দশ মিনিটের মধ্যে বন্ডের হাতে এল বার ফুট লম্বা একটা বাঁকা সড়কি। তার একপ্রান্ত বেশ ধারাল। জামাকাপড় ভেদ করতে না পারলেও চোখে-মুখে বেশ ভাল খোঁচা দেওয়া যাবে। শরীরের সব শক্তি এক করে দরজার নিচের অল্প ফাঁকটুকুর সাহায্যে বন্ড সড়কির অপরপ্রান্ত বাঁকিয়ে নিল। তারপর মাপল সেটাকে। নাঃ বড় লম্বা। আধাআধি ভজ করে সড়কিটাকে সে প্যান্টের পায়ার ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। সেটা ঝুলতে লাগল তার কোমরের বেল্ট থেকে হাঁটুর ঠিক ওপর পর্যন্ত। চেয়ারের ওপরে দাঁড়িয়ে সভয়ে সামনের সুড়ঙ্গটার ধারে হাত বুলিয়ে দেখল। শক লাগল না। বন্ড ফাঁক দিয়ে উঠে পড়ে উপুড় হয়ে পড়ল সুড়ঙ্গের বুকে।
সুড়ঙ্গটা বন্ডের কাঁধের বিস্তৃতির চেয়ে ইঞ্চি চারেক চওড়া। সুগোল গড়ন, চকচকে কোন এক ধাতুর তৈরি। বন্ড লাইটার বার করল। জ্বালাল, ভাবল ভাগ্যিস লাইটারটা সরাবার মতলব মাথায় এসেছিল। হুম, নতুন দস্তার পাতে তৈরি সুড়ঙ্গ। সোজা সামনের দিকে চলে গেছে। মাঝে মাঝে পাইপের জোড় দেখা যাচ্ছে। লাইটার পকেটে পুরে সে গুঁড়ি মেরে সামনের দিকে এগোেল। বেশ আরাম লাগছে। ঠাণ্ডা হাওয়ায় জোর ঝাঁপটা এসে তার মুখে লাগছে। হাওয়ায় সমুদ্রের গন্ধ নেই। বোধহয় সে ঘরটায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়, সেখান থেকেই ভেসে আসছে। ডক্টর নো নিশ্চয়ই বায়ু চলাচলের জন্য এর কোন একটা সুড়ঙ্গ ব্যবহার করেন। তার শিকারদের সামর্থ্য পরখ করবার জন্য কি বাধা তৈরি করেছেন ভদ্রলোক সেগুলো বেশ নতুন ধাচের আর যন্ত্রণাদায়ক হবে নিশ্চয়ই, যাতে শিকারের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসে। আর শেষ প্রান্তে অবশ্যই থাকবে এক শেষ মার যদি অবশ্য সে ততদূর যেতে পারে। এই শেষ মার থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অসম্ভব। কারণ, এই অভিনব দৌড়ে কোন জয়ীর পুরস্কার নেই, মৃত্যু ছাড়া। বন্ড ভাবল মৃত্যুকে জয় করলে অবশ্য ভালই হয়। হয়ত ডক্টর নো কোন এক জায়গায় অতি চালাকি করেছেন। হয়ত, মানুষের বাঁচবার লালসা যে কতদূর উঠতে পারে তা তিনি আন্দাজ করতে পারেননি। বন্ড ভাবল। এগিয়ে যাবার পথে এইটুকুই কেবল আশার আলো।
সামনে ঝাপসা আলো দেখা যাচ্ছে। সে সাবধানে সেদিকে এগিয়ে গেল। লম্বা সুড়ঙ্গের শেষে অল্প একটু আলো উজ্জ্বল হল। সে এগিয়ে গেল, যতক্ষণ না তার মাথা সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্ত স্পর্শ করে। তারপর, চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। ওপর দিকে প্রায় পঞ্চাশ গজ দীর্ঘ সুড়ঙ্গ খাড়া হয়ে উঠে গেছে। তার ওপর দেখা যাচ্ছে স্থির আলোর রশ্মি। ঠিক যেন একটা লম্বা বন্দুকের নলের ভেতর দিয়ে দেখছে। বন্ড