থামো, হানি! আমি!
কনভেয়ার বেল্টের আওয়াজ ছাপিয়ে বন্ডের চিৎকার মেয়েটার কানে গিয়ে পৌঁছল। মেঝের কাছাকাছি কোন এক জায়গা থেকে তার চিৎকার শোনা গেল–জেমস দুটো হাত বন্ডের পা আঁকড়ে ধরল। জেমস, জেমস!
বন্ড আস্তে আস্তে তাকে মেঝেতে নামাল। হাঁটু গেড়ে বসে হাত বাড়াল তার দিকে। দুহাতে কাছে টেনে এনে বুকে আঁকড়ে ধরল, হানি, হানি। তুমি ভাল আছ? প্রাণপণে বুকে চেপে রাখল এখনো যেন বিশ্বাস হচ্ছে না।
হ্যাঁ জেমস। নিশ্চয়ই। বন্ড পিঠের ওপর, চুলের ওপর মেয়েটার হাতের স্পর্শ পেল। জেমস, ডার্লিং! বন্ডের বুকের ওপর মাথা রেখে ফ্লোপাতে লাগল সে।
সব ঠিক আছে, হানি।তার চুলের ভেতর হাত বুলিয়ে বন্ড বলল, ডক্টর নো মারা পড়েছেন। কিন্তু এবার আমাদের যে করেই হোক পালাতে হবে। চলে এসো। এই সুড়ঙ্গ থেকে বেরুবে কি করে? তুমি কোন পথে এসেছ? তাড়াতাড়ি করা দরকার।
যেন তার কথা শুনতে পেয়েই, কনভেয়ার বেল্টটা হঠাৎ এক ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল।
বন্ড মেয়েটাকে টেনে তুলল। দেখল তার পরনে একপ্রস্থ নোংরা কুলিদের পোশাক। জামার হাতা ও প্যান্টের পায়া গোটানো। পোশাকটা তার গায়ে ঢলঢল করছে। দুই গাল চোখের পানিতে ধোয়া, আর বাকি সমস্ত শরীর গুয়ানোর গুড়োয় সাদা হয়ে গেছে। উত্তেজিতভাবে বলল, ঐ যে ঐখানে। ওখান দিয়ে ছোট একটা সুড়ঙ্গ বেরিয়ে গেছে মেশিনঘর ও গ্যারেজের দিকে। ওরা কি আমাদের তাড়া করবে?
কথা বলবার সময় ছিল না। বন্ড দ্রুতকণ্ঠে বলল এইবার, আমার সঙ্গে এস, বলেই দৌড় দিল। পেছনে মেয়েটার নরম পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল। নিঃস্তব্ধ সুড়ঙ্গের মধ্যে কিছুদূর এগিয়ে দেখল সুড়ঙ্গের একটা শাখা পাহাড়ের ভেতর দিয়ে চলে গেছে। লোকগুলো কোন পথ দিয়ে আসবে? এই ছোট সুড়ঙ্গ বেয়ে, না বড় সুড়ঙ্গের লাগোয়া সরু রাস্তা ধরে? ছোট সুড়ঙ্গটার অনেক ভেতর থেকে উঁচু গলার আওয়াজ ভেসে আসতে তার প্রশ্নের জবাব পাওয়া গেল। বন্ড মেয়েটাকে প্রধান সুড়ঙ্গ বেয়ে কয়েক ফুট টেনে নিয়ে গেল। কাছে টেনে এনে ফিসফিস করে বলল, আমি দুঃখিত, হানি। মনে হচ্ছে লোকগুলোকে খুন না-করে উপায় নেই।
নিশ্চয়ই। সহজভাবে মেয়েটা বলল। তারপর বন্ডের হাতে চাপ দিয়ে তাকে বেশি জায়গা দেবার জন্য সরে দাঁড়াল। তারপর দুহাতে কান চাপা দিল।
বন্ড কোমরের কাছ থেকে রিভলবার বার করল। আস্তে সিলিন্ডার খুলে বুড়ো আঙ্গুলের সাহায্যে দেখে নিল ছটা চেম্বারেই গুলি ভর্তি আছে কিনা। সে বুঝতে পারছিল যে কাজটা বড় বিশ্রী হবে, আর তাকে ঠাণ্ডা মাথায় কয়েকটা খুন করতে হবে। অবশ্য এরা সেই চীনে গুণ্ডার দল। ডক্টর নো-র প্রহরী হিসাবে এরা এ পর্যন্ত কত যে খুন জখম করেছে, তার কোন ঠিকানা নেই। এরাই হয়ত খুন করেছে স্ট্র্যাংওয়েজ ও সেই মেয়েটিকে। কিন্তু খামোকা নিজের বিবেককে স্তোক দিয়ে লাভ নেই। এখন হয় মারতে হবে, নয় মরতে হবে। সুতরাং হত্যাকাণ্ডটি সুসম্পন্ন করা খুবই দরকার।
গলার আওয়াজ এগিয়ে আসছে। তিনজন লোক। তারা কথা বলছে চড়া গলায়। নার্ভাস ভঙ্গিতে। সুড়ঙ্গ বেয়ে পাহাড়ের ওপারে যাবার কথা এরা হয়ত স্বপ্নেও ভাবেনি গত কয়েক বছরে। বন্ডের মনে হল প্রধান সুড়ঙ্গে ঢোকবার পর ওরা এদিকে ঘুরবে কিনা। না ঘুরলে কি সে পেছন থেকে তাদের গুলি করে মারবে?
