কিন্তু কোথায় গেল স্কুইডটা? ফিরে আসবে নাকি? বন্ড সমুদ্রের ওপর চোখ বোলাল। কালো ছোপটা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে। আর কিছু নেই। কোন চাঞ্চল্য নেই। তরঙ্গ পর্যন্ত নেই একটা। তাহলে দাঁড়িয়ে রয়েছিস কি করতে? পালা! চটপট পালা! বন্ড পাগলের মত ডাইনে বায়ে তাকাল। জাহাজটা বাঁ দিকেই হবে; ডক্টর নো-ও। কিন্তু ডানদিকে কিছুই নেই। এই তারের বেড়া তৈরি করতে লোকগুলো নিশ্চয় বাঁ দিকে দিয়েই এসেছিল। সুতরাং ওদিকে রাস্তাগোছের একটা কিছু থাকবার কথা। বন্ড তারের বেড়ার মাথা আঁকড়ে ধরে বাঁদিকে সরে যেতে লাগল কুড়ি গজ দূরের পাথুরে জমির দিকে।
দুর্গন্ধে ভরা, রক্তাক্ত একটা কালো কাক তাড় যার মত এগিয়ে চলল বন্ড। হাত-পা যেন নিজের থেকেই নড়ছে। শরীরের চিন্তা করবার, অনুভব করবার যন্ত্রগুলো আর কাজ করছে না। সে অনুভূতিগুলো যেন শরীরের সঙ্গেই এগিয়ে চলেছে অথবা উড়ে চলেছে এবং পুতুল নাচিয়ের হাতের দড়ির মত নাচিয়ে চলেছে অবশ দেহটাকে।
বন্ড পাহাড়ের কাছাকাছি এসে পৌঁছল। আস্তে আস্তে নিচে নেমে এল তার বেয়ে। নিচের তরঙ্গায়িত পানির দিকে আচ্ছন্নভাবে তাকিয়ে রইল। পানিটা কালো, দুর্ভেদ্য এবং বাইরের সমুদ্রেরই মত গভীর। এরকম ঝুঁকি নেওয়া উচিত হবে? নিতেই হবে। গায়ের এই গরম পাঁক, রক্ত আর জঘন্য পচা মাছের গন্ধ ধুয়ে না ফেললে কিছুই করতে পারবে না সে।
যা থাকে কপালে বলে বন্ড বিষণ্ণ মেজাজে গায়ের ছেঁড়া শার্ট প্যান্ট খুলে তারের ওপর ঝুলিয়ে দিল। নিজের সাদা খয়েরী দেহের দিকে তাকিয়ে দেখল সর্বাঙ্গে রক্তাক্ত আঁচড় আর ছোপ। কি যেন ভেবে নাড়ি টিপে দেখল–ধীরগতি, তবে নিয়মিত। শরীরে জীবনের স্পন্দন অনুভব করে সে মনে জোর পেল। আশ্চর্য, ঘাবড়ে যাবার কি আছে? সে তো বেঁচে আছে। গায়ের কাঁটা ছেঁড়াগুলো অতি সামান্য। দেখতে অবশ্য বিশ্রী, কিন্তু হাড়গোড় একটাও ভাঙেনি। হাত চালা, বেজন্মা কোথাকার! তাড়াতাড়ি কর। হাত-পা ধুয়ে নিয়ে উঠে পড়। কত বড় বাঁচা বেঁচে গেছিস সেই কথাই ভা। মেয়েটার কথা ভাবু। সেই লোকটির কথা ভেবে দ্যাখ, তাকে যেমন করে তোক খুঁজে বার করে হত্যা করতে হবে।
দশ মিনিট পর বন্ড পানি থেকে পাথুরে জমির ওপর উঠল। শতছিন্ন জামাকাপড় তার গায়ে ভিজে লেপটে আছে। চুলগুলো চোখের ওপর থেকে তুলে নিয়েছে। রগড়ে গা ধোওয়ার ফলে সর্বাঙ্গ যেন জ্বলে যাচ্ছে।
হ্যাঁ, সে যা ভেবেছিল ঠিক তাই। সরু একটা পাথুরে রাস্তা। মজুরদের পায়ের চাপেই সৃষ্টি হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। রাস্তাটা ঘুরে চলে গেছে পাহাড়ের উল্টোদিকে।
বেশ কাছ থেকে অনেকগুলো ধ্বনি প্রতিধ্বনি শোনা গেল। কোথাও একটা ক্রেন কাজ করছে। ইঞ্জিনের আওয়াজ স্পষ্ট শোনা গেল। নানারকম জাহাজী শব্দ আর পাম্প থেকে সমুদ্রে পানি পড়বার আওয়াজ।
বন্ডের শরীর থেকে এখনও বিন্দু বিন্দু রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে পাথরের ওপর। সে সাবধানে এগিয়ে চলল পথ বেয়ে। পাহাড়ের নিচে, ছায়ার আড়ালে। বাঁক ঘোরবার পর রাস্তাটা একরাশ বিরাট উল্টানো পাথরের চাইয়ের গোলক ধাঁধার মধ্যে হারিয়ে গেছে। শব্দগুলো একবার খুব জোরে শোনা যাচ্ছে। বন্ড আস্তে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেল, আলগা পাথর থেকে পা বাঁচিয়ে। খুব কাছে একটা চিৎকার শোনা গেল–সব ঠিক আছে? ক্রেনের ইঞ্জিনের গতি বাড়ল।
বন্ড পাথরের বুকে উপুড় হয়ে সতর্কভাবে মাথা বার করে দেখল।
.
