নিচে, জেটির ওপরে, গুয়ানোর গুড়ো থেকে গা বাঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ডক্টর নো র সুদীর্ঘ মূর্তি।
ব্যস, আর কিছু নেই। কনভেয়ার বেল্ট ধক্ আওয়াজ করতে করতে রোলারের ওপর দিয়ে গড়িয়ে চলেছে, আর ক্রেনের ইঞ্জিন সমান তালে ঝিঁঝিক্ করে চলেছে। অন্য কোন শব্দ, কোন চাঞ্চল্য নেই। জাহাজের ওপর প্রহরী, ক্রেনের ওপর একজন বিশ্বস্ত কর্মী, আর জেটির ওপর পর্যবেক্ষক ডক্টর নো_এছাড়া প্রাণের স্পন্দন নেই। পাহাড়ের ওপারে হয়ত অনেক শ্রমিক কাজ করছে, কনভেয়ার বেল্টের ওপর রাশি রাশি গুয়ানো এনে ফেলছে। কিন্তু এপারে কাউকে আসতে দেওয়া হয় না, তার প্রয়োজনও নেই। ক্যানভাসের থলির মুখটা খোলের ওপর ধরে থাকা ছাড়া করার কিছুই নেই।
বন্ড বসে ভাবতে লাগল। কতদূর যেতে হবে? কতটা ঘুরতে হবে? ক্রেন ড্রাইভারের হাত-পা গুলো কোন কোন হাতল ও পেডালের ওপর আছে? ক্রমশ এক টুকরো ক্ষীণ কঠোর হাসি ফুটে উঠল তার ক্লিষ্ট, রোদে পোড়া মুখের ওপর। হা! হতে পারে! কাজটা করা যেতে পারে। কিন্তু খুব আস্তে, খুব যত্নের সঙ্গে, খুব নরম হাতে। যদি সে সফল হতে পারে, আশাতীত এক পুরস্কার হাতে আসবে।
বন্ড নিজের হাত পা পরীক্ষা করে দেখল। যেতেই হবে। পেছন দিকে হাত বাড়িয়ে ছোরার স্পর্শ অনুভব করল। উঠে দাঁড়িয়ে বড় বড় কয়েকটা নিঃশ্বাস নিল। দু হাত চুলে, মুখে ও প্যান্টের দু পাশে ঘষে নিল। শেষবারের মত হাত মুঠো করে সে তৈরি হল।
ক্রেনের কাছে পৌঁছতে তাকে যে দশ গজ পথ অতিক্রম করতে হবে, তার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। কোন্ কোন জায়গায় পা ফেলবে তাও ঠিক করে নিল। তারপর পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে দৌড় দিল।
বন্ড এক দৌড়ে এসে পৌঁছল ক্রেনের ডান ধারের এক পূর্বনির্দিষ্ট জায়গায় যেখানে ক্রেনের এক পাশের দেওয়াল, তাকে ড্রাইভার ও জেটি থেকে আড়াল করে রাখবে। সেখানে থেমে গিয়ে গুঁড়ি মেরে কান পাতলো। ইঞ্জিন যথারীতি দ্রুতগতিতে চলছে। পেছন দিকে অনেক ওপর ঘড়ঘড় শব্দে পাহাড়ের গা থেকে বেরিয়ে আসছে কনভেয়ার বেল্ট। কোন পরিবর্তন নেই।
একবার মাত্র ছোরা চালাবার সুযোগ পাওয়া যাবে। সুতরাং সেই কোপটা মারাত্মক হওয়া চাই। বন্ড নিজের কলার বোনের ওপর হাত বোলাল। ছুঁয়ে দেখল সেই তেকোণা চামড়াটুকু, যার নিচে প্রাণবাহী জগুলার শিরা দপদপ করে চলেছে। মনে মনে আউড়ে নিল, কোন দিক থেকে লোকটাকে আক্রমণ করবে। নিজেকে মনে করিয়ে দিল যে ছোরা ঢুকিয়ে দিয়ে ধরে থাকতে হবে।
আর এক সেকেন্ড সে কান পেতে শুনল। তারপর পিঠের কাছ থেকে ছোরাটা হাতে নিয়ে ক্রেনের পেছন বেয়ে কেবিনে উঠে পড়ল চিতাবাঘের মত, নিঃশব্দে, ক্ষিপ্রগতিতে।
অন্তিম মুহূর্তে অবশ্য তাড়াহুড়োর প্রয়োজন হল না। বন্ড ড্রাইভারের পেছনে এসে দাঁড়াল। লোকটার গন্ধ নাকে এসে লাগল। ছোরাসুদ্ধ হাত কেবিনের ছাদ পর্যন্ত তোলার সময় পেল, সময় পেল শরীরের সবটুকু শক্তি এক করে নিতে। তারপর ছোরাটাকে মসৃণ হলদেটে বাদামী ঘাড়ের ওপর নির্দিষ্ট জায়গায় আমূল ঢুকিয়ে দিল।