লোকগুলো খুব কাছে এসে পড়েছে। বন্ড তাদের জুতোর মচমচ শব্দ শুনতে পেল।
এই নিয়ে আমার কাছে তোমার দশ ডলার ধার হল, স্যাম।
আরে বাবা, আজকের রাতটা আগে যেতে দাও। সব টাকা তুলে নেব।
আজ আর আমি জুয়া খেলছি না দোস্ত। ঐ সাদা চামড়ার মেয়েটাকে একবার দেখতে যাব।
হাঃ হাঃ, হাঃ।
প্রথম লোকটা বেরিয়ে এল। তারপর দ্বিতীয়, সবশেষে তৃতীয় জন। তিনজনেই আলগোছে ডানহাতে রিভলভার ধরে আছে।
বন্ড তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, না, আর দেখতে হবে না।
তিনজনেই তীরবেগে ঘুরে গেল। তাদের বিস্ফারিত মুখের ভেতরে ঝকঝক করে উঠল সাদা দাঁতের সারি। বন্ড পেছনের লোকটার মাথায় ও মাঝের লোকটার পেটে গুলি চালাল। ততক্ষণে সামনের জন রিভলবার তুলে ধরেছে। একটা বুলেট শিস্ কেটে বন্ডের পাশে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। বন্ডের অস্ত্র আবার গর্জে উঠল। লোকটা নিজের ঘাড় খামচে ধরে ঘুরে গেল। তারপর উল্টে পড়ল কনভেয়ার বেল্টের ওপর। গুলির তীব্র শব্দ খানিকক্ষণ ধরে সুড়ঙ্গের বুকে প্রতিধ্বনিত হল। দুটো দেহ একেবারে স্থির হয়ে গেছে। পেটে গুলি খাওয়া লোকটি এখনো যন্ত্রণায় কুকড়ে ছটফট করছে।
বন্ড গরম রিভলভারটা কোমরে গুঁজে রাখল। রুক্ষ্মভাবে মেয়েটাকে বলল, এসো। মেয়েটার হাত ধরে পাশের সুড়ঙ্গের মুখে টেনে নিয়ে গেল। বলল, এই ঘটনার জন্য আমি দুঃখিত, হানি। বলে দৌড়তে শুরু করল। হানি বলল, বোকার মত কথা বলো না। তারপর পাথরের মেঝের ওপর তাদের অনাবৃত পায়ের আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই শোনা গেল না।
সুড়ঙ্গের হাওয়া বেশ পরিষ্কার। দৌড়তে কষ্ট হচ্ছে না। কিন্তু এই বন্দুকের লড়াইয়ে যেটুকু উত্তেজনা হল, তাতেই আবার একচোট যন্ত্রণা এসে বন্ডের শরীর আক্রমণ করল। সে যেন আপনা থেকেই দৌড়ে চলেছে। মেয়েটার কথাও বিশেষ ভাবছিল না।
বন্ড বুঝতে পারছিল না গুলির আওয়াজ কারো কানে গেছে কিনা। আর ক জন প্রহরীর মোকাবিলা করতে হবে। তাও বোঝা মুশকিল। তার মাথায় এখন কেবল ঘুরছে যে, যে ক জন সামনে পড়বে সবাইকে খতম করে যে করে। হোক গ্যারেজে পৌঁছে জলাভূমির বর্গীটিকে হস্তগত করা। এছাড়া পাহাড় বেয়ে সমুদ্রতীর পর্যন্ত পালাবার আর কোন উপায় নেই।
