পেট্রোল মাপার যন্ত্রের কাঁটা পুরো ঘুরে গিয়ে জানাল যে ট্যাংক ভর্তি আছে। এই হতচ্ছাড়া যন্ত্রটা যেন তাড়াতাড়ি স্টার্ট নেয়। কোন কোন ডিজেল গাড়ি বড় সময় নেয় চালু হতে। বন্ড সজোরে স্টার্টারের ওপর পায়ের চাপ দিল।
তীক্ষ্ণ খনখনে আওয়াজে কানে যেন তালা লেগে গেল। শব্দটা নিশ্চয় এ তল্লাটের সবাই শুনতে পেয়েছে। বন্ড একটু থেমে আবার চেষ্টা করল। আবার গাড়ির ইঞ্জিন খানিক ফটফট আওয়াজ করে থেমে গেল। আরেকবার চেষ্টা করল। সে। এবার ব্যাটা স্টার্ট নিল–জোরাল ধক ধক্ আওয়াজটা শুরু হল। এবার গীয়ার বদলাও। কোনটা হবে? এইটা টেনে দেখা যাক। হুম্ কাজ হচ্ছে। বন্ধ কর গাধা কোথাকার। বাপস্। আরেকটু হলেই হয়েছিল আর কি! কিন্তু এতক্ষণে তারা গ্যারেজ থেকে রাস্তায় নেমে এসেছে। বন্ড প্রাণপণে অ্যাকসিলেটারে পা দাবাল।
কেউ পিছু নিয়েছে বন্ড চিৎকার করে বলল, নইলে তার গলা ডিজেলের আওয়াজে চাপা পড়ে যেত।
না। দাঁড়াও! হ্যাঁ, একটা লোক কুটির থেকে বেরিয়ে আসছে। আরেকজন। আমাদের দিকে হাত নাড়ছে আর চেঁচাচ্ছে। এবার আরও অনেকে বেরিয়ে আসছে। তাদের একজন দৌড়ে ডানদিকে চলে গেল। আরেকজন ফিরে গেল কুটিরের ভেতর। একটা রাইফেল হাতে নিয়ে বেরিয়ে এল। উপুড় হয়ে শুল। গুলি চালাচ্ছে।
ফুটোটা বন্ধ করে দাও। শুয়ে পড় মেঝের ওপর। বন্ড স্পীডোমিটারের দিকে তাকাল। ঘণ্টায় কুড়ি মাইল বেগে চলেছে। আর এখন তারা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নামছে। এখনই এই। এই গাড়িটা এর চেয়ে জোরে চালানো অসম্ভব। কেবিনের গায়ে যেন এক লৌহমুষ্টি এসে আঘাত করল। তারপর আরেকটা। কতদূর থেকে গুলি চালাচ্ছে? চারশ গজ? ভাল ছুঁড়ছে বলতে হবে। গুলিতে অবশ্য কোন ক্ষতি হওয়া সম্ভব নয়। চিৎকার করে বলল, একবার বাইরেটা দেখ তো, হানি। ফটোটা ইঞ্চিখানেক ফাঁক করে উঁকি মার।
লোকটা উঠে পড়েছে। আর গুলি চালাচ্ছে না। ওরা সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে অনেক লোক। দাঁড়াও, আরো কিছু আছে। হ্যাঁ, কুকুরগুলো আসছে! সঙ্গে কেউ নেই। কেবল আমাদের পেছনে ছুটে আসছে। আমাদের ধরে ফেলবে না তো?
