কিছুক্ষণ পরেই যন্ত্রণায় স্রোত টেনে তুলল তাকে। কোনরকমে চিৎ হয়ে শুলো। ঝাপসা চোখে দেখতে পেল মাথার ওপর একটা আলোকিত পোর্টহোল। তার ভেতর দিয়ে একজোড়া চোখ একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর অবচেতনতার কালো স্রোতে গা এলিয়ে দিল।
সেই গভীর অন্ধকারে খুব ধীরে ধীরে গায়ের চামড়ার ওপর সারি সরি ফোঁসকা গজিয়ে উঠল, ক্ষতবিক্ষত পা আর কাঁধ শক্ত হয়ে উঠল। গায়ের ঘাম গায়েই শুকাল, ঘামে ভেজা শতছিন্ন কাপড়-চোপড়ও শুকিয়ে গেল, ঠাণ্ডা বাতাস চুপি চুপি উত্তপ্ত ফুসফুসে ঢুকে পড়ে তার কাজ শুরু করল। কিন্তু যন্ত্রণাকাতর শরীরের অন্তরালে তার হৃদপিণ্ড স্পন্দিত হয়েই চলল–সজোরে ও সমান তালে। অক্সিজেন ও বিশ্রামের জাদুযন্ত্র ক্রমশ শিরা ও ধমনীর মধ্যে জীবনস্রোত ফিরিয়ে আনল, স্নায়ুমণ্ডলীতে নতুন শক্তির যোগান দিল।
যেন অনেক বছর পরে বন্ডের ঘুম ভাঙল। নড়েচড়ে উঠল সে। চোখ খুলতেই দেখতে পেল কয়েক ইঞ্চি দূরে কাঁচের পেছনে আর এক জোড়া চোখ। সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রণার ধাক্কা তার সর্বাঙ্গ ঝাঁকিয়ে দিল। সে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করল। আবার, আবার চেষ্টা করল, যতক্ষণ না সমাগত মৃত্যুর ক্ষমতা আয়ত্বে আসে। তারপর তাকিয়ে থাকা চোখদুটোকে আড়াল করবার জন্য উপুড় হয়ে শুয়ে মৃত্যু যন্ত্রণার ঢেউয়ের পুরো আঘাতটা নিজের ওপর টেনে আনল। অপেক্ষা করতে লাগল, দেখবার জন্য যে কি হয়, তার শরীরে কতটুকু শক্তি আর কতটুকু প্রতিজ্ঞা অবশিষ্ট আছে। আর কতটা ব্যথা সহ্য করতে পারবে সে? যন্ত্রণার চোটে অন্ধকারে বন্ডের মুখ বিকৃত হয়ে উঠল। একটা পাশবিক কাতরানি বেরিয়ে এল। ব্যথা ও প্রতিরোধের বিরুদ্ধে একজন মানুষের যতদূর সহ্যশক্তি থাকা সম্ভব, তার অন্তিম প্রান্তে পৌঁছেছে। ডক্টর নো তাকে কোণঠাসা করে ফেলেছেন। কিন্তু মানুষ মরিয়া হয়ে উঠলে কিছুটা অমানুষিক শক্তি খুঁজে পায়। এবং একজন বলিষ্ঠ মানুষের দেহে সে শক্তির পরিমাণ বড় কম নয়।
আস্তে আস্তে অসীম যন্ত্রণা সহ্য করে বন্ড হামাগুড়ি দিয়ে কয়েক গজ এগোল। তারপর লাইটার বার করে জ্বাললো, সামনে কুচকুচে কারো সড়ঙ্গ পথ ছাড়া কিছু নেই। তার গোল হাঁ-করা মুখটাকে মৃত্যু গহ্বরের মত দেখাচ্ছে। লাইটার পকেটে পুরলো। একটা গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে দু হাটু ও দু হাতে, চারপায়ে ভর দিয়ে দেখল। যন্ত্রণা খুব বেশি বলে মনে হচ্ছে না। কেবল একটু যেন অন্যরকম। আস্তে আস্তে, আড়ষ্ট ভঙ্গিতে সে সামনে এগোল।
