হঠাৎ বন্ড বুঝতে পারল যে সুড়ঙ্গ বেয়ে সে পিছলে নেমে যাচ্ছে। কাঁধ চওড়া করে, পা ফাঁক করে নিজেকে আটকাতে চেষ্টা করল। জোর আঘাত পেল, কিন্তু গতিবেগ কিছু কমল না। এবার সুড়ঙ্গ পথ চওড়া হচ্ছে। দু ধারের। দেওয়াল আঁকড়ে ধরা অসম্ভব। সামনেই একটা মোড়। রাস্তাটা বেঁকে গেছে নিচের দিকে।
বন্ডের দেহ বাকের মুখে আছড়ে পড়ে নিচের দিকে ঘুরে গেল। হে সৃষ্টিকর্তা, সে সোজা নিচের দিকে নেমে চলেছে। সে মরীয়া হয়ে হাত-পা ছড়িয়ে গতিবেগ কমাতে চেষ্টা করল। সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় সে তীরবেগে নিচের দিকে। পিছলে পড়ছে। অনেক নিচে এক টুকরো গোল ধূসর আলো দেখা দিল। আকাশ? সমুদ্রঃ আলোকটা হু হু করে ছুটে আসছে তার দিকে। প্রাণপণে নিঃশ্বাস নিতে চেষ্টা করল। বেঁচে থাকার চেষ্টা, শুধু বেঁচে থাকা!
প্রথমে মাথা, তারপর বন্ডের বাকি দেহটা বুলেটের মত সুড়ঙ্গের মুখ দিয়ে ছিটকে বের হল। তারপর যেন খুব, খুব আস্তে নেমে চলল একশ ফুট নিচে ইস্পাতের মত চকচকে সমুদ্রের দিকে।
.
মশান
ভোরের টলটলে আয়নার মত সমুদ্রের পানিতে বন্ডের দেহটা যেন এক বোমার মত আছড়ে পড়ল।
সুড়ঙ্গ-পথ বেয়ে সামনের দিকে ছুটে আসা আলোর চাকতিটার দিকে এগুতে এগুতে কোন এক সহজাত প্রবৃত্তিতেই সে দাঁতের ফাঁক থেকে ছোরাটা হাতে করে নিয়েছিল। একই সঙ্গে হাত দুটো সামনে প্রসারিত করে শরীর শক্ত ও মাথা নিচু করে রেখেছিল এবং যে এক পলকের জন্য সে দুরন্ত বেগে ছুটে আসা সমুদ্রকে দেখতে পেয়েছিল, তারই মধ্যে এক বুক নিঃশ্বাস নিয়েছিল। ফলে অনেকটা ডাইভের কায়দাতেই বন্ড সমুদ্রের বুকে এসে পড়ল,–প্রসারিত মুষ্টিবদ্ধ দুই হাত পানির বুকে তার মাথা ও কাঁধের জন্য গহ্বরের সৃষ্টি করল, যদিও সে কুড়ি ফুট নিচে নামতে না। নামতে সম্পূর্ণ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। তবু ঘণ্টায় চল্লিশ মাইল বেগে সমুদ্রকে ধাক্কা দেওয়া সত্ত্বেও তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চুরমার হল না।
আস্তে আস্তে দেহটা পানির ওপর ভেসে উঠল। ঝাঁপ দেওয়ার ফলে যে সব ঢেউয়ের সৃষ্টি হল তারই ওপর দুলে দুলে ভাসতে লাগল। মাথা তখনও পানির নিচে। হয়ত পানিতে ভরা ফুসফুস দুটো কোন রকমে একটা শেষ সংকেত পাঠিয়ে দিল মস্তিষ্কের দিকে। হাত আর পা দুটো এলোমেলোভাবে নড়তে লাগল। মাথাটা সোজা হল, হাঁ করা মুখ থেকে পানি বেরিয়ে আসছে। আবার ডুবে গেল। তারপর পা দুটো নড়ল। যেন আপনা থেকেই দেহটাকে পানির মধ্যে খাড়া করতে চেষ্টা করছে। এবার ভীষণভাবে কাশতে-কাশতে মাথাটা এক ঝটকায় পানির ওপর উঠে এল। আর সেইভাবেই ভাসতে লাগল। হাত-পা দুর্বলভাবে নড়তে লাগল। অচেতনতার লাল কালো পর্দার ভেতর দিয়ে রক্তাক্ত চোখ দুটো তীরভূমি দেখতে পেল এবং অসাড় মস্তিষ্ককে নির্দেশ দিল সেই দিকে যাবার জন্য।
