জলস্তম্ভের মত এগিয়ে এল দুর্গন্ধময় গুয়ানো গুড়োর স্রোত। প্রথম ঝাঁপটাটা গায়ে লাগতেই ডক্টর নো ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন। বন্ড দেখল তার দু হাত প্রসারিত হয়ে যেন সেই গর্জনমান প্রপাতকে আলিঙ্গন করল। পালাবার জন্য এক পা তুললেন। মুখ খুলে গেল। ইঞ্জিনের শব্দ ছাপিয়ে বন্ডের কানে এসে লাগল এক তীক্ষ্ণ চিৎকার। তারপর এক পলকের জন্য নাচন্ত তুষার মানবের মত এক মূর্তি দেখা গেল। তারপর গুয়ানোর রাশি তাকে কবরস্থ করে একটা ঢিপির রূপ নিল। ঢিপির উচ্চতা বেড়ে চলল।
সৃষ্টিকর্তা বন্ডের গলা লোহার কেবিনের দেওয়ালে প্রতিধ্বনি তুলল। কল্পনার চোখে দেখতে পেল ডক্টর নো-র দুই ফুসফুসে হু হু করে গুয়ানোর গুড়ো ঢুকছে, পর্বত প্রমাণ গুয়ানোর ভারে ঝুঁকে তারপর আছড়ে পড়লেন তিনি, শেষ একবার নিষ্ফল আক্রোশে পা ছুঁড়লেন। অন্তিম মুহূর্তে কি ছিল তার মনে, ক্রোধ, আতঙ্ক, না পরাজয়ের গ্লানি? সবশেষে সেই দুর্গন্ধে ভরা সমাধির বুকে কবরের নীরবতা নেমে এল।
হলদে রঙের পাহাড়টা এখন কুড়ি ফুট উঁচু। তার ঢাল বেয়ে গুয়ানো-গুড়ো জেটির পাশ দিয়ে সমুদ্রের পানিতে গড়িয়ে পড়ছে। বন্ড জাহাজের দিকে দেখল। ঠিক তক্ষুনি জাহাজের সাইরেন পরপর তিনবার বেজে উঠল। পাহাড়ের চুড়ায় চূড়ায় তার তীব্র প্রতিধ্বনি শোনা গেল। চতুর্থবার বেজে উঠল সাইরেনটা। এবার আর থামল না। বন্ড দেখতে পেল জাহাজের প্রহরী ঝুঁকে পড়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখছে। বন্ড ক্রেনের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিল। এবার যেতে হবে।
লোহার আসন থেকে নেমে এসে দাঁড়ালো মৃত ড্রাইভারের পাশে। নিচু হয়ে লোকটার কোমরের খাপ থেকে রিভলভার তুলে নিল। অস্ত্রটা চোখের সামনে তুলে ধরতেই তার মুখে এক ফালি বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল–একটি স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন ০.৩৮ রিভলভার। বন্ড সেটাকে তুলে কোমরে গুঁজে নিল। গায়ের ওপর ঠাণ্ডা, ভারি, ধাতব স্পর্শ বড় ভাল লাগল। কেবিনের দরজা খুলে নিচে নামল সে।
ক্রেনের পেছন দিকের পাহাড়ের গা বেয়ে এক লোহার মই উঠে গেছে। ঠিক যেখান থেকে কনভেয়ার বেল্টটা বেরিয়ে এসেছে সেই পর্যন্ত। যে কয়রাগেটেড লোহার আবরণে কনভেয়ার বেল্ট ঢাকা আছে, তার দেওয়ালে একটা ছোট্ট দরজা দেখা যাচ্ছে। বন্ড মই বেয়ে উঠল। খানিকটা গুয়ানোর গুড়ো ছিটিয়ে দরজাটা খুলে গেল এবং সে ভেতরে ঢুকল।
ভেতরে কনভেয়ার বেল্ট রোলারের ওপর দিয়ে গড়িয়ে চলেছে তীব্র খনখন শব্দ করে। আওয়াজের চোটে কান পাতা দায়। কনভেয়ার বেল্টের ধার বেয়ে একটা সরু পাথুরে রাস্তা সোজা পাহাড়ের ভেতর দিকে ঢুকে গেছে। বন্ড সেই পথ বেয়ে জোরে পা চালাল। তীব্র মেছো অ্যামোমানিয়ার গন্ধে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু যে করেই হোক। ওপারে গিয়ে পৌঁছতে হবে–চতুর্থ সাইরেন ও নিরুত্তর টেলিফোনের আতঙ্ক ছাপিয়ে আসল ব্যাপারটা প্রহরীদের। মাথায় ঢোকবার আগে।
বন্ড হোঁচট খেতে খেতে দৌড়চ্ছিল দুর্গন্ধে ভরা সুড়ঙ্গপথ বেয়ে। আর কতদূর? দু-শো গজ? কিন্তু তারপর? সুড়ঙ্গের ওপারে পৌঁছেই গুলি বৃষ্টি শুরু করতে হবে। যাতে লোকগুলো আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে যায়। যা হবার হবে। একটা লোককে পাকড়াও করে তার কাছ থেকে মেয়েটার হদিশ আদায় করতে হবে। তারপর? সে যখন পাহাড়ের গায়ে যথাস্থানে গিয়ে পৌঁছবে তখন মেয়ের দেহের কতটুকু বাকি থাকবে? কি দেখতে পাবে সে?
