মেয়েটার মুখ থেকে এক গোঙানি বের হল। তার মাথা বুকের ওপর ঝুলে পড়ল। অজ্ঞান হয়ে গেছে।
চেয়ারের ওপর বন্ডের বন্দীদেহ আলোড়িত হল। তার চাপা দাঁতের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে এল একরাশ অশ্লীল গালিগালাজ। বাহু চেপে ধরে থাকা বিশাল হাত দুটো আগুনের মত গরম মনে হল। কিন্তু চেয়ারের পায়া দুটো পর্যন্ত নাড়াতে পারল না। কিছুক্ষণ ছটফট করে সে হাল ছেড়ে দিল। যতক্ষণ না গলার আওয়াজ স্থির হয়, ততক্ষণ অপেক্ষা করল। বিষাক্ত গলায় বলল, বেজন্ম কোথাকার। এই কাজের জন্য নরকের আগুনে পুড়বি তুই।
ডক্টর নো একটু হাসলেন। মিঃ বন্ড, আমি নরকের অস্তিত্ব স্বীকার করি না। নিজেকে শান্ত করুন। হয়ত কাকড়াগুলো মেয়েটির গলা বা হৃদপিণ্ড থেকে ভোজ শুরু করবে। সেক্ষেত্রে মরতে বেশিক্ষণ লাগবে না।
তিনি চীনা ভাষায় কি নির্দেশ দিলেন। মেয়েটির পেছনের প্রহরী সামনে ঝুঁকে টুক করে মেয়েটির দেহ তুলে নিল। অসাড় দেহটা কাঁধে তুলে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। মেয়েটার ঝুলন্ত দুহাতের মাঝে সোনার ঝরণার মত লুটিয়ে পড়ল তার চুল। প্রহরী বাইরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল।
কিছুক্ষণের জন্য ঘরটা নীরব হল। বন্ডের মাথায় ঘুরছে কেবল পেটের কাছের ছোরাটা আর বগলের লাইটারটার কথা। এ অস্ত্র দুটো কতটা কাজে লাগবে? ডক্টর নো-র সামনাসামনি পৌঁছানো যাবে কি?
ডক্টর নো শান্ত গলায় বলল, মিঃ বন্ড, আপনি বলছিলেন ক্ষমতা জিনিসটা অলীক কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। এখন কি মনে হচ্ছে এই যে আমি আমার ইচ্ছামত মেয়েটির মৃত্যুর ব্যবস্থা করলাম, এর মধ্যে তো কোন কল্পনা নেই। এবার আপনার মহাপ্রস্থানের যে ব্যবস্থা আমি করেছি, সে সম্পর্কে কয়েকটা কথা বলি। সেটাতেও বেশ নতুনত্ব আছে।
জানেন মিঃ বন্ড, আমি মানুষের সাহসের গঠনপ্রণালী জানতে চাই–অর্থাৎ মানবদেহের সহ্যশক্তির সীমারেখা। কিন্তু সহ্যশক্তি মাপব কি করে? মানুষের বাঁচবার ইচ্ছে, সহ্যশক্তি, নির্ভীকতা–এসবের গ্রাফ টানা কি করে সম্ভব? এ নিয়ে আমি অনেক গবেষণা করেছি, এবং আমার ধারণা সফল হয়েছে। আপাতত অবশ্য পরীক্ষটা একটু স্কুল ও সোজা উপায়ে করা হয়, কিন্তু ক্রমশ বিভিন্ন ধরনের মানুষকে নিয়ে পরীক্ষা চালাতে চালাতে আমি এই প্রক্রিয়াকে আরো পরিমার্জিত করে তুলব। আপনাকে এ পরীক্ষর জন্য যথাসম্ভব তৈরি করে তুলেছি। ঘুমের ওষুধের জন্য আপনার শরীর সম্পূর্ণ বিশ্রাম পেয়েছেন, আর ভাল খাবার দাবারের সাহায্যে আপনার শরীরের সবটুকু শক্তি ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে আপনার মত রোগীরা একই সুবিধা পাবেন। দৈহিক সুস্থতার ব্যাপারে, পরীক্ষা শুরু হবার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তারা একই পর্যায়ে থাকবেন। কিন্তু পরীক্ষা শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে প্রত্যেকের নিজস্ব সাহস ও সহ্যশক্তির লড়াই।
