ভদ্রলোক ভাবতেন সব কিছু তার জানা আছে। বোকা বুড়ো কোথাকার। যেন একজন বোকা-সোকা স্কুল মাস্টারের কথা বলছে বন্ডকে। প্রথমত, জন্তু-জানোয়ারদের ছোঁয়া আমার একটুও খারাপ লাগে না। আর কেউ যদি চুপচাপ শুয়ে। থাকে আর তার গায়ে খোলা ঘা-টা কিছু না থাকে, তাহলে এই কাঁকড়ারা কখনো তাকে টুকরোয় না। কারণ মাংস ওরা মোটেই পছন্দ করে না। শেকড় বাকড় ওদের প্রধান খাদ্য। ঐ যে উনি বলছিলেন আরেকটি নিগ্রো মেয়েকে উনি। এইভাবে মেরেছেন, তা যদি সত্যি হয়, তার মানে হচ্ছে, হয় মেয়েটার গায়ে কোন ভোলা ঘা ছিল নয়তো সে ভয়ের চোটে মারা গেছে। উনি বোধহয় দেখতে চেয়েছিলেন যে আমি এটা সহ্য করতে পারি কিনা। বজ্জাত বুড়ো কোথাকার। নৈশভোজের সময় আমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। তার কারণ, আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে এর চেয়ে অনেক বিশ্রী ব্যবস্থা তোমার জন্য করা হয়েছে।
তাজ্জব ব্যাপার। আরো আগে জানতে পারলে বড় ভাল হত। আমি তো কেবল ভাবছিলাম যে তোমাকে কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে।
মেয়েটা একটু চটা গলায়– অবশ্য ওরা যখন আমার জামাকাপড় খুলে নিয়ে মাটির ওপর খুঁটির সঙ্গে বাঁধছিল, তখন মোটেই ভাল লাগেনি। তবে নিগ্রোগুলো আমার শরীরে হাত দিতে সাহস পায়নি। একটু ঠাট্টা ইয়ার্কি করেই চলে গেল। পাথরের ওপর শুয়ে থাকতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু আমি ভাবছিলাম তোমার কথা, আর কি করে ডক্টর নো-কে খতম করা যায়।
তারপর শুনতে পেলাম কাঁকড়ারা দৌড় শুরু করেছে। জ্যামাইকায় ওদের এই অভিযানকে দৌড়নো বলা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে বেশ জোরে আর খটাখট আওয়াজ করতে করতে তারা এসে পড়ল। বেশ কয়েকশ হবে। আমি চুপচাপ শুয়ে তোমার কথা ভাবছিলাম। ওদের অনেকে আমাকে ঘুরে চলে গেল, অনেকে আবার আমার গায়ের ওপর দিয়ে গেল। আমাকে একটা পাথরের চেয়ে বেশি আমল দিল না। একটু সুড়সুড়ি হচ্ছিল। একটা কাঁকড়া আমার চুলের। গোড়া ধরে টানাটানি করে বিরক্ত করছিল। তদের ওদের গায়ের গন্ধ কিন্তু খারাপ নয়। আমি কেবল ভোরের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। যখন তারা সবাই গুটি গুটি গর্তে গিয়ে ঘুমোবে। কাঁকড়াগুলো আমাকে সঙ্গ দেওয়ায় আমার বেশ ভাল লাগছিল।
তারপর তাদের সংখ্যা কমতে লাগল। শেষে আর কেউ যখন এল না তখন আমি হাত পা নাড়তে লাগলাম। সবকটা খোটা টেনে দেখলাম। ডানহাতের খোটাটার ওপর বেশি মন দিলাম। অনেক চেষ্টার পর সেটাকে পাথরের খাজ থেকে উপড়ে ফেললাম। তারপরের কাজ নেহাৎ সোজা, উঠে পড়ে ঘর বাড়িগুলোর মধ্যে খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম। গ্যারেজের কাছে মেশিনঘরের মধ্যে পেলাম এই নোংরা পোশাকটা।
তারপর দেখি কনভেয়ার বেল্টটা চলতে শুরু করল। ভেবে দেখলাম এটা করে নিশ্চয়ই পাহাড়ের ভেতর দিয়ে গুয়ানো বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আমি ভেবেছি তুমি এতক্ষণে মরে গেছ। বেশ সহজভাবেই বলল, তাই ভাবলাম। যেমন করে হোক ঐ কনভেয়ার বেয়ে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে ওপারে পৌঁছে ডক্টর নো-কে খুন করব। সেজন্য একটা ক্রু ড্রাইভার পর্যন্ত জোগাড় করেছিলাম। মেয়েটা খিলখিল করে হেসে, আমাদের যখন ধাক্কা লাগল, তখন ওটা পকেট থেকে বার করতে পারলাম না। নইলে নির্ঘাৎ তোমার পেটে ঢুকিয়ে দিতাম। ডার্লিং, আশা করি আমাদের লড়াইয়ের সময় তোমার খুব বেশি লাগেনি। ধাইমা আমাকে বলেছিল, পুরুষমানুষদের ঐ জায়গাটায় আঘাত করতে হয়।
বন্ড হেসে উঠল, বলেছিলেন বুঝি? সত্যি? হাত বাড়িয়ে মেয়েটার চুল ধরে তার মুখটা নিজের মুখের ওপর টেনে আনল। মেয়েটার ঠোঁট দুটো বন্ডের গালের ওপর দিয়ে আস্তে আস্তে সরে এল। তারপরেই আটকে গেল।
যন্ত্রটা হঠাৎ একদিকে হেলে পড়ল। তাদের চুম্বন শেষ হল। তারা নদীর মুখে এসে পড়েছে। ধাক্কা লেগেছে সেখানকার গাছপালার শেকড়ের সঙ্গে।
.