বন্ড আরো জোরে দৌড় দিল, মাথা নিচু করে। অপ্রশস্ত পথের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রেখে। তার মাথায় ঘুরছিল যে, একবার যদি পা ফসকে ঐ গর্জনমান গুয়ানোর স্রোতের ভেতর পড়ে যায় তাহলে কি হবে? সে কি ছুটন্ত বেল্টটা থেকে উঠে আসতে পারবে? নাকি সোজা বাইরের দিকে ভেসে গিয়ে ছিটকে পড়বে ডক্টর নো-র সমাধির ভেতর।
হঠাৎ বন্ডের ঝুঁকে পড়া মাথা কার যেন নরম পেটে ধাক্কা খেল। সঙ্গে সঙ্গে একজোড়া হাত তার গলা টিপে ধরল। তখন আর রিভলবার বার করবার সময় নেই। বন্ড আক্রমণকারীর পা দুটো লক্ষ্য করে সামনে ঝাঁপ দিল। তার কাঁধের ধাক্কায় পা জোড়া শূন্যে উঠে গেল এবং তীক্ষ্ণ চিৎকার করে একটা দেহ তার পিঠের ওপর আছড়ে পড়ল।
বন্ড শরীর ঝাঁকিয়ে আক্রমণকারীকে কনভেয়ার বেল্টের ওপর ছুঁড়ে ফেলতে যাচ্ছিল। এমন সময় তার খেয়াল হল এইমাত্র শোনা চিৎকারের ভঙ্গি ও আছড়ে পড়া দেহটার কোমলতার কথা। সঙ্গে সঙ্গে তার হাত পা জমে গেল।
অসম্ভব!
যেন তার চিন্তার জবাবেই তীক্ষ্ণ একসারি দাঁত তার পায়ের গুলিতে গভীর ভাবে বসে গেল এবং একটা কনুই রীতিমত সজ্ঞানে তার তলপেটে বেমক্কা গুতো মারল।
যন্ত্রণার চোটে আর্তনাদ করে উঠল বন্ড। আত্মরক্ষার তাগিদে কুঁকড়ে সরে যাবার চেষ্টা করল। হানি! বলে চেঁচিয়ে উঠল। কিন্তু কনুইটা আবার আঘাত হানল একই জায়গায়।
নিদারুণ যন্ত্রণায় বন্ডের চাপা নিঃশ্বাস দাঁতের ভেতর দিয়ে শিস কেটে বেরিয়ে এল। কনভেয়ার বেল্টে ছুঁড়ে ফেলা ছাড়া থামনোর একটা উপায় আছে। বন্ড মেয়েটার গোড়ালি জোরে চেপে ধরে সোজা উঠে দাঁড়াল। এক পা ধরে তাকে ঝুলিয়ে দিল কাঁধের ওপর দিয়ে। অন্য পা-টা তার মাথায় আঘাত করল, কিন্তু তেমন জোরে নয়। সেও বোধহয়। এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে যে কিছু একটা গোলমাল হয়েছে।
