বন্ড খুব আস্তে হাত পা চালাল। তার গরম নিঃশ্বাস দস্তার পাতের ওপর লেগে বাষ্প হয়ে উঠে যাচ্ছে। শেষ শক্তিটুকু একত্র করে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল সুড়ঙ্গপথের গর্ভে। তারপর হাত পা ছড়িয়ে উপুড় হয়ে পড়ে রইল। অনেকক্ষণ পর বন্ডের চোখ খুলল আর সে নড়ে উঠল। তার শরীর অচেতনতার সমুদ্রে ডুব দিয়েছিল, কিন্তু ঠাণ্ডা হাওয়া তাকে জাগিয়ে তুলল। অসীম যন্ত্রণা সহ্য করে সে চিৎ হয়ে গেল। চুপচাপ শুয়ে রইল তার বুদ্ধি ও শক্তিটুকু এক করবার জন্য। আগের সুড়ঙ্গটার পোর্টহোলের দিকে হলদেটে আলোর দিকে তাকাল। কাঁচটা পুরু দেখে তার Q লেখা ঘরটার পোর্টহোলের কথা মনে পড়ল।
হঠাৎ কাঁচের পেছনে কি যেন একটা নড়ল। তার চোখের সামনে, বৈদ্যুতিক আলোর আড়াল থেকে এক জোড়া চোখ এগিয়ে এল। স্থিরভাবে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর অদৃশ্য হল। বন্ড দাঁত খিচাল। তাহলে সে কতটা এগোচ্ছে তার ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
ক্ষেপে গিয়ে বন্ডচিৎকার করে গালাগালি দিল। তারপর আবার নির্জীব হয়ে শুয়ে রইল। মাথা তুলে দেখলো সুড়ঙ্গটা অন্ধকারের বুকে অদৃশ্য হয়ে গেছে। চলে এস। এদিক-ওদিক তাকিয়ে কিছু হবে না। ছোরাটাকে আবার দাঁতে চেপে ধরে অতিকষ্টে সে এগিয়ে চলল।
আলো আর দেখা যাচ্ছে না। বন্ড মাঝে মাঝে থেমে লাইটার জ্বালিয়ে দেখছিল। সুড়ঙ্গের বাতাস যেন গরম, আরো পঞ্চাশ গজ এগোবার পর রীতিমত গরম লাগল। বন্ড ঘামতে লাগল। সর্বশরীর ঘামে ভিজে গেল, কয়েক মিনিট অন্তর চোখ মুছে নিতে হচ্ছে। সুড়ঙ্গ ডানদিকে ঘুরে গেছে। মোড় ঘুরতেই গায়ে যেন হ্যাঁকা লাগল। উত্তাপের গন্ধ তীব্র হল। রাস্তাটা আবার ডানদিকে ঘুরে গেছে। মোড়টায় পৌঁছে বন্ড লাইটার জ্বালিয়েই পিছিয়ে এল। তারপর শুয়ে পড়ে হাঁপাতে লাগল। তেতো মুখে সামনের নতুন বাধা পরখ করল। গালাগালি দিল। তার পরবর্তী বাধা–উত্তাপ।
জোরে গুঙিয়ে উঠল বন্ড। তার ক্ষতবিক্ষত দেহ কি করে এই উত্তাপ সহ্য করবে? কিন্তু কিছুই করবার নেই। হয় তাকে ফিরে যেতে হবে। নয়ত চুপচাপ বসে থাকতে হবে, অথবা সামনে এগুতে হবে। তবে একটামাত্র সান্ত্বনা আছে। এই উত্তাপে সে মারা পড়বে না, পঙ্গু হয়ে যাবে। কারণ এখনও দৌড়ের শেষ পর্যায়ে আসেনি। এটা তার সহ্যশক্তির আরেক পরীক্ষা ছাড়া কিছু নয়।
মেয়েটার কথা মনে পড়ল বন্ডের। মনে পড়ল তার অবস্থার কথা। যাক, এখন এগুতে হবে…।
ছোরা বার করে বন্ড তার শার্টের পুরো সামনের দিকটা ফালি ফালি করে কাটল। হাতে আর পায়েই সবচেয়ে বেশি তাপ লাগবে। এখন একমাত্র আশা যদি সে সব জায়গায় কিছু কাপড় জড়ানো যায়। হাঁটু আর কনুইয়ে যে টুকু কাপড়ের আবরণ আছে, তাই দিয়েই চালাতে হবে। অসীম ক্লান্তির সঙ্গে সে কাজ শুরু করল, চাপা গলায় ডক্টর নো কে গালাগালি দিতে দিতে।
