এবার লিল-এর দানবটি এই নিয়ে বেশ মজা পাচ্ছে মনে হল। তিনি এটা বেশ বুঝতে পারলেন যে, মেয়েটার কাছে। টাকা না থাকলে ক্যাসিনো তার প্রাপ্য টাকা মিটিয়ে দিতে বাধ্য হবে। তিনি চোখ নিচের দিকে করে চুপচাপ বসে রইলেন–মনে হচ্ছে কতই যেন ব্যাথিত হয়েছেন। কিন্তু বন্ড জানত কি বিরাট এক কলঙ্ক এ মেয়েটাকে বাকী জীবন বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে। ফ্রান্সের ক্যাসিনোগুলোর এক শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন আছে। আগামীকাল তাদের প্রত্যেকটিতে টেলিগ্রাম চলে যাচ্ছে। মাদাম লা কতেস তেরেসা ডি ভিকেজোর নামটা (পাসপোর্ট নাম্বার অমুক) যেন কালো খাতায় নাম তুলে দেওয়া হয়। সাথে সাথে ফ্রান্সের প্রত্যেকটি ক্যাসিনোর দরজা তার জন্য চিরকালের মতন বন্ধ হয়ে যাবে। আমেরিকার জুয়াড়ী মহলেও তার প্রবেশ বন্ধ হয়ে গেল। যে মেয়েটির উচ্চ সমাজে অবাধ গতিবিধি ছিল সেখানেও সে আপদস্বরূপ। একটা গণ্ডগোলের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। এই অপমানের বাজি সত্যিই কিন্তু মারাত্মক ভাবে হয়ে দাঁড়াবে। এ অপরাধের একমাত্র শাস্তি হল সমস্ত সমাজ থেকে নির্বাসিত হওয়া।
বন্ড কিন্তু সামাজিক নির্বাসনের কথা ভাবছিল না। আবেভিল থেকে মন্ট্রিলের রাস্তায় গাড়ি চালানোর প্রতিযোগিতায়। যে তাকে হারিয়েছিল আজ সেই অসাধারণ মেয়েটির কথা ভেবে নিয়েই বন্ড এবার সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে দু টো দামী রক্ত বর্ণের চাকতি টেবিলের মধ্যিখানে ছুঁড়ে দিল। সে বলে বসল একটু যেন বিরক্ত স্বরে, ক্ষমা করবেন আপনারা, মাদাম হয়ত ভুলে গেছেন যে, আজ আমাদের পার্টনার হিসাবে খেলব বলে মনস্থির করে রেখেছিলাম। খুব গম্ভীর ভাবেই মেয়েটির দিকে না দেখেই প্রধান পরিচালক বলল, আচ্ছা ক্ষমা করে দেবেন। আমি একটু অন্যমনস্ক ছিলাম আবার খেলা চলুক।
টেবিলের চারিপাশের গণ্ডগোলটা কমে গেল। তবে এটাও বলা চলে যে এতক্ষণ মেয়েটার দিকে যে উত্তেজনা ছিল তা এখন বন্ডের উপর গিয়ে পড়ল। ইংরেজটি যা বলে গেল তাকি সত্যিকথা। তাই-ই হবে হয়ত। একটি সামান্য অচেনা মেয়ের জন্য কুড়ি লক্ষ ফ্রা খরচ তা কখনোই হতে পারে না। অন্ততঃ আপাত দৃষ্টিতে এতক্ষণ কিন্তু মেয়েটির সাথে আগে থেকে পরিচয় ছিল তা বোঝাই যায়নি। ওরা বসে ছিল টেবিলের দুই প্রান্তে কোন রকম সংকেতে বা কোন দান চালাচালিও হয়নি।
মেয়েটির আচরণে কোন ভাবাবেগের চিহ্ন অবধি দেখা গেল না। বন্ডের দিকে শুধু মাত্র একবার তাকাল–তার দৃষ্টি ছিল সহজ ও সরল। তারপর টেবিল ছেড়ে চলে গেল বার-এর দিকে, সব ব্যাপারটার মধ্যে কেমন যেন একটা দুর্বোধ্যতার গন্ধ পাওয়া গেল। যাই হোক পরিচালক সাহেব সবার আড়ালে রুমাল দিয়ে মুখের ঘামটা চট করে মুছে ফেলল। খেলাটা আবার শুরু হয়ে গেল।
