এখন মাত্র চারখানা তাসই আছে যা বন্ডের হারার পক্ষে যথেষ্ট। বন্ডের বুকখানা কেঁপে উঠল। তখন ভদ্রলোক জুতা থেকে তাসটা বার করে এনে তুললেন তারপর চিৎ করে সেটা দেখালেন। নয়, মানে রুইতনের নওয়া।
বন্ডের তাস উল্টিয়ে দেখানোর মানে হল শোচনীয়ভাবে পাঁচটা পয়েন্ট হবে নিতান্তই নিয়ম রক্ষার জন্য। ঠিক তখনই টেবিলের চারপাশে একটা হাহাকার শোনা গেল। একজন বললেন, ভদ্রলোক আরো তাস নেওয়া দরকার ছিল। কিন্তু বন্ড জানে তাস নিলে পর এই রুইতনের নাওলাটাই পেত সে। তার পয়েন্টটা কমে চার এ পৌঁছাত। সেবেলায় তার হার-জিৎ হত পরের তাসের উপর। বন্ড কিন্তু আর তার পরের তাসের অপেক্ষা করতে পারল না। তার পরাজিত সাথীদের দিকে তাকিয়ে একটা বিষণ্ণ হাসি হেসে চাকতির স্তূপটা তার পকেটে রেখে দিয়ে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে এগিয়ে চলল বারের দিকে। তখন পরিচালক মশাই উচ্চস্বরে বাজির ফলাফল বলে চলল। বন্ড মনে মনে বলল, জাহান্নামে যাক সব। মাত্র আধ ঘণ্টা আগেও তার পকেটে ছিল রিতিমত একগাদা টাকা। আর বর্তমানে, রোমান্টিক। কায়দা দেখাতে গিয়ে তার নিজের অলসতার জন্য সব টাকা শেষ হয়ে গেল। মরুক গে, সে তো চাইছিল এক উল্লেখযোগ্য রাত। এই পার হল তার অর্ধেক-এর প্রথম। বোঝা যাচ্ছে না বাকিটা কিভাবে কাটবে।
মেয়েটা তার সামনে এক বোতল কোল্ডিও নিয়ে বার-এ বসে ছিল। তার তাকানোর মধ্যে কোন নিশ্চয়তা ছিল না। বন্ড এসে ঠিক তার সামনে বসে পড়ল। মেয়েটি শুধু একবার মুখটা তুলে তাকাল। বন্ড বলল, আমাদের জুটিটা একদম হেরে গেল। টাকাটা যাতে আবার পাওয়া যায় তার চেষ্টা করেছিলাম। মাত্র অর্ধেক বাজি ধরে। কিন্তু আমার মনে হল দানবটাকে আর না নামালেই ভাল হত। আমি পাঁচ পয়েন্ট পেয়েছিলাম। আর ও পেয়েছিল শূন্য। তারপর আবার টানল নাওলা। মেয়েটি ভাবলেশহীন ভাবে বলে গেল পাঁচ পয়েন্টের পর তোমার একটা টানা দরকার ছিল। আমি কিন্তু সর্বদাই তাই করে থাকি। তারপর একটু ভেবে নিয়ে বলল, তাহলে তো তোমার চার পয়েন্টে এসে দাঁড়াত। পরের তাসটা কি ছিল?