এবার সে তৈরি। এক, দুই, তিন…।
বন্ড মোড় ঘুরে হাঁপাতে হাঁপাতে উত্তাপের তীব্র গন্ধে ব্রা সুড়ঙ্গে ঝাঁপ দিল।
অনাবৃত পেটটাকে মেঝে ছুঁতে দিল না। কাঁধ জোড়া ছোট কর। হাত নামাও, তারপর হাঁটু, তারপর পায়ের পাতা, জোরে আরও জোরে। এত জোরে চলতে হবে যেন শরীরের কোন অংশ বেশিক্ষণ মেঝে ছুঁয়ে না থাকে।
হাঁটুতে সবচেয়ে বেশি লাগছে, কারণ ঐ দুটো জায়গাতেই বন্ডের প্রায় সবটুকু ওজন গিয়ে পড়েছে। এবার তার হাতের পটিগুলো জ্বলতে শুরু করেছে। একটা স্ফুলিঙ্গ, তারপর আরেকটা, শেষে ঝক ঝক স্ফুলিঙ্গ রক্তবর্ণ ছুটন্ত রেখার সৃষ্টি করল। কাপড় পোড়াঙ্গিধোয়া বন্ডের ঘর্মাক্ত চোখে জ্বালা ধরিয়ে দিল। হায় সৃষ্টিকর্তা, আর পারা যাচ্ছে না। একবিন্দু হাওয়া নেই। ফুসফুস যেন ফেটে বেরিয়ে আসছে। এবার গায়ের চামড়া পোড়বার পালা। একটু টলে যেতেই তার ক্ষতবিক্ষত কাধ উত্তপ্ত ধাতুর ওপর ঘষে গেল। আর্তনাদ করে উঠল বন্ড। সে আর্তনাদ আর থামল না। হাতে পায়ের যে কোন অংশ মেঝের সংস্পর্শে আসবার সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতর থেকে আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে লাগল। মৃত্যুর আর দেরি নেই।
এবার সে উপুড় হয়ে সামনে আছড়ে পড়বে এবং জ্যান্ত পুরে মরবে। না, তাকে এগিয়ে যেতেই হবে, যে পর্যন্ত তার সমস্ত মাংস পুড়ে গিয়ে হাড় পর্যন্ত আগুন না পৌঁছায়। হাঁটুর চামড়া এতক্ষণে সব পুড়ে গেছে। অল্পক্ষণের মধ্যে তার হাতের চামড়ায় উত্তপ্ত ধাতুর ছোঁয়া লাগবে। সর্বাঙ্গ দিয়ে গড়িয়ে পড়া ঘাম নিশ্চয় এতক্ষণ হাতের পট্টিগুলোকে ভিজিয়ে রেখেছিল। চিৎকার কর, চিৎকার করে যাও। এতে ব্যথা কম মনে হবে। তাতে তুমি বুঝতে পারবে এখনও তুমি বেঁচে আছ। এগোও, এগোও, আর বেশি দেরি নেই। এখানে তোমার মরবার কথা নয়। তুমি এখনও বেঁচে আছ। হাল ছেড়ো না।
বন্ডের ডান হাত কিসে যেন ধাক্কা দিল। সঙ্গে সঙ্গে খুলে গেল সেটা। এক ঝলক বরফের মত ঠাণ্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। অন্য হাতেও সেই স্পর্শ পেল, মাথাতেও। মৃদু শব্দ করে একটা অ্যাসবেস্টসের ঢাকনির নিচের অংশ তার পিঠের ওপর দিয়ে সরে গেল। বেরিয়ে এসেছে সে। ঢাকনিটা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। হাতে কঠিন দেওয়ালের স্পর্শ পেল। হাতড়ে হাতড়ে বুঝতে পারল সুড়ঙ্গ ডান দিকে ঘুরে গেছে। তার দেহটা অন্ধের মত ডান দিকে ঘুরল। ঠাণ্ডা হাওয়া যেন একরাশ ছুরির মত তার ফুসফুসকে আঘাত করল। সাবধানে মেঝে স্পর্শ করে দেখল, ঠাণ্ডা! একবার গুঙিয়ে উঠেই বন্ড উপুড় হয়ে শুয়ে পড়া। হাত পা ছড়িয়ে অসাড় হয়ে শুয়ে পড়ল।
