সুড়ঙ্গটা যেন আর ফুরোতে চাইছে না। তার পেছনে হানি হোঁচট খেল। থেমে গেল বন্ড। মনে মনে নিজেকে গালাগালি দিল বন্ড মেয়েটার কথা না ভাববার জন্য। মেয়েটাকে তার দিকে হাত বাড়াল এবং খানিকক্ষণ তার ওপর ভর দিয়ে হাঁপাতে লাগল। বলল, আমি দুঃখিত জেমস। হয়েছে কি…
বন্ড তাকে কাছে টেনে নিয়ে, তোমার কি কোথাও চোট লেগেছে হানি?
না, সে সব ঠিক আছে। হয়েছে কি, ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। আর পাথরে লেগে পায়ের পাতা কেটে কেটে গেছে। অন্ধকারে অনেকবার হোঁচট খেয়েছি। এবার একটু আস্তে চল না। আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি। মেশিনঘরের আগেই গ্যারেজে ঢোকবার একটা জায়গা আছে। সেখান দিয়ে ঢুকলে হয় না?
বন্ড তাকে একটু আদর করে বলল, আমি ঠিক এইটাই খুঁজছিলাম হানি। ওটাই পালাবার একমাত্র উপায়। তুমি যদি কোনরকমে গ্যারেজ পর্যন্ত আসতে পার তাহলে একটা চমৎকার পালাবার সুযোগ পাব আমরা।
বন্ড মেয়েটার পায়ের দিকে তাকানোর ইচ্ছে জোর করে দমন করল। কারণ সে জানতো যে তার দুই পায়ের অবস্থা নিশ্চয়ই খুব খারাপ। এখন পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি দেখাবার সময় নয়। তারা আবার চলতে শুরু করল। অতিরিক্ত খাটুনিতে বন্ডের মুখে যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠেছে। আর মেয়েটা পায়ে পায়ে পাথরের বুকে রক্তাক্ত পদচিহ্ন ফেলে চলেছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মেয়েটা উত্তেজিতভাবে ফিসফিস করে উঠল। আর সুড়ঙ্গের দেওয়ালে দেখা দিল একটা কাঠের দরজা। দরজাটা খোলা। ভেতর থেকে কোনরকম সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।
বন্ড রিভলভার বার করে তার সাহায্যে দরজাটাকে আস্তে করে খুলে দিল। লম্বা গ্যারেজটা সম্পূর্ণ নির্জন। নিওন আলোর নিচে কালো আর সোনালি রং করা ড্রাগনটাকে বড় বিচিত্র দেখাচ্ছিল। ড্রাগনের মুখ বড় দরজার দিকে ঘোরানো। লোহার পাতে মোড়া কেবিনের ঢাকনি ভোলা পড়ে আছে। বন্ড মনে মনে প্রার্থনা করল যেন এর পেট্রল ট্যাংকটা ভর্তি থাকে আর মিস্ত্রীরা যেন নির্দেশ মত গাড়িটার সব জখম সারিয়ে ফেলে থাকে।
হঠাৎ বাইরে থেকে গলার আওয়াজ ভেসে এল। ক্রমশ কাছে সরে এল আওয়াজটা। কয়েকজন তোক যেন উত্তেজিতভাবে বক্ করে চলেছে।
বন্ড মেয়েটার হাত ধরে দৌড়তে লাগল। একটাই কেবল লুকোবার জায়গা আছে–ঐ ড্রাগন, অর্থাৎ জলাভূমির বগীর পেটের ভেতর। মেয়েটা গুঁড়ি মেরে ভেতরে ঢুকল। তার পেছন পেছন বন্ড উঠল। তারপর নিঃশব্দে পেছনের দরজা বন্ধ করে দিল। গুঁড়ি মেরে অপেক্ষা করতে লাগল তারা। বন্ডের মনে পড়ল রিভলভারে আর মাত্র তিন রাউন্ড গুলি আছে। বড় দেরিতে মনে পড়ল, গ্যারেজের দেওয়ালের তাকভর্তি আগ্নেয়াস্ত্রের কথা। এখন লোকগুলো গ্যারেজের। ঠিক বাইরে। হড় হড় শব্দ করে বড় দরজাটা সরে গেল আর একরাশ উত্তেজিত কথাবার্তা কানে এল।
কি করে জানলি যে গুলি চলেছে?