ক্রেন নিয়ন্ত্রণকারী হাতল ও পেডালগুলো থেকে লোকটার হাত পা খসে পড়ল। মাথাটা অতি কষ্টে ঘুরে গেল বন্ডের দিকে। বন্ডের মনে হল এক পলকের জন্য বোধহয় চিনতে পারল লোকটাকে। তারপরই চোখ উল্টে, গলা দিয়ে গোঙানি বেরিয়ে এল। বিশাল দেহটা লোহার চেয়ার থেকে পাশের দিকে উল্টে গিয়ে সশব্দে আছড়ে পড়ল মেঝেতে।
বন্ড লোকটার মেঝেতে পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল না। তার আগেই সে ড্রাইভারের আসনে বসে পড়ে হাতল ও পেডাল ক টার দিকে হাত বাড়িয়েছে। ক্রেনটা যেন ক্ষেপে গেছে। ইঞ্জিনের গতি থেমে গেছে। ক্রেনের মাথাটা জিরাফের ঘাড়ের মত আস্তে আস্তে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, কনভেয়ার বেল্টের মুখে লাগল ক্যানভাসের থলেটা চুপসে গিয়েছে আর তার থেকে অজস্র গুয়ানো গুড়ো জলপ্রপাতের মত ঝরে পড়ছে জাহাজ ও জেটির মাঝামাঝি জায়গায়। ডক্টর নো ওপর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছেন। সম্ভবত চিৎকার করে কিছু বলছেন।
ঠাণ্ডা মাথায় বন্ড যন্ত্রের রাশ হাতে নিল। আস্তে করে পেডাল ও হাতলগুলো টেনে আনল যথাস্থানে। ইঞ্জিনের গতি বাড়ল। গীয়ারগুলো কাজ করল। ক্যানভাসের মুখ উঠে এল জাহাজের ওপর। ক্রেনের মাথা ওপরে উঠে থেমে গেল। সবকিছু আবার আগের মত, এবার নাও।
বন্ড সামনের লোহার চাকাটার দিকে হাত বাড়াল। প্রথম বার, যখন ক্রেন ড্রাইভারকে সে দেখে, লোকটার হাত তখন এই চাকার ওপর ছিল। কোনদিকে যোরাবে? বাঁ দিকে ঘুরিয়ে বন্ড দেখল ক্রেনের মাথা অল্প ডানদিকে সরে গেল। এবার সে চাকাটাকে ডানদিকে ঘোরাল। আরে হ্যাঁ, এই তো বেশ কথা শুনছে। আকাশ বেয়ে বাঁ দিকে সরে যাচ্ছে ক্রেনের মাথা। সঙ্গে টেনে আনছে কনভেয়ার বেল্টের প্রান্তিক থলেটাকে।
বন্ডের দৃষ্টি একবার জেটির ওপর দিয়ে ঘুরে গেল। ডক্টর নো আগের জায়গায় নেই। কয়েক পা সরে একটা খাঁটির পাশে দাঁড়িয়েছেন। বন্ড এই খুঁটিটা আগে দেখেনি। তার হাতে টেলিফোন। পাহাড়ের অন্যদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। বন্ড দেখল তিনি পাগলের মত রিসিভারের হাতল ধরে ঝাঁকাচ্ছেন, অপর প্রান্তের মনোযোগ আকর্ষণ করবার জন্য।
বন্ড লোহার চাকাটায় মোচড় দিল। সৃষ্টিকর্তা, আরেকটু জোরে ঘুরতে পারে না এটা? কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অপর প্রান্তের কেউ টেলিফোনে সাড়া দেবে। তারপর আর কিছু করবার থাকবে না। ক্রেনের মাথাটা আস্তে আস্তে ঘুরছে। কনভেয়ারের মুখ থেকে গুড়ার স্রোত হু হু করে এসে পড়ছে জাহাজের ঠিক পাশে। এবার স্রোতটা জেটি বেয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছে। আর পাঁচ গজ, চার, তিন, দুই। পেছনে তাকাসনে। আহ, এইবার বাগে পেয়েছি তোকে। চাকা থামাও। এবার সামলান, ডক্টর নো।