বন্ডের হাঁটু ও হাতের পট্টি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আবছা আবছা বুঝতে পারল যে ফোঁসকাগুলো ঠাণ্ডা ধাতুতে লেগে ফেটে গিয়ে পানি বেরুচ্ছে? চলতে চলতে সে হাতের তালু ও পায়ের পাতা ভাঁজ করে দেখতে লাগল। ক্রমশ যন্ত্রণাটা বুঝে গেল। বুঝতে পারল কোন জায়গায় কতটা লাগছে। জোর করে নিজেকে বোঝাতে চাইল যে যন্ত্রণাটা খুব সহ্য করা চলে। ধরা যাক সে বিমান দুর্ঘটনায় পড়েছিল। সে ক্ষেত্রে ডাক্তারেরা তার আঘাতকে বহিগাত্রের কাটা ছেঁড়া ও পোড়ার বেশি আমল দিতেন না। কয়েকদিনের বেশি হাসপাতালেও থাকতে হত না। আমার শরীরে কিছু হয়নি। বিমান দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছি আমি। ভেবে দ্যাখো অন্য সব ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া যাত্রীদের কথা। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দাও। আর মাথা থেকে এই চিন্তা সরিয়ে দাও।
কিন্তু নিজেকে যতই ভোলাবার চেষ্টা করুক না কেন, বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল যে, আসল বিপদ এখনও আসেনি, এখনও সে কেবলমাত্র এগিয়ে চলেছে সেদিকে। এ কথা মনে পড়লেই তার সব প্রতিরোধ, সব উৎসাহ কমে আসছে। কখন আসবে সেটা? কি ধরনের বিপদ হওয়া সম্ভব সেটা? সেই শেষ প্রান্তে পৌঁছনোর আগে আঘাতে-আঘাতে কতটা নরম করে দেওয়া হবে তাকে?
সামনে অনেকগুলো লালরঙের ফোঁটা দেখা দিল। নিশ্চয়ই ভুল দেখছে। এত পরিশ্রমের পর চোখের সামনে লালে লাল তারা নাচছে আর কি। বন্ড থেমে পড়ে চোখ কুঁচকে দেখল। মাথা ঝাঁকাল। না, এখনও দেখা যাচ্ছে ফোঁটাগুলো। আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল। এবারও দেখল ফোঁটাগুলো নড়ছে। আবার থেমে গেল বন্ড। কান পাতলা। তার হৃৎপিণ্ডের ধৰ্ধক্ শব্দ ছাপিয়ে শোনা গেল কাদের যেন মৃদু নড়াচড়ার আওয়াজ। ফোঁটাগুলো সংখ্যায় বেড়ে গেছে, প্রায় কুড়ি তিরিশটা হবে। এদিক-ওদিক নড়ছে। সামনের সবটা পথ জুড়ে তাদের চাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে! বন্ড লাইটার বার করল। দমবন্ধ করে সেটা জ্বাললো। লাল আলোয় ফোঁটাগুলো নিভে গেল। তার বদলে দেখা গেল অতি সূক্ষ্ম মসলিনের মত। একটা তারের জাল উঠে গেছে সুড়ঙ্গের মুখে।
জ্বলন্ত লাইটার সামনে ধরে বন্ড এগিয়ে গেল। সামনের ওটা একটা খাঁচা। ভেতরে একদল জীবন্ত প্রাণী চলে ফিরে বেড়াচ্ছে। সে স্পষ্ট শুনতে পেল, তারা হুড়মুড় করে আলোর কাছ থেকে সরে যাচ্ছে। জালতির এক ফুটের মধ্যে এসে লাইটার নিভিয়ে দিল। অপেক্ষা করল, যতক্ষণ না অন্ধকারে চোখ সরে যায়। শুনতে পেল কারা যেন তার দিকে এগিয়ে আসছে। এক ঝাক লাল ফোঁটা তারের ফাঁকে দিয়ে এক দৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
কি ওগুলো? বন্ডের হৃৎপিণ্ডের গতি বেড়ে গেল। সাপ? বিছে মাকড়সা?
খুব সাবধানে সেই লাল চোখের অরণ্যের দিকে নিজের দু চোখ এগিয়ে নিয়ে গেল। মুখের পাশে লাইটার বাগিয়ে ধরে, হঠাৎ জ্বালিয়ে দিল সেটা। এক পলকের জন্য দেখতে পেল, তারের জালতি আঁকড়ে ধরা অজস্র রোমশ পা, অনেকগুলো রোমশ দেহ এবং তার ওপরে বড় বড় সহস্র চক্ষু মাথা। প্রাণীগুলো চটপট জালতি ছেড়ে ছিটকে পড়ল। খাঁচার অপর প্রান্তে গিয়ে জড়ো হল একসঙ্গে–যেন লোমে ভর্তি একদলা মাংস।