ওটা অন্য কিছু আওয়াজ হতে পারে না।
তাহলে বরং সঙ্গে রাইফেল রাখ। এই নে, জো! তুই এটা নে, লেমি! আর কয়েকটা হাতবোমা। টেবিলের তলায় একবাক্স আছে।
রাইফেলের বোন্ট সরাবার ঘটাঘট শব্দ শোনা গেল। তারপর সেফটি ক্যাচ লাগানোর ক্লিক ক্লিক আওয়াজ।
কোন এক শালা ক্ষেপে গেছে নিশ্চয়। এ ঐ ইংরেজেটার কাণ্ড হতে পারে না। খড়ির সেই বিরাট অক্টোপাসটাকে দেখেছিস কখনো? বাপ! আর ঐ সুড়ঙ্গের পথে ডাক্তার সাহেব যে সব কায়দা করে রেখেছেন সেগুলো? আর মাইরি ঐ সাদা চামড়ার মেয়েটার বোধহয় আজ সকালে কিছু পড়ে নেই। তোরা কেউ দেখতে গিয়েছিলি?
নারে বাবা।
না?
না।
হাঃ, হাঃ। অবাক করলি মাইরি তোরা। ঐ কাঁকড়াদের রাস্তায় বাঁধা ছিল। সে এক দারুণ জিনিস। লোকগুলো আরো খানিকক্ষণ সেখানে যোরাফেরা করল। তারপর কে যেন বলল, ঠিক হ্যায়। এবার যাওয়া যাক। দু জনের সারিতে প্রধান সুড়ঙ্গ বেয়ে চলব আমরা। পায়ের দিকে গুলি চালাস। যেই গণ্ডগোল করে থাকুক না কেন, ডাক্তার সাহেব তাকে নিয়ে নিশ্চয়ই খেলা করতে চাইবেন।
হিঃ, হিঃ।
পায়ের আওয়াজ কংক্রীটের বুকে প্রতিধ্বনি তুলল। বর্গীয় পাশ দিয়ে সারি বেধে চলে যাবার সময় বন্ড নিঃশ্বাস। বন্ধ করল। বৰ্গীর বন্ধ দরজাটা তাদের চোখে পড়বে? কিন্তু লোকগুলো গ্যারেজ পেরিয়ে সুড়ঙ্গে পা দিল। তাদের আওয়াজ ক্রমশ মিলিয়ে গেল।
বন্ড মেয়েটার গায়ে চাপ দিয়ে নিজের ঠোঁটের ওপর আঙ্গুল রাখল। তারপর আস্তে দরজা খুলে কান পাতল। কোন আওয়াজ নেই। মেঝেতে নেমে এগিয়ে গেল আধখোলা দরজার দিকে। সাবধানে গলা বাড়িয়ে দেখল। কেউ নেই কাছাকাছি। বাতাসে এখন রান্নার গন্ধ ভাসছে। বন্ডের জিভে পানি এল।
বন্ড এক দৌড়ে গ্যারেজের অপর প্রান্তে পৌঁছল। সুড়ঙ্গ থেকে কোন সাড়াশব্দ নেই। দরজা বন্ধ করে ভালভাবে খিল এঁটে দিল। বন্দুকের তাকের কাছে গিয়ে আরেকটা স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন ও একটা রেমিংটন কারবাইন বেছে নিল। দেখে নিল যে দুটোই গুলিভর্তি আছে কিনা। তারপর জলাভূমির বগীর পেছনের দরজায় গিয়ে মেয়েটার হাত তুলে। দিল অস্ত্র দুটো। এবার সামনের দরজাটার পালা। বন্ড কাঁধের চাপে সেটাকে আস্তে করে খুলে দিল। তারপর দৌড়ে ফিরে এসে বগীর খোলা দরজা দিয়ে ড্রাইভারের আসনে এসে বসল। তাড়াতাড়ি চাপা গলায় বলল, দরজাটা বন্ধ। করো হানি, বলেই সে সামনে ঝুঁকে পড়ে গাড়ির চাবি ঘোরাল।