এক পশলা মৃত্যু
সমস্ত দৃশ্যটার ওপর সুদীর্ঘ দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে বন্ড মাথা নামাল।
পাথরের ঠাণ্ডা গায়ে মাথা রেখে পড়ে রইল যতক্ষণ না শ্বাস-প্রশ্বাস শান্ত হয়। ছোরাটাকে চোখের সামনে এনে সাবধানে পরীক্ষা করল। ভালোই ধার আছে। শিরদাঁড়ার কাছে বেল্টের মধ্যে গুঁজে রাখল। লাইটারের কথা মনে পড়ল। পকেট থেকে বার করে দেখে নিল। এক টুকরো শক্ত ধাতু হিসেবে কাজ দিতে পারে, কিন্তু আগুন আর জ্বলবে না। বরং পাথরে ঘষে ঝামেলা বাধাতে পারে। বউ সেটাকে পাথরের ওপর নামিয়ে রাখল।
তারপর সে বসে বসে এইমাত্র দেখা দৃশ্যটাকে খুঁটিয়ে বিচার করতে লাগল।
বাঁকের ওধারে, প্রায় দশ গজ দূরে দাঁড়িয়ে আছে ক্রেনটা। ক্রেনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের পেছনদিকে দেওয়াল নেই। চালকের আসনে বসে আছে একটি লোক। সেই ধেড়ে চীনে নিগ্রোটা, যে জলাভূমির বগী চালাচ্ছিল। তার সামনে দিয়ে বিশ গজ লম্বা জেটি সমুদ্রে নেমে গেছে। জেটির শেষে বাঁধা আছে এক সেকেলে ট্যাংকার জাহাজ–দশ হাজার টনের মত ওজন হবে। ট্যাংকারটার নাম ব্লা। গন্তব্যস্থল আন্তওয়ার্প-এর নামও গায়ে লেখা আছে, অবশ্য তার প্রথম তিনটে অক্ষরের বেশি বন্ড দেখতে পেল না। জাহাজের ওপর একটা মাত্র লোক ঘোরাঘুরি করছে। অন্যেরা নিশ্চয়ই গুয়ানোর গুড়ো থেকে বাঁচার জন্য নিচে নেমে গেছে।
ক্রেনের ডানদিকে, বেশ কিছুটা ওপরে, করোগেটেড লোহার ছাদে ঢাকা এক কনভেয়ার বেল্ট বেরিয়ে এসেছে পাহাড়ের গা থেকে। জেটির অনেক ওপর দিয়ে কাঠের খুঁটির মাথা বেয়ে সোজা চলে গেছে ট্যাংকারের খোল পর্যন্ত। গুয়ানো বাহী কনভেয়ার বেল্টের শেষপ্রান্তে বিশাল এক ক্যানভাসের থলি লাগানো। অন্তত ছ ফুট চওড়া। থলের মুখ থেকে ডিম ভাজার মত রঙের গুয়ানো গুড়ো তীব্রবেগে জাহাজের খোলর ভেতর এসে পড়ছে। থলিটার বাঁধা মুখ। খোলের ঠিক ওপর ঝুলে রয়েছে। আর ক্রেনের কাজ হল এই মুখটাকে ধরে রাখা এবং এপাশ-ওপাশ নাড়ানো, যাতে খোলের ভেতর গুয়ানোর রাশি সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