মশান! উঁচু পাহাড়ের নিকটে একটা খাড়ি। খুব শক্ত তারের জাল পাহাড়ের গা থেকে বেরিয়ে এসে খাড়িটাকে বাইরের সমুদ্র থেকে পৃথক করে দিয়েছে, ঠিক যেন পাহাড়ের গায়ে লাগানো এক পানিতে ভর্তি লোহার খাঁচা। বন্ড খাঁচার মধ্যে এসে পড়েছিল।
বন্ড বেড়ার কাছে গিয়ে তার ধরে ঝুলে রইল ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মত। পুরো পনের মিনিট সেইভাবে পড়ে রইল। কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর বমির বেগে কেঁপে উঠল সর্বাঙ্গ। শেষে মাথা ঘুরিয়ে, সে কোথায় আছে তা দেখবার মত শক্তিটুকু ফিরে পেল। আবছাভাবে মাথার ওপরের উঁচু পাহাড়ের চূড়াগুলো দেখতে পেল। ঐ জায়গাটাতে এখনও গাঢ় ধূসর ছায়া পড়ে রয়েছে। পাহাড়ের ওদিকে ভোরের আলো দেখা যাচ্ছে।
অলসভাবে বন্ডের মন এই লোহার তারের বেড়ার তাৎপর্য আন্দাজ করতে চেষ্টা করল। এই বেড়ার উদ্দেশ্য কি? কেন সমুদ্রের এই অন্ধকারের কোণটুকু বেড় দেওয়া আছে। যাতে বাইরের সমুদ্রের কোন এক প্রাণী ভেতরে আসতে না পারে? নাকি, যাতে ভেতর থেকে বাইরে যেতে না পারে? বন্ড চারদিকের গভীর কালো পানির ওপর ধোয়াটে দৃষ্টি বুলিয়ে নিল। তারের বেড়াটা অনেক নিচে অদৃশ্য হয়ে গেছে। তার কোমরের নিচে দুই-পা ঘিরে কয়েকটা ছোট-ছোট মাছ। কি খাচ্ছে তারা। বারবার তার দিকে ছুটে এসে আবার সরে যাচ্ছে। কালো রঙের কি একটা খাচ্ছে। তার শতছিন্ন কাপড়ের সুতা নাকি? মাথা পরিষ্কার করার জন্য বন্ড মাথা ঝাঁকাল। আবার তাকিয়ে দেখল। না, মাছগুলো তার রক্ত খাচ্ছে!
বন্ড কেঁপে ওঠলো। হ্যাঁ, তার সর্বাঙ্গ থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে, ক্ষত-বিক্ষত কাঁধ, হাঁটু পানির স্পর্শে যন্ত্রণাদায়ক স্পর্শ অনুভব করল। এই যন্ত্রণাই জাগিয়ে তুলল তার চিন্তাশক্তির গতি। ছোট মাছেদেরই যদি তার রক্তের স্বাদ এত ভাল লাগে, তবে ব্যারাকুড়া বা হাঙ্গরের কেমন লাগবে? তবে কি এই তারের জাল লাগানো হয়েছে যাতে মানুষখেকো মাছেরা বাইরের সমুদ্রে না পালায় তার জন্য? তাহলে এতক্ষণ তারা তাড়া করেনি কেন? চুলোয় যাক! প্রথম কাজ বেড়া বেয়ে উঠে অপরদিকে গিয়ে পড়া। তাহলে, কালো মাছের খাঁচায় যাই থাকুক-না-কেন, তাদের দুজনের মাঝখানে এই লোহার জালটা থাকবে।
দুর্বলভাবে, বন্ড তারের জাল বেয়ে ওপরে ওঠল। তারপর উল্টোদিক বেয়ে নেমে এল যতক্ষণ না পানির অনেকটা ওপরে বিশ্রাম নিতে পারে। তারের ফাঁক দিয়ে পা গলিয়ে সে ঝুলতে লাগল। ঝাপসা চোখে দেখতে লাগল মাছগুলো এখনও তার পা থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্ত খেয়ে চলেছে।