আস্তে আস্তে বাঁকটা ঘুরে দাঁড়াল। এবার তাহলে তাকে এই চকচকে মসৃণ সুড়ঙ্গ বেয়ে সোজা ওপরে উঠতে হবে। কোথাও পা রাখবার জায়গা নেই। পারবে কি? বন্ড কাঁধের পেশি প্রসারিত করল। হ্যাঁ, নলের দু পাশের আঁকড়ে ধরা যাচ্ছে। সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে জুতা খুলে ফেলল যাতে নলের জোড়গুলোতে পায়ের ভর দেওয়া যায়। চেষ্টা তাকে করতেই হবে।
একটা পোকার মত বন্ডের দেহ নল বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলে–কাঁধ প্রসারিত করে দু পাশ আঁকড়ে ধরা, পা তোলা, পায়ে পা জড়িয়ে দেওয়ালে ধাক্কা দেওয়া, তারপর পা ফস্কাতে শুরু করলেই কাঁধ ছোটো করে আরও কয়েক ইঞ্চি ওপরে ওঠা। এইভাবে চলতে লাগল। এক একবারে ছ-ইঞ্চি ওঠা যাচ্ছে। প্রতিটি জোড়ের কাছে থেমে পায়ের ওপর ভর দিয়ে দম নিয়ে পরের জোড়টার দূরত্ব আন্দাজ করে উঠতে হবে। আর ক-ইঞ্চি ধাতুর পাত অতিক্রম করতে হবে সেটাই ভাববো। হাতে পায়ে খিল ধরা নিয়ে দুশ্চিন্তা করলে চলবে না।
কিন্তু এবার তার ঘামে ভেজা পা দুটা ফসকে যাচ্ছে। দু বার পিছলে পড়ে গেল সে। দু বারই কাঁধের জোরে পিছনে পড়া বন্ধ করতে করতে দু গজ করে নেমে এল। এবার সে পুরো দশ মিনিট স্থির হয়ে রইল। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল সামনে দস্তার পাতের ওপর তার মুখের অস্পষ্ট ছায়াটাকে দাঁতে দাঁত চেপে ধরা ছোরা যেন তার মুখকে দ্বিধাবিভক্ত করেছে। বন্ড সাবধানে প্যান্টের পায়ায় দু পায়ের পাতা মুছে আবার উঠতে শুরু করল।
বন্ডের মনের অর্ধেক অংশ লড়াই করে চলেছে আর অন্য অংশটা যেন স্বপ্ন দেখছে। সে বুঝতে পারল না কখন মাথার ওপর আলোর দ্যুতি অনেক বেড়ে গেল, হাওয়া অনেক জোরে আসতে লাগল। বন্ড স্বপ্ন দেখছে একটা ওয়াপোকা যেন নর্দমা বেয়ে বাথরুমের দিকে এগিয়ে চলেছে। নর্দমার মুখে এসে সে কি দেখতে পাবে? একজন উলঙ্গ নারী গায়ের পানি মুছছে? একজন লোক দাড়ি কামাচ্ছে? খোলা জানালা দিয়ে আলোর রশ্মি এসে পড়ছে খালি বাথরুমে?
বন্ডের মাথাটা দড়াম করে ঠুকে গেল। নর্দমার ফুটোটা বন্ধ নাকি? হতাশার প্রাবল্যে বন্ড পিছলে পড়ল গজ খানেক। তারপর কাঁধের সাহায্যে নিজেকে আটকাল। এবার সে ব্যাপারটা বুঝতে পারল। সে সুড়ঙ্গের শেষে পৌঁছে গেছে। চটপট, কিন্তু খুব সাবধানে সে আবার উঠে গেল, যতক্ষণ না মাথায় ধাক্কা লাগে। হাওয়াটা বাঁ কানে লাগছে। সাবধানে মাথা ঘোরাল। আরেকটা লম্বা সুড়ঙ্গ। মাথার ওপরে একটা পোর্টহোল থেকে আলো এসে পড়ছে। এখন তাকে কেবল আস্তে আস্তে ঘুরে গিয়ে সামনের সুড়ঙ্গটার একধার চেপে ধরতে হবে। তারপর কোনরকম একটু শক্তি সংগ্রহ করে শরীরটাকে টেনে নিয়ে ফেলতে হবে সুড়ঙ্গের মধ্যে। তাহলেই সে শুয়ে পড়তে পারবে।
