শুড়টা এবার উরুর ওপর উঠে এল। শুড়ের প্রান্ত এতক্ষণ ছুঁচলো ছিল। এবার সেটা ছড়িয়ে গিয়ে বন্ডের ঊরুর প্রায় সবটা ঢেকে দিল। তার ঠিক নিচের জায়গাটা আবার কব্জির চেয়েও কম চওড়া। ঐটাই বন্ডের লক্ষ্যস্থল। যতক্ষণ না কব্জিটা নাগালের মধ্যে আসে ততক্ষণ এই যন্ত্রণা আর আতঙ্ক সহ্য করে যেতে হবে।
ভোরের মৃদু ঝিরঝিরে হাওয়া খাড়ির চকচকে পানির ওপর দিয়ে বয়ে গেল। কয়েকটা ছোট ছোট ঢেউ উঠে পাহাড়ের গায়ে গিয়ে ধাক্কা মারল। পাঁচশ ফুট ওপরে, গুয়ানেরার চূড়ড়া থেকে এক ঝাঁক পাখি আকাশে উঠল। তারপর কিচমিচ শব্দ করতে করতে উড়ে চলল সমুদ্রের দিকে। দূর থেকে ভেসে এল একটা জাহাজের সাইরেনের আওয়াজ পরপর তিনবার অর্থাৎ সেটা মাল তোলবার জন্য তৈরি। আওয়াজটা এল বন্ডের বাঁদিক থেকে। আন্তওয়ার্প থেকে সেই জাহাজটা এসেছে। আন্তওয়ার্প, বাইরের পৃথিবীর একটা জায়গা বহু লক্ষ মাইল দূরের পৃথিবী, বন্ডের নাগালের বাইরে…চিরদিনের মত। হয়ত কিছুদূরেই জাহাজের ওপর লোকেরা বসে প্রাতঃরাশ খাচ্ছে। রেডিওতে গান হচ্ছে। বেকন আর ডিম ভাজার হ্যাঁকছেক আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, ভেসে আসছে কফির গন্ধ…।
শুড়টা আরও ওপরে উঠে এল। গোল কানা উঁচু বাটির মত শোষকগুলো, বন্ড স্পষ্ট দেখল। একটা বোটকা মাছের গন্ধ আসছে। ঐ থলথলে ধূসর খয়েরি রঙের শুড় কতটা শক্ত? এখনি ছোরা চালাবে? না, খুব জোর আর দ্রুত আড়াআড়ি একটা কোপ বসাতে হবে, তাতে যদি নিজের গায়ে আঁচড় লেগে যায় তা-ও সই।
বন্ড চট করে ফুটবলের মত চোখ দুটোকে একবার দেখে নিল। কি শান্ত! কি নির্বিকার! অন্য শিকার ধরা শুড়টা এবার তার মুখের দিকে ছুটে এল। বন্ড এক ঝটকায় মাথা সরিয়ে নিল। শুড়টা সামনের তারটাকে আঁকড়ে ধরল। এক্ষুনি ওটা ঘাড় বা কাঁধে নেমে আসবে। তারপর আর কিছুই করবার থাকবে না। এইবার!
