বন্ড আলো সরিয়ে সরিয়ে অনেকক্ষণ জালের ফাঁক দিয়ে দেখল। তারপর তেল বাঁচাবার জন্য আপাতত নিভিয়ে দিল আলোটা। তার চাপা নিঃশ্বাস এতক্ষণে সংবদ্ধ দুই দাঁতের পাটির ফাঁক দিয়ে শিস কেটে বেরিয়ে এল।
মাকড়সা, দৈত্যাকার ট্যারান্টুলা মাকড়সা। এক-একটা তিন থেকে চার ইঞ্চি লম্বা। অন্তত কুড়িটা আছে ঐ খাঁচার। মধ্যে এবং যে করেই হোক এদের পেরিয়ে যেতে হবে তাকে।
বন্ড চুপচাপ শুয়ে ভাবতে লাগল। লাল চোখগুলো আবার তার মাথার চারিপাশে জড়ো হয়ে এল।
কতটা মারাত্মক এই মাকড়সারা? এদের নিয়ে যে সব ভয়াবহ কাহিনী শোনা যায়, তার কতটা সত্যি? এদের বিষ জন্তু-জানোয়ার মারবার পক্ষে যথেষ্ট; কিন্তু মানুষ মারতে পারে কি? বন্ড কেঁপে ওঠলো। খাটের সেই বিছেটার কথা মনে পড়ে গেল। ট্যারান্টুলাদের স্পর্শ তার চেয়ে নরম হবে। একটা খেলনা ভালুকের থাবার স্পর্শের চেয়ে বেশি মনে হবে না—যতক্ষণ না তারা তাদের বিষের থলি তার দেহের মধ্যে উজাড় করে দেয়।
কিন্তু আরেকটা কথা। এইটাই কি ডক্টর নো-র শেষ মার? হয়ত একটা-দুটো কামড় তাকে যন্ত্রণায় অচেতন করে দেবে। হয়ত ডক্টর নো কল্পনার চোখে দেখেছেন, তাকে অন্ধকারের তার ছিঁড়ে ঐ রক্তচক্ষু অরণ্যের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। লাইটারের কথা অবশ্য ডক্টর নো ভাবেননি। তিনি বুঝেছেন বন্ড কয়েকটা মাকড়সাকে থেঁতো করে এগিয়ে যাবে। কিন্তু তার পরেরগুলো ঠিকই দাঁত বসিয়ে দিতে পারবে। কয়েকটা আটকে যাবে তার পোশাকে আর যথাসময়ে। কামড় বসাবে। তারপর সর্বশরীরে আস্তে আস্তে জ্বলন্ত বিষ ছড়িয়ে পড়বে। এতটাই ভেবেছেন নিশ্চয়ই ডক্টর নো যাতে সে আর্ত চিৎকার করতে করতে সামনের দিকে ছুটে যায়। কোন্ পথে? কোন্ অন্তিম পরিণামের দিকে?
কিন্তু বন্ডের হাতে আছে লাইটার, ছুরি আর সড়কি। এখন মাথা ঠাণ্ডা করে, খুব আস্তে হাত চালালেই হল।
বন্ড লাইটারের মুখ খুলে সলতেটাকে টেনে ইঞ্চিখানেক বাড়িয়ে দিল, যাতে আগুনের শিখা আরো বড় হয়। জ্বালাতেই মাকড়সাগুলো হুড়মুড় করে পিছু হটে গেল। একই সঙ্গে সে ছোরা দিয়ে তারের জালতিটাকে ফেড়ে দিল। ছেঁড়া অংশ ধরে টান দিতেই সমস্ত জালতিটা কাপড়ের মত ছিঁড়ে হাতে চলে এল। ছোরা দাতে চেপে ধরে বন্ড সামনে এগুলো। আগুন দেখে মাকড়সারা সভয়ে পিছিয়ে গেল। বন্ড সড়কি বার করে তার ভোঁতা দিকটা দিয়ে সেই ঝাঁকের মধ্যে খোঁচা মারল। সজোরে পর পর খোঁচা মেরে চলল। মাকড়সাদের দেহ ফেটে, পিষে গেল। দু-একটা তার দিকে পালিয়ে আসবার চেষ্টা করতেই সে দিকে আলো বাড়িয়ে একে একে থেঁতলে দিল পলাতকদের। এবার জীবন্ত মাকড়সারা মৃত ও আহতদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে আর বন্ডকে সেই বীভৎস, স্পন্দনমান রক্ত ও লোমের দলার ওপর বেশি আঘাত করতে হল না।
