একটু দাঁড়াও, জো, বন্ডের প্রহরী লিফটম্যানকে বলল। এক্ষুনি আসছি।
বন্ডকে করিডোর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। তার দুদিকে ইংরেজি অক্ষরে চিহ্নিত পরপর অনেকগুলো দরজা। চারদিকে যন্ত্রপাতি চলবার মৃদু গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। মনে হয় তারা এই পাহাড়ের ইঞ্জিন ঘরটায় এসে পড়েছে। শেষ। দরজায় পৌঁছল তারা দুজন। তার ওপর কালো হরফে G লেখা। প্রহরী বন্ডকে দরজার ওপর ঠেলে দিল। খুলে গেল দরজাটা। প্রায় পনের বর্গফুটের এক পাথরে তৈরি ঘর, দেওয়াল ধূসর রং। ঘরটা একেবারে ফাঁকা, রয়েছে কেবল একটা কাঠের চেয়ার। তার ওপর বন্ডের কালো ক্যানভাসের প্যান্ট আর নীল শার্টটা কেচে, ভাজ করে রাখা আছে।
প্রহরী বন্ডের হাত ছেড়ে দিল। বন্ড ঘুরে দাঁড়িয়ে কোঁকড়া চুলের নিচে চওড়া হলদে মুখটার দিকে তাকাল। তরল, বাদামী চোখ দুটোতে কেমন একটা কৌতূহল ও আনন্দের আভাস। দরজার হাতলে হাত রেখে লোকটা বলল, ব্যস এই পর্যন্ত দোস্ত। এইখান থেকে দৌড় শুরু। তুমি এখানে বসে পচতে পার। কিংবা বেরুবার রাস্তা খোঁজবার চেষ্টাও করতে পার। শুভেচ্ছা রইল।
বন্ড ভাবল একবার চেষ্টা করলে মন্দ হয় না। প্রহরীর পাশ দিয়ে এক ঝলক লিফটম্যানকে দেখে নিল। সে লোকটি লিফটের খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে তাদের ওপর নজর রাখছে। চাপা গলায় বন্ড বলল, দশ হাজার পাউন্ড পাবার ইচ্ছে আছে। সেই সঙ্গে পৃথিবীর যে কোন জায়গায় যাবার জন্য প্লেনের টিকিট?
প্রহরীর মুখে আকর্ণ বিস্তৃত হাসি দেখা দিল। একসারি খয়েরি দাঁত বেরিয়ে এল। ছোটবেলা থেকে আখ চিবানোর ফলে প্রান্তগুলো এবড়ো খেবড়ো। সে বলল, ধন্যবাদ, মিস্টার। তার চেয়ে বরং বেঁচে থাকলে কাজ দেবে। সে দরজাটা বন্ধ করছিল, বন্ড উত্তেজিত গলায় ফিসফিসিয়ে উঠল, আমরা একসঙ্গে পালাতে পারি এখান থেকে।
লোকটা তীব্র বিদ্রুপের স্বরে, নিকুচি করেছে। সশব্দে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
বন্ড কাঁধ ঝাঁকাল। ধাতুর তৈরি দরজা, ভেতর দিকে কোন হাতল নেই। বন্ড সেটাকে ধাক্কা মেরে চেয়ারের কাছে গিয়ে তার জামাকাপড়ের ওপর বসল। ঘরটার চারিদিক দেখল। সম্পূর্ণ নিরাভরণ দেওয়াল। কেবল ছাদের ঠিক নিচে এক কোণে পুরু ঝাঁঝরি লাগানো একটা ঘুলঘুলি, চওড়ায় তার কাঁধের বিস্তৃতির চেয়ে বেশি। ঐ পথেই বেরুতে হবে। এছাড়া দরজার ওপরে রয়েছে মোটা কাঁচ লাগানো পোর্টহোল। তার ভেতর দিয়ে করিডোরের আলো এসে পড়েছে। আর কিছু নেই। সাড়ে দশটা বাজে বোধহয়। পাহাড়ের ঢালের ওপর মেয়েটাকে এতক্ষণে বাধা হয়ে গেছে। সে শুয়ে ধূসর প্রবালের ওপর কাঁকড়ার দাঁড়ার আওয়াজ শোনবার অপেক্ষা করছে। বন্ড দাঁতে দাঁত চেপে উঠে দাঁড়াল। এখানে চুপচাপ বসে সে কি করছে? ঝাঁঝরির ওপারে যাই থাকুক, রওনা হবার সময় হয়েছে।