প্রথম শুড়টা তার পাজরের ওপর উঠে এসেছিল। বন্ড প্রায় লক্ষ্য স্থির না করেই আড়াআড়ি এক কোপ বসাল। অনুভব করল নরম মাংস কেটে যাচ্ছে ছোরার ফলাটা। আর তারপরেই আহত গুড়টা এমন এক ঝটকা মেরে পানিতে ফিরে গেল যে ছোরাটা আর একটু হলেই তার হাত থেকে ছিটকে বেরিয়ে যেত।
কিছুক্ষণের জন্য চারিদিকের সমুদ্র ফুঁসে উঠল। অন্য ঔড়টা তার ছেড়ে সজারে এসে পড়ল তার পেটের ওপর। জোকের মত আটকে গিয়ে সবকটা শোষকের সাহায্যে ভীষণ জোরে চুষে যেতে লাগল। বন্ড পাগলের মত ছোরার কোপ বসিয়ে যাচ্ছে। হে সৃষ্টিকর্তা, নাড়িভুড়ি যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। লড়াইয়ের সংঘাতে তারের বেড়াটা থরথর করে কাঁপছে। নিচের পানি ফুঁসে উঠছে, ফেনায় ভরে গেছে। এবার তাকে হার মানতে হবে। আরেকটা কোপ বসাল। এবার শুড়ের পেছন দিকটায়। সঙ্গে সঙ্গে কাজ হল। শুড়টা ছিটকে সরে এসে কিলবিলিয়ে পানির ভেতর ফিরে গেল। বন্ডের গায়ে পড়ে রইল কুড়িটা লাল রঙের চাকা চাকা দাগ, প্রত্যেকটায় রক্ত বেরুচ্ছে।
কিন্তু সে ক্ষত নিয়ে চিন্তা করবার সময় পেল না বন্ড। দানব স্কুইডের মাথা এবার পানির ওপর ভেসে উঠেছে। বিশাল দেহের তীব্র আলোড়নে সমুদ্রের পানি ফেনায় ভরে গেছে। বিরাট দুই চোখ রাগে লাল হয়ে বিষাক্ত তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। গুড়ের অরণ্য এগিয়ে এল। হাত পা আঁকড়ে ধরে ক্রমশ টেনে নামাতে লাগল। বেড়ার তারগুলো বগলের কাছে যেন কেটে নামছে। এভাবে আঁকড়ে ধরলে সে ছিঁড়ে দু টুকরো হয়ে যাবে। চোখ দুটো, আর বিশাল তেকোণা ঠোঁটজোড়া পানি থেকে বেরিয়ে আসছে। ঠোঁট দুটো তার পা লক্ষ্য করে এগিয়ে আসছে। কেবল একটামাত্র উপায় আছে। বন্ড ছোরাটাকে দাঁতে চেপে ধরে হাত নামাল তারের সড়কির বাঁকা দিকটার দিকে। সেটাকে হিঁচড়ে বার করে আনল। দুহাতে চেপে ধরে একটানে ভাজ খুলে লম্বা করে দিল। স্কুইডের কাছাকাছি পৌঁছবার জন্য তাকে একটা হাত ছেড়ে দিয়ে সামনে ঝুঁকে পড়তে হবে। যদি তাক ফস্কে যায়, তাহলে অল্পক্ষণের মধ্যেই ছিন্নভিন্ন। হয়ে যাবে তার সর্বাঙ্গ।
এইবার! যন্ত্রণার প্রাবল্যে প্রাণ হারাবার আগে একটা শেষ চেষ্টা করতেই হবে। এইবার! এইবার।
বন্ড তারের ফাঁক দিয়ে সর্বাঙ্গ গলিয়ে দিয়ে, সবটুকু শক্তি এক করে নিচের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
বন্ড এক পলকের জন্য দেখতে পেয়েছিল, তার হাতের সড়কি তীরবেগে চোখের মনিটার ঠিক মাঝখানে ঢুকে যাচ্ছে। তারপরেই সমস্ত সমুদ্র যেন তার দিকে ফেটে পড়ল একরাশ অন্ধকারের মত। সে সামনের দিকে পড়ে গিয়ে মাথা নিচু করে ঝুলতে লাগল। মাথাটা পানির ঠিক এক ইঞ্চি ওপরে। দুই হাঁটু এখনও তারের বেড়ায় আটকানো।
কি হল ব্যাপারটা? সে কি অন্ধ হয়ে গেছে। চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছে না। দু-চোখ জ্বালা করছে, আর মুখের ভেতর এক জঘন্য মেছো গন্ধ। কিন্তু সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে যে বেড়ার তার হাঁটুর পেছনের তন্ত্ৰীগুলোর মধ্যে কেটে কেটে বসেছে। তবে নিশ্চয় সে বেঁচে আছে। অর্ধ চেতনভাবে বন্ড ঝুলন্ত হাত থেকে সড়কি ফেলে দিল। তারপর খুব আস্তে, অনেক যন্ত্রণা সহ্য করে, তার ধরে-ধরে উঠে বসলো বেড়ার ফাঁকে। একটু-একটু যেন দেখা যাচ্ছে। মুখের ওপর হাত বুলিয়ে নিল। এবার সে দেখতে পাচ্ছে। হাতের দিকে তাকিয়ে দেখল, পুরো হাতটা কালো আর চটচটে হয়ে গেছে। নিজের শরীরের দিকে তাকাল। সেটাও কুচকুচে কালো পাঁকে ঢাকা। চারদিকের সমুদ্র কালোরঙে ছেয়ে গেছে। এবার বন্ড বুঝতে পারল। আহত স্কুইড তার কালির থলের সবটুকু বন্ডের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছে।