ফেললেও কিছু এসে যায় না। আমার পাশে এসে বসো, হানি। শক্ত করে বসে থাক। ছাদে মাথা ঢুকে না যায়। যেন। মেয়েটা পাশে এসে বসল। তার দিকে হেসে বন্ড বলল, দারুণ ব্যাপার, হানি। পালাতে পেরেছি আমরা। দীঘিতে পৌঁছে কিছুক্ষণ সময় নিয়ে থেকে কয়েকটা কুকুরকে গুলি মারব। যতদূর জানি, একটাকে মারলেই বাকি দলটা তাকে খাবার জন্য দাঁড়িয়ে পড়বে।
বন্ড ঘাড়ের কাছে মেয়েটার হাতের স্পর্শ পেল। গাড়ি পথ বেয়ে এগিয়ে চলল, এঁকেবেঁকে, গর্জন করতে করতে। মেয়েটা হাত সরাল না। দীঘিতে পৌঁছে পানির ওপর দিয়ে পঞ্চাশ গজ এগিয়ে গেল বন্ড, তারপর গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে থামিয়ে দিল। চৌকা ফুটোটা দিয়ে দেখতে পেল কুকুরের দল স্রোতের মত শেষ বাকাটা পেরিয়ে ছুটে চলেছে। রাইফেল তুলে নিয়ে সে ফুটোটার মধ্যে দিয়ে বাগিয়ে ধরল।
কুকুরগুলো পানিতে নেমে পড়ল। সাঁতার কেটে এগিয়ে আসছে।
বন্ড ট্রিগারের ওপর আঙুল রেখে তাদের ওপর একঝাঁক গুলি চালাল। একটা কুকুর উল্টে পড়ে গেল, তারপর আর একটা। ইঞ্জিনের তীক্ষ্ণ শব্দ ছাপিয়ে তাদের ক্রুদ্ধ গর্জন শোনা গেল। রক্তে লাল হয়ে উঠল দীঘির পানি। একটা লড়াই শুরু হয়েছে। বন্ড দেখল একটা কুকুর আর একটা আহত কুকুরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দেখতে দেখতে সবকটা কুকুর পাগলের মত কামড়াকামড়ি শুরু করল। রক্ত ও ফেনায় ভরা দীঘির পানি তোলপাড় করে তুলল।
বন্ড বাকি ক টা গুলি তাদের দিকে চালিয়ে রাইফেল মেঝেতে ফেলল। বলল, এতেই হবে হানি। তারপর যন্ত্রের গীয়ার বদলে, মুখ ঘুরিয়ে মৃদুমন্দ গতিতে চালিয়ে দিল অগভীর পানির ওপর দিয়ে। এগিয়ে চলল দূরের সেই ঝোঁপঝাড়ের দিকে, যেখান থেকে নদী শুরু হয়েছে।
মিনিট পাঁচেক তারা নিঃশব্দে এগিয়ে গেল। তারপর বন্ড মেয়েটার হাঁটুর ওপর হাত রেখে বলল, আর বোধহয় ভয় নেই হানি। কর্তামশাই মারা পড়েছেন দেখে সবাই ঘাবড়ে যাবে। ওদের মধ্যে যারা একটু বেশি চালাক, তারা যেমন করে হোক প্লেনে বা লঞ্চে চড়ে পালিয়ে যাবে কিউবা। তারা নিজেদের মাথা বাঁচাতেই ব্যস্ত থাকবে, আমাদের কথা ভাববার সময় থাকবে না। অবশ্য এমনিতেও আমরা অন্ধকার হবার আগে নৌকা পানিতে ভাসাচ্ছি না। এখন বোধহয় দশটা বাজে। একঘণ্টার মধ্যেই উপকূলে পৌঁছে যাব। তারপর আমরা লম্বা বিশ্রাম নিয়ে নৌকাযাত্রার জন্য শরীর চাঙা করে নেব। আবহাওয়া ভালই আছে। আর আজ আরো বেশি চাঁদের আলো থাকবে। নৌকা চালিয়ে জ্যামাইকা পৌঁছতে পারবে তো? তোমার কি মনে হয়?
মেয়েটা বন্ডের ঘাড়ে চাপ দিল, নিশ্চয়ই পারব জেমস্। কিন্তু তোমার অবস্থা কি? সারা গায়ে কাটা ছেঁড়া। আর পোড়া দাগ! পেটের ওপর ঐ লাল দাগগুলো কিসের?
পরে বলব। সব সেরে যাবে। গতরাত্রে তোমার কি হয়েছিল বল দেখি। ঐ কাকড়াগুলোর হাত থেকে বাঁচলে কি করে? সারারাত ধরে আমি কেবল ভেবেছি যে তোমাকে ঠুকরে ঠুকরে শেষ করেছে। উঃ মতলব বার করেছিল বটে একখানা। কি হয়েছিল শুনি?
মেয়েটা খুব হাসতে লাগল। বন্ড পাশের দিকে তাকাল। মেয়েটার সোনালি চুল এলোমেলো হয়ে গেছে আর নীল চোখ দুটো অনিদ্রায় ভারি হয়েছে। কিন্তু তাছাড়া তাকে এত ভাল দেখাচ্ছে, যেন এক নৈশভোজ থেকে বেশি রাত করে বাড়ি ফিরছে।
