ষে গিয়ে খুব ঝামেলা হয়েছিল। নর্ভিক কে এই অভিযানে পাঠানো নিয়ে কথা উঠবে। খবর বেরিয়ে পড়বে নির্ঘাত। সারা পৃথিবীর সাংবাদিকেরা এসে ঘাড়ে চড়াও হবে। কিন্তু সহসা রাজ্যপালের মনশ্চক্ষে ভেসে উঠল খবরের কাগজের হেডলাইন।
রাজ্যপালের ঝটিকা অভিযান …দ্বীপের মালিকের বাধাপ্রদান …নৌবাহিনীর আক্রমণ। এভাবে এগোলেই সুবিধে হবে। সশরীরে গিয়ে নৌবাহিনীতে রওনা করে দিয়ে এলে তো আরো ভাল হয়। আরে হ্যাঁ, তাই তো! আজ যে গ্রীনার কাগজের মিঃ কারগিলির সঙ্গে লাঞ্চ খাওয়ার কথা। ভদ্রলোককে দু একটা তাক মাফিক ইঙ্গিত দিয়ে দিতে পারলেই যথাসময়ে খবরটা ফলাও করে ছাপা হবে সন্দেহ নেই। হুম, ঠিক আছে। এই পথেই এগোতে হবে।
রাজ্যপাল তাঁর দু হাত উপুড় করে টেবিলের ওপর নামিয়ে আনলেন আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে। বৈঠকের সবাইকে এক টুকরো তিক্ত পরাজয়ের হাসি দিয়ে অভিষিক্ত করে তিনি বললেন, আমার মত তাহলে ধোপে টিকল না, বন্ধুগণ। ঠিক আছে, আপনাদের অভিমত মেনে নিচ্ছি। কালোনিয়াল সেক্রেটারি, আপনি একবার নর্ভিক জাহাজের কম্যান্ডিং অফিসারের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে পরিস্থিতিটা বুঝিয়ে দেবেন। মনে রাখবেন আর কেউ যেন খবরটা জানতে না পারে। ব্রিগেডিয়ার, সৈন্য পরিচালনার ভার আপনার ওপর রইল। সুপারিন্টেন্ডেন্ট, আপনাকে যা যা করতে হবে আমি যথাসময়ে জানাব।
রাজ্যপাল উঠে দাঁড়ালেন। রাজকীয় ভঙ্গিতে বন্ডের দিকে অল্প মাথা হেলিয়ে বললেন, এখন বাকি রইল শুধু কম্যান্ডার কি যেন,..হ্যাঁ, বন্ডকে এই ব্যাপারে তার ভূমিকার জন্য আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। কম্যান্ডার, রাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আপনার সহযোগিতায় কথা উল্লেখ করতে আমি ভুলব না।