সে আমি দেখার জন্য আর ওখানে থাকিনি। আমি তোমাকে দেখার জন্য উঠে এলাম। মেয়েটা তার দিকে এমন চোখে তাকাল যেন মনে হল মেপে দেখছে। তারপর বলল, আমি যখন অপমানের বাজি খেলোম তখন তুমি কেন আমাকে মুক্তি দিলে।
বন্ড তার কাঁধটা সামান্য নাড়াল, সুন্দরী নারীদের যদি বিপদে পড়তে দেখি তবে কি থাকা যায়? আর তাছাড়া আবেভিল আর মন্ট্রিলের মাঝখানের রাস্তায় তো আমাদের বন্ধুত্ব হয়েই গেছে। তুমি কিন্তু সুন্দর গাড়ি চালাও। একটু খানি হেসে বলল, কিন্তু আমার যদি ঠিক মত খেয়াল থাকত তবে মনে হয় না তুমি আমাকে পেছনে ফেলতে পারতে। আমি মাত্র তো নব্বই মাইল বেগে গাড়ি চালাচ্ছিলাম, পেছনের রাস্তার ওপর নজরও ছিল না। আমি অন্য একটা কথা ভাবছিলাম। চালটা ঠিকমত পড়েছিল। মেয়েটির মুখে ও গলায় সতেজতা ফিরে এল। ও হ্যাঁ মনে পড়ে গেছে। এমনিতেও আমি তোমাকে হারিয়ে দিতাম। ঐ মেঠো পথে আমার সাথে তুমি পেরে উঠতে না। তাছাড়া মেয়েটার গলায় বিরক্তির চিহ্ন, যে কোন সময়েই আমি তোমাকে হারাতে পারব। তুমি তো তোমার প্রাণের মায়া কর, কিন্তু আমি তা করি না।
হে! সৃষ্টিকর্তা। আরেকটি ঐ জাতের চিড়িয়া হাজির হল। জীবনের ওপর আধা বা পুরোই বিতৃষ্ণা এসে গেছে। বন্ড এই কথায় কোন কিছু বলল না। তার অর্ডারের অর্ধেক বোতল কুগ এল। বেয়ারা একজন তার গ্লাস অর্ধেক ভরে দিল। বন্ড তার মধ্যে আরো অর্ধেক ঢেলে গ্লাসট ভর্তি করে মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিল। স্বাভাবিক গলায় বলল, আমার নাম বন্ড মানে জেমস বন্ড। দয়া করে বেঁচে যাও। অন্ততঃ আজকের রাতের মত। একবার গ্লাসটা খালি করে আবার ভর্তি করল।
মেয়েটি তাকে বিচার করে দেখতে লাগল। তারপর সেও নিজের গ্লাসটা খালি করে ফেলল। বলল, আমার নাম হল ট্রেসি। হোটেলের রিসেপশনে আমার যে বিরাট নাম বলেছে তারই সংক্ষিপ্ত নাম এটা। টেরেসা একজন সন্ন্যাসিনী ছিলেন, আমি কিন্তু সন্ন্যাসিনী নই। ম্যানেজার ভদ্রলোক বোধহয় বেশ রোমান্টিক স্বভাবের হবে। তুমি যে আমার সম্বন্ধে জানতে চেয়েছিলে সে খবর উনিই আমাকে জানিয়েছেন। এবার তাহলে উঠে পড়ি। কথা বলতে আমার বেশি ভাল লাগে না। আর তোমারও একটা উপহার পাওনা আছে।
সে হঠাৎই উঠে পড়ল। বন্ডও দাঁড়াল, যদিও সে ঘটনাটা বুঝে উঠতে পারল না। ট্রেসি বলল, না। আমি একাই চলে যাচ্ছি। তুমি পরে আসতে পার। আমার ঘরের নম্বর হল পঁয়তাল্লিশ। যদি তোমার ইচ্ছে থাকে তবে সেখানে তোমার জীবনের সবচেয়ে দামী সহবাসের ইচ্ছে পূরণ করতে পার। যে টাকা তুমি আমার জন্য খরচ করেছ, আশা করি তা উঠে আসবে।
.
বিড়ালের রং ধূসর
বিশাল একটা বিছানায় শুয়ে সে অপেক্ষা করছিল। তার চিবুক পর্যন্ত একটি চাদর দিয়ে ঢাকা। টেবিল-ল্যাম্পের আলো পড়ে চুলগুলি সোনালি ডানার মত লাগছিল। তার দুটি নীল চোখ জ্বলছে।
বন্ড দরজা বন্ধ করে বিছানার একপাশে গিয়ে বসল, স্তবকের মত উঁচু বাঁ-দিকের বুকের উপর হাত রাখল।
ট্রেসি-তুমি শোন,
এই অদ্ভুত মেয়েটির সম্পর্কে কিছু আমার জানা দরকার। যার শূন্য হাত সে কি করে জুয়া খেলতে বসে? উন্মাদের মত গাড়ি চালাবার মানেটাই বা কি? জীবনে কেন এই বিষাদ?