জেমস্ বন্ড তখন তার সামনের চাকতির স্তূপের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করল, এখনও বেশ অনেক টাকা আছে। ঐ কুড়ি লক্ষ ফ্র ফেরৎ যদি আনা যায় তবে ভাল হবে। হাজার হোক তবু সে জেতা টাকা দিয়েই তো বাজি রেখেই ধরেছে। যদিও সে হেরে যায় তবে ও তার খানিক লাভ রেখেই খেলা শেষ করতে পারবে। আজকের রাতের হোটেল রয়েল বাড়ির ভাড়াটা বেঁচে তো যাবে। তাছাড়া ঐ লি-এর দানবটির ওপর তার গোড়া থেকে বেশ রাগ ছিল। এই রূপকথার নিয়মটা পাল্টে দিলে ঠিক হবে। আগে তো রাজকন্যা উদ্ধার পাক তবে রাক্ষস বধ করা হবে। এখন বন্ডের হাতে অত টাকা নেই যে বাজির যা পরিমাণ আছে, অর্ধেকটা বাজি সে ধরতে পারে এবং অন্যান্য খেলোয়াড়রা ইচ্ছে করলে ধরতে পারে বাকিটুকু। বন্ড একথা ভুলে গেল সে নিজেকে যাতে রক্ষা করা যায় সেই রকম খেলাই খেলবে। সে সামান্য একটু নিচু হয়ে বাজি ধরল, অর্ধেক এবং কুড়ি হাজার নতুন ফ্রা সামনে ঠেলে দিল।
বন্ডের উপর উপস্থিত সবার আস্থা ছিল। অতএব বাকি অধখানা বাজি দেখার জন্য লোকে ভর্তি হয়ে গেল। সেই ভদ্রমহিলা যাকে আগাথা ক্রিস্টির মত দেখতে তার সাথে এক হাজার নতুন ফ্ৰা বাজি ধরলেন দেখে বন্ড খুবই খুশি হল। তাহলে লক্ষণটা ভালই আছে। ব্যাংকার মানে লি-এর লোকটির দিকে সে তাকিয়ে রইল। ভদ্রলোকের হাতের। সিগারেট নিভে গেছে। দুই ঠোঁট দিয়ে সজোরে চেপে ধরেছে হোল্ডারটাকে, কলকল করে ঘেমে যাচ্ছে। ভদ্রলোক প্রচণ্ড দোনামনায় পড়েছেন। আরেকটা ঝুঁকি নিলে ভাল হয়। তবে মনে হয় অন্য কাউকে ব্যাংক দিয়ে দিতে পারেন। তীব্র, ছোট ছোট চোখ জোড়া দ্রুতগতিতে টেবিলের চারিদিকে ঘুরতে লাগল। খতিয়ে দেখা দরকার তার চার লাখের বিপরীত সমান পরিমাণের টাকা পড়ছে কি না।
শেষ অবধি তিনি মনের মধ্যে ঠিক করে নিলেন। জুতাটাকে একটা চাপড় মেরে দিয়ে টেবিলের ঢাকায় দু-হাতটা মুছে নিলেন। তারপর বন্ড ও নিজের জন্য টেনে বার করলেন দুটো করে তাস।
বন্ড নিজের তাস দুটি একটুখানি তুলে নিয়ে দেখে নিল। সেই পাঁচ পয়েন্ট। সেই অদ্ভুত সংখ্যাটা। যার ওপর তাস নেওয়া বা না নেওয়ার ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তই খাটে না। আর একটা তাস যদি নেওয়া যায় তবে অবস্থার উন্নতি বা অবনতির সম্ভাবনা মনে হয় সমান সমান হবে। বন্ড তখন খুব পরিষ্কার ভাবে সবাইকে জানিয়ে দিল তার আর কোন তাস লাগবে না। ব্যাংকের সামনে পড়ে আছে অজানা গোলাপী রঙের তাস দুটির দিকে তাকিয়ে দেখল। ভদ্রলোক তখন সে দুটিকে উঠিয়ে দেখে নিলেন, তারপর তীব্র বিরক্তিতে টেবিলের উপর ছুঁড়ে ফেলে দিলেন-দু টোই গোলাম মানে শূন্য পয়েন্ট।