দাসখৎ
আপনি কি এ সব বিষয়ে একেবারে নিশ্চিত।
অস্থায়ী রাজ্যপালের দুই চোখে ভীত ও ক্রুদ্ধ দৃষ্টি। জ্যামাইকার অধীনস্থ এক দ্বীপে, তাঁর নাকের ওপর এরকম সাংঘাতিক সব কারবার চলছিল কি করে? কলোনিয়াল অফিস এ জন্য কি কৈফিয়ৎ দেবে? ইতিমধ্যেই তিনি মানসচক্ষে দেখতে পাচ্ছেন সেই লম্বা, হালকা নীল রঙের খামে মোড়া চিঠিটা, যার ওপরে লেখা থাকবে, ব্যক্তিগত। কেবলমাত্র পত্র প্রাপকের জন্য, আর ভেতরে খুব চওড়া মার্জিন দেওয়া ফুল্যাপ পাতায় লেখা, উপনিবেশ বিষয়ক রাষ্ট্রমন্ত্রী মহাশয় আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন আপনাকে জানাবার জন্য যে, তিনি অতীব বিস্ময়ের সহিত…।
হ্যাঁ, স্যার। আমি নিশ্চিত। ভদ্রলোকের ওপর বন্ডের একটুও সহানুভূতি ছিল না। গতবার রাজবাড়িতে সে যে রকম অভ্যর্থনা পেয়েছিল, আর ইনি স্ট্র্যাংওয়েজ ও মেয়েটি সম্পর্কে যে সব নিচ মন্তব্য করেছিলেন, তা বন্ডের ভাল লাগেনি। এখন আরো খারাপ লাগছে কারণ সে জানতে পেরেছে যে তার বন্ধু ও সেই মেয়েটি এখন নোনা সরোবরের তলায় শেষ শয্যায় শায়িত।
ইয়ে–তা দেখুন, সাংবাদিকরা যেন এ ব্যাপারে কিছু জানতে না পারে। বুঝেছেন তো? পরের ডাকেই আমি রাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমার রিপোর্ট পাঠাচ্ছি। আমার বিশ্বাস আপনাদের ওপর আমি বিশ্বাস রাখতে পারি যে…
মাফ করবেন, স্যার। ক্যারিবিয়ান প্রতিরক্ষা বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার ইন কম্যান্ড একজন নতুন যুগের সৈনিক। বয়স পঁয়ত্রিশ বছর। সৈনিক হিসেবে যথেষ্ট সাফল্যের পরিচয় তিনি দিয়েছেন এবং সেই জন্যেই সেই সব ভিক্টোরীয় যুগের ঔপনিবেশিক রাজ্যপালদের মার্কামারা কায়দার ওপর তার তেমন শ্রদ্ধা ছিল না। তিনি বললেন, আমাদের মনে হয় কম্যান্ডার বন্ড তার নিজস্ব বিভাগ ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চাইবেন না। আর আমার নিজের মত যদি জানতে চান, স্যার, আমি বলব, লন্ডনের সম্মতির জন্য বসে না থেকে আমাদের অবিলম্বে ক্র্যাব-কী দ্বীপ সাফ করে ফেলবার ব্যবস্থা করা উচিত। আজ সন্ধ্যার মধ্যে আমি এক প্লাটুন নৌ-সেনাকে জাহাজে চড়বার জন্য তৈরি করে দিতে পারি। ব্রিটিশ নৌবাহিনী নর্ভিক জাহাজ গতকাল জ্যামাইকায় এসে পৌঁছেছে। যদি সেই জাহাজের অভ্যর্থনা ককটেল পার্টি ইত্যাদি ব্যাপারগুলো দিন দুয়েক পিছিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সেই জাহাজেই বিগ্রেডিয়ার তার পিটুকু অর্ধস্ফুট করে ছেড়ে দিলেন।
