এবার আর বন্ডের শারীরিক শক্তির কিছু বাকি নাই। সব ক্ষমতা ফুরিয়ে গেছে। সুড়ঙ্গ বেয়ে তার শেষ ঝপ, তারপর পানির সঙ্গে প্রচণ্ড ধাক্কা, আর সবশেষে এই পানিতে ডোবা তার সব শক্তি একেবারে নিংড়ে বার করে নিয়েছে। এইবার বোধহয় সে ভেঙ্গে পড়বে। এবার ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে সে ঢলে পড়বে ঐ কালো পানির ভেতরে। সব চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে আরাম করে শুয়ে পড়াতে না জানি কি সুন্দর লাগবে-সমুদ্র সস্নেহে তাকে তার গর্ভে টেনে নেবে…তারপর আস্তে-আস্তে সব আলো নিভে আসবে।
হঠাৎ পায়ের কাছের মাছগুলো হুড়মুড় করে ছুট দিল। সেই আলোড়ন বন্ডকে তার মৃত্যু চিন্তা থেকে টেনে তুলল। পানির নিচে কি যেন নড়ছে। অনেক গভীরে চকচকে একটা কিছু দেখা গেল! আস্তে আস্তে উঠে আসছে ওপর দিকে।
বন্ডের হাত-পা শক্ত হয়ে গেল। ঝুলন্ত চোয়াল যথাস্থানে ফিরে এল। সজাগ হয়ে উঠল চোখের দৃষ্টি। বিপদের আশংকা যেন বৈদ্যুতিক শকের মত তার দেহে জীবনস্রোত প্রবাহিত করল। সব জড়তা কেটে বাচবার ইচ্ছে হল।
নিচের পানি কেঁপে উঠল। কিছু একটা নড়াচড়া করছে গভীর পানিতে, খুব বড় চেহারার একটা কিছু। অন্ধকার পানির অনেকটা জায়গা জুড়ে উজ্জ্বল ধূসর ছোপ। তার ভেতর থেকে চাবুকের মত একটা ঔড় এঁকে বেঁকে উঠে এল– চওড়ায় বন্ডের বাহুর চেয়ে কম নয়। শুড়ের প্রান্ত গোলাকার, কেমন যেন ফোলা ফোলা, তার উপর সারি সারি ফুস্কুড়ির মত দাগ। পানি কেটে এগিয়ে এল যে জায়গাটা থেকে মাছগুলো পালিয়েছে। এখন সেই বিশাল ধূসর ছায়া ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কি করছে ওখানে? তবে কি? তবে কি বন্ডের রক্ত চেখে দেখছে?
যেন তার প্রশ্নের জবাব দেবার জন্যই ফুটবলের মত প্রকাণ্ড একজোড়া চোখ আস্তে ভেসে উঠল বন্ডের সামনে। কুড়ি ফুট দূরে এসে থামল। তারপর নিস্তরঙ্গ পানি ভেদ করে তাকাল তার দিকে।
বন্ডের গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠল। তার মুখ দিয়ে মৃদু, ক্লান্ত সুরে একটা কুৎসিত খিস্তি এল। তবে এই ডক্টর নো-র সর্বশেষ চমক এবং অবস্ট্যাক রেসের শেষ বাধা।
যেন সমোহিত হয়ে বন্ড একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল অনেক নিচের সেই গভীর চোখের দিকে। এই তাহলে দানব স্কুইড। কত অজস্র কাহিনীই না শোনা যায় এই রহস্যময় অতিকায় জলজন্তুকে নিয়ে। এরা নাকি একটা গোটা জাহাজকে পানির তলায় টেনে নিয়ে যেতে পারে। এক-একটা পঞ্চাশ ফুট লম্বা স্কুইড নাকি তিমি মাছের সঙ্গে লড়াই করবার ক্ষমতা রাখে। এদের ওজন নাকি একটনেরও বেশি।