মাকড়সাদের সব চাঞ্চল্য কমতে কমতে শেষে থেমে গেল। সবকটা মরেছে? নাকি কয়েকটা মটকা মেরে আছে? লাইটারের শিখা ক্রমশ নিভে আসছে। একটু ঝুঁকি নিতেই হবে। বন্ড সামনে ঝুঁকে পড়ে দলা পাকানো মৃতদেহগুলি একপাশে ঠেলে সরিয়ে দিল। দাঁতের ফাঁক থেকে ছোরা নামিয়ে হাত বাড়িয়ে খাঁচার উল্টোদিকের তারের জালতিটা চিরে দিল। তারপর সেটাকে ছিঁড়ে নামিয়ে দিল থেতলানো মৃতদেহগুলোর ওপর। লাইটারের আলো দপদপ করে উঠে ক্ষীণ রক্তিম শিখায় জ্বলতে লাগল। বন্ড এক ঝটকায় নিজের শরীরটাকে তুলে নিয়ে গিয়ে ফেলল রক্তাক্ত একরাশ মৃতদেহের ওপর দিয়ে, ছেঁড়া তারের জালতির ভেতর দিয়ে; মাকড়সার খাঁচার ওপারে।
সে বুঝতে পারল না তার গায়ে ধাতুর ছোঁয়া লাগল কিনা, কিংবা মাকড়সাদের মধ্যে তার পা পড়লো কিনা। সে কেবল বুঝতে পারল যে সে বেরিয়ে এসেছে। সুড়ঙ্গ বেয়ে বেশ কয়েক গজ এগিয়ে গিয়ে সে থামল দম নেবার জন্য আর মাথা ঠাণ্ডা করবার জন্য।
মাথার ওপর একটা ম্লান আলো জ্বলে ওঠলো। বন্ড চোখ কুঁচকে সেদিকে দেখল সেই বাঁকা হলদেটে চোখে জোড়া পুরু কাঁচের ওপার থেকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকে দেখছে। আস্তে আস্তে দু পাশে মাথাটা নড়ল। ছদ্ম করুণার ভঙ্গিতে চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেল। একটা মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে ধরল–বুড়ো আঙ্গুল নিচের দিকে নামানো। বিদায় এবং অন্তিম অভিবাদনের সংকেত। তারপর হাতটা সরে গেল, আলো নিভে গেল। বন্ড ঠাণ্ডা মেঝের ওপর কপাল রেখে শুয়ে রইল। সংকেতটা দেখে বোঝা গেল যে সে দৌড়ের শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। আর তার ওপর নজর রাখবার প্রয়োজন নেই। কেবল যথাসময়ে মৃতদেহ তুলে আনলেই হবে। এতদূর যে সে বেঁচে থাকতে পেরেছে, সেজন্য লোকটার মুখে সামান্যতম বদল হল না দেখে বন্ড যেন আরো দমে গেল। এই নিগ্রোগুলো তাকে ঘৃণা করে। তারা চায় যে সে বিশ্রীভাবেই মরুক।
বন্ড দাঁতে দাঁত ঘষলো। মেয়েটার কথা মনে পড়তে সে একটু মনে বল পেল। এখনো মরেনি সে। কিছুতেই মরবে না। যতক্ষণ না তার হৃৎপিণ্ড শরীর থেকে ছিঁড়ে বার করা হয়।
বন্ড সর্বাঙ্গের পেশী শক্ত করল। এবার এগোতে হবে। সাবধানে অস্ত্রগুলো যথাস্থানে রেখে অতি কষ্টে শরীরটাকে টেনে নিয়ে চলল অন্ধকারের ভেতর দিয়ে।
সুড়ঙ্গ ক্রমশ ঢালু হচ্ছে। চলতে সুবিধে হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে রাস্তা এত ঢালু হয়ে এল যে তার ওপর গা এলিয়ে দিলেই বেশ পিছলে যাচ্ছে। দেহের পেশীগুলোকে আর খাটাতে হচ্ছে না। খুব আরাম হচ্ছে। সামনে একটু করে ধূসর আলো। উজ্জ্বল না হলেও অন্ধকারের চেয়ে পাতলা। হাওয়াটা কেমন যেন অন্যরকম। একটা নতুন তাজা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কিসের গন্ধ? সমুদ্র?