বন্ড লাইটার আর ছোরা নিয়ে কিমানোটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। শার্ট প্যান্ট পরে লাইটারটা গুঁজে রাখল হিপ পকেটে। বুড়ো আঙ্গুলের সাহায্যে ছোরার ধার পরীক্ষা করল। এর সামনের দিকটা ছুঁচলো হলে ভাল হত। মেঝের ওপর হাঁটুগেড়ে বসে সে ছোরার ফলার শান দিতে লাগল।
মূল্যবান পনের মিনিট ব্যয় করবার পর সে সন্তুষ্ট হল। এখন এটা দিয়ে খোঁচা ও কোপ-দুই-ই মারা চলবে। দাঁতে ছোরা চেপে চেয়ারটাকে ঘুলঘুলির নিচে এনে তার ওপর উঠে দাঁড়াল। ঝাঁঝরি! যদি সে এটাকে পুরো উপড়ে আনতে পারে, তবে সিকি ইঞ্চি চওড়া তারটাকে টেনে সোজা করে বেশ একটা বর্শা তৈরি করা যেতে পারে। বন্ড আঙ্গুল বাঁকিয়ে ঝাঁঝরির দিকে হাত বাড়াল।
সমস্ত হাত যেন ঝলসে গেল। বন্ড ছিটকে পড়ল চেয়ার থেকে। মাথাটা সশব্দে মেঝেতে ঠুকে গেল। অবশ হয়ে শুয়ে পড়ল। আবছাভাবে মনে পড়ল এক ঝলক নীল আগুন আর বৈদ্যুতিক শকের তীক্ষ্ণ শব্দ। বুঝল ব্যাপারটা কি?
বন্ড হাটুর ওপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। এক আহত পশুর মত মাথা ঝুঁকিয়ে আস্তে আস্তে নাড়তে লাগল। চামড়া পোড়ার গন্ধ পেল। ডানহাতটা চোখের সামনে তুলে ধরল। আঙ্গুলের ভেতর দিয়ে একটা রক্তাক্ত পোড়া ক্ষত। দেখামাত্র যেন যন্ত্রণা শুরু হল। চাপা গলায় খিস্তি করল বন্ড। আস্তে করে উঠে দাঁড়াল। চোখ কুঁচকে তাকাল ঝাঁঝরিটার দিকে, যেন সেটা আবার তাকে কামড়াতে আসছে, একটা সাপের মত। গম্ভীর মুখে সে চেয়ারটাকে সোজা করে বসাল দেওয়ালের গায়ে। ছোরাটা তুলে নিয়ে পরিত্যক্ত কিমানো থেকে একফালি কাপড় কেটে শক্ত করে আঙুলে জড়ালো। তারপর আবার চেয়ারে উঠে বঁঝরির দিকে তাকাল। এখান দিয়েই বেরোতে হবে তাকে। বৈদ্যুতিক শকটা তাকে দমিয়ে দেবার জন্যে যন্ত্রণার প্রথম স্বাদ দেবার জন্য। তার স্পর্শে নিশ্চয়ই ফিউজ হয়ে গেছে এটা। অথবা এর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত বিদ্যুৎস্রোত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একবার মাত্র সে তাকাল সেদিকে, তারপর তার বাঁহাতের আঙুলগুলো বেঁকে এগিয়ে গেল ঝাঁজরির দিকে। তারের ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে ঝাঁঝরি আঁকড়ে ধরল।
কিছু হল না! কিন্তু না–তার ছাড়া কিছুর স্পর্শ নেই হাতে! বন্ড নাসিকাধ্বনি করল। অনুভব করল তার স্নায়ু শান্ত হয়ে আসছে। তার ধরে টানলো। ইঞ্চিখানেক খুলে এল ঝাঁঝরিটা। আরেক টান দিতেই সবসুদ্ধ খুলে এসে একজোড়া তামার তারের ওপর ঝুলতে লাগল। ঝাঁঝরিটা ছিঁড়ে বার করে চেয়ার থেকে নামাল বন্ড। তারের জাল খুলতে শক্ত করল। চেয়ারটাকে হাতুড়ির মত ব্যবহার করে ভারি তারটাকে সে সোজা করে তুলল।