আর কি জানে সে এদের বিষয়ে। এদের বারোটা শুড়ের মধ্যে দুটো হল শিকারকে টেনে আনবার জন্য, আর বাকি দশটা তাকে ধরে রাখবার জন্য। এরাই একমাত্র জলজ প্রাণী, যাদের চোখ ঠিক মানুষের চোখের মত। অর্থাৎ ক্যামেরার নিয়মে, কাজ করে। চোখ দুটোর নিচে আছে একজোড়া ভোতা ঠোঁট। এদের বুদ্ধি বড় কম নয়। এরা জেট প্রপালশনের সাহায্যে ঘণ্টায় তিরিশ নট বেগে পানির ভেতর দিয়ে চলতে পারে। হারপুণ বোমা এদের থলথলে শরীরে লেগে ফেটে যায়। কিন্তু কোন ক্ষতি করতে পারে না। আর জানা আছে যে…কিন্তু বেরিয়ে আসা সাদা-কালো চোখদুটো ক্রমশ আরো উঠে আসছে। পানির বুকে কাঁপন জাগল। এবার সে দেখল প্রাণীটার মাথা থেকে বেরিয়ে আসা গুড়ের অরণ্য। সেগুলো তার চোখের সামনে দুলছে–যেন এক ঝাক মোটা মোটা সাপ।
বন্ড স্পষ্ট দেখতে পেল শুড়ের নিচের দিকে সারি সারি শোষক–যাদের সাহায্যে এরা তরল পদার্থ চুষে নেয়। মাথার পেছনে বিশাল চামড়ার খোলসটা বার বার খুলছে আর বন্ধ করছে। আর তার পেছনে থলথলে, চকচকে একটা দেহ পানির গভীরে অদৃশ্য হয়ে গেছে। হে সৃষ্টিকর্তা, জন্তুটা দেখছি ট্রেনের ইঞ্জিনের মত প্রকাণ্ড।
আস্তে আস্তে, অসংলগ্নভাবে বন্ড তারের জালের ভেতর দিয়ে হাত-পা ঢুকিয়ে দিল। শক্ত করে আঁকড়ে ধরল বেড়াটাকে। জন্তুটাকে এখন হয় তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একে একে ছিঁড়ে নিতে হবে, নয়ত তার সঙ্গে একটা মোটা তারের বেড়াটাকেও খুলে আনতে হবে। বন্ড চোখ কুঁচকে এদিক-ওদিক তাকাল। দুদিকেই বেড়া বেয়ে অন্তত কুড়ি ফুট এগিয়ে যেতে হবে জমিতে পা দেবার জন্য আর এখন নড়াচড়া করা অত্যন্ত মারাত্মক, অবশ্য যদি আদৌ তার হাত পা নাড়ার ক্ষমতা থাকে। তাকে সম্পূর্ণ অনড় হয়ে থাকতে হবে। তাতে যদি কপালজোরে জানোয়ারটা তার ওপর আগ্রহ হারিয়ে চলে যায়। তা যদি না যায়…খুব আস্তে বন্ডের আঙ্গুলগুলো ছোরার হাত চেপে ধরল।
চোখ দুটো শান্ত ধৈর্যের সঙ্গে বন্ডের দিকে তাকিয়ে দেখল। ধীর গতিতে হাতির গুঁড়ের মত বিরাট ঔড় পানির তলা থেকে উঠে এল। তারপর তার বেয়ে উঠে এল বন্ডের পায়ের দিকে। পায়ের ওপর এসে পৌঁছল। বন্ড শোষকগুলোর স্পর্শ পেল কিন্তু একটুও নড়ল না। হাত বাড়িয়ে শুড় ছাড়াবার চেষ্টাও করল না। কারণ তা করতে গেলে তারের বাঁধন থেকে হাত খুলে নিতে হবে। শুড়টা এবার একটু টেনে দেখল বন্ডকে। বিশেষ খুশি হল না। কাদায় তৈরি শুয়োপোকার মত শুড়টা তার পা বেয়ে ওপরদিকে উঠল। এসে পড়ল রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত হাঁটুর ওপর। যন্ত্রণায় বন্ড দাঁতে দাঁত চাপল। মনশ্চক্ষে দেখতে পেল, মোটা শুড় বেয়ে জন্তুটার মস্তিষ্কের দিকে সংকেত ছুটে চলেছে : হুম, চমৎকার খেতে! আর সঙ্গে সঙ্গে তার জবাবে মস্তিষ্ক থেকে সংকেত নেমে আসছে, তাহলে ওটাকে টেনে আনো, নিয়ে এস আমার কাছে।