ডক্টর নো থামলেন। বন্ডের মুখের ওপর দৃষ্টি স্থির করে বললেন, মিঃ বন্ড, সম্প্রতি আমি এক অভিনব অবৃস্টা রেস তৈরি করেছি। এই দৌড়ের প্রতি ধাপে মৃত্যুর সম্ভাবনা। এর বেশি কিছু বলব না, কারণ অপ্রত্যাশিত চমক না থাকলে ভয় জিনিসটা ঠিক জমে না। অজানা বিপদ মানুষের সাহসকে একেবারে দমিয়ে দেয়। এদের মত ভয়াবহ আর কিছু নেই। আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, যে সমস্ত বিপদ আপনার জন্য আমি সাজিয়ে রেখেছি, তাদের মধ্যে এই অজানা চমক প্রচুর পরিমাণে ও নানাভাবে উপস্থিত।
এটা খুবই সুখের বিষয়, মিঃ বন্ড, যে আপনার মত দৈহিক ক্ষমতাসম্পন্ন একজন মানুষকে আমি আমার প্রথম প্রতিযোগী হিসেবে পেলাম। আমার পরিকল্পিত এই দৌড়ে আপনি কতদূর এগোতে পারেন, তা দেখবার জন্য আমার খুব কৌতূহল আছে। আপনার উচিত আগামী প্রতিযোগীদের জন্য ভাল একটা রেকর্ড রেখে যাওয়া। আপনার ওপর আমার অনেক আশা আছে। আপনি বোধহয় অনেক দূর এগোতে পারবেন। তবে শেষ পর্যন্ত একটা বাধা অতিক্রম করতে আপনি ব্যর্থ হবেনই, সেটা অবশ্যম্ভাবী। তখন আপনার মৃতদেহ তুলে আনা হবে এবং আমি আপনার দেহের অবশিষ্টাংশকে খুব খুটিয়ে পরীক্ষা করে দেখব। প্রতিটি তথ্য লিখে রাখা হবে। আমার এই পরীক্ষা আপনাকে দিয়েই। শুরু করা হচ্ছে। বেশ একটা সম্মানের ব্যাপার, তাই না, মিঃ বন্ড?
বন্ড কিছুই বলল না। এ সবের অর্থ কি? কি আছে ঐ পরীক্ষাটায়? সে কি তার থেকে জীবিত অবস্থায় বেরোতে পারবে? সে কি সময়মত বেরিয়ে মেয়েটাকে উদ্ধার করতে পারবে? বন্ড সমস্ত সাহস একত্রিত করল, দম আটকানো অজানা ভয়টার বিরুদ্ধে মনকে ইস্পাতের মত শক্ত করে তুলল, একাগ্র করে তুলল বাঁচবার ইচ্ছেকে। সব চেয়ে বড় কথা, যাই হোক না কেন, অস্ত্র দুটো হাতছাড়া করলে চলবে না।
ডক্টর নো নেমে পড়লেন চেয়ার থেকে। ধীর পায়ে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে ফিরে দাঁড়ালেন। মাথা একটু নামিয়ে বললেন, অন্তত আমার খাতিরে ভালভাবে লড়বেন, মিঃ বন্ড। আমার মন আপনার ওপরই পড়ে থাকবে। এবার ডক্টর নো বেরিয়ে গেলেন। দরজাটা আস্তে বন্ধ হয়ে গেল।
.
আঁধার রাতের আর্তনাদ
লিফটে একজন লোক ছিল। দরজা দুটো খোলা। জেমস্ বন্ডকে সেদিকে হটিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। তার হাত দুটো তখনও দু পাশে শক্ত করে ধরা আছে। ডাইনিং রুম এবার খালি হয়ে যাবে। প্রহরীরা কতক্ষণে বাসন-কোসন তুলে নিতে আসবে? হারানো জিনিস দুটোর হদিশ পেতে কতক্ষণ লাগবে তাদের লিফটের একজোড়া দরজা শিসূকেটে বন্ধ হয়ে গেল। লিফটম্যান বোতামগুলোর সামনে এমনভাবে দাঁড়ানো, যাতে বন্ড দেখতে না পায় সে কোনটা টিপছে। ওপরদিকে উঠছে তারা। বন্ড আন্দাজ করতে চেষ্টা করল তারা কতদূর উঠেছে। লিফট থেমে গেল, জোড়া দরজা খুলে গেল। দেখা দিল কার্পেটবিহীন এক করিডোের, তার পাথরের দেওয়ালে ধূসর রং। প্রায় কুড়ি গজ লম্বা।
