বন্ড কিছু বলল না। বলবার কিছুই নেই। হঠাৎ যেন সে ফিরে গেছে রিজেন্ট পার্কের বাড়িটার ন তলায়, সেই শান্ত ঘরটায়। সে যেন স্পষ্ট শুনতে পেল জানালায় বৃষ্টির ছাঁটের মৃদু শব্দ আর M-এর পি মাখানো অসহিষ্ণু গলা। তিনি বলছিলেন, ঐ কতকগুলো পাখি নিয়ে বাজে একটা ব্যাপার…সূর্যের আলোয় কিছুদিন বিশ্রাম নিলে তোমার শরীর ভাল হয়ে যাবে…সামান্য কয়েকটা অনুসন্ধানের ব্যাপার।
আর তারপর সে, শ্রীমান বন্ড, নৌকায় চড়ে সঙ্গে একজন জেলেকে নিয়ে, ঘাড়ে কিছু বনভোজনের খাবার দাবার চড়িয়ে রওনা হয়ে পড়েছিল–একটু দেখেশুনে আসবার জন্য। তা ভীমরুলের চাকটি সে বিলক্ষণ দেখতে পেয়েছে। সব ধাঁধার উত্তর পাওয়া গেছে, গুপ্তরহস্যও সব তাকে জানানো হয়েছে। আর এখন? এখন তাকে খুব ভদ্রতার সঙ্গে কবরের রাস্তা দেখিয়ে দেওয়া হবে। তার সঙ্গে সমাধিস্থ হবে যা কিছু তথ্য সে সংগ্রহ করতে পেরেছে আর এই বেওয়ারিশ মেয়েটি, যাকে সে টেনে এনেছে তার উন্মত্ত অ্যাডভেঞ্চারের মধ্যে।
বন্ডের সমস্ত তিক্ততা তার মুখে উঠে এল। হাত বাড়িয়ে শ্যাম্পেনের গ্লাস টেনে এনে শেষ করল, রুক্ষ্ম স্বরে বলল, ঠিক আছে ডক্টর নো, এবার খেলাটা শেষ করে ফেলুন। আমাদের জন্য কি ব্যবস্থা করেছেন–ছোরা, বুলেট, বিষ, দড়ি কিন্তু একটু চটপট করুন। আপনাকে দেখবার আর কোন আগ্রহ আমার নেই।
ডক্টর নো-র চাপা অধরোষ্ঠ এক পাতলা সরলরেখার রূপ নিল। সুমসৃণ কপালের নিচে তার চোখ দুটো হীরের মত কঠিন দেখাচ্ছে। খসে পড়েছে ভদ্রতার মুখোশ। প্রধান বিচারপতি যেন বসে আছেন তার উঁচু সিংহাসনে। অন্তিম দণ্ডদানের সময় এসে গেছে।
ডক্টর নো কি এক নির্দেশ দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রহরী দুজন বন্দীদের দু হাত চেয়ারের সঙ্গে চেপে ধরল। তারা বাধা দিল না। বন্ড লাইটারটাকে বগলে চেপে ধরে রাখবার চেষ্টা করে চলেছে। সাদা দস্তানা পরা হাত দুটো তার বাইসেপ দুটো চেপে ধরে আছে, যেন একজোড়া ইস্পাতের বন্ধনী। মেয়েটার দিকে হেসে বলল, আমি দুঃখিত হানি। মনে হচ্ছে আমাদের দুজনকে এবার আলাদা করা হবে।
ফ্যাকাশে মুখ এবার ভয়ে নীল রং ধারণ করল। ঠোঁট দুটো কাঁপছে, বলল, ব্যথা লাগবে?
চুপ। ডক্টর নো-র গলার আওয়াজ চাবুকের মত আছড়ে পড়ল। ঢের মস্করা হয়েছে। নিশ্চয়ই ব্যথা লাগবে। ব্যথা দিতেই চাই আমি। আমি জানতে চাই মানুষের দেহ কতটা যন্ত্রণা সহ্য করতে পারে। মাঝে মাঝে আমি আমার দ্বীপের অপরাধী শ্রমিক এবং আপনাদের মত অনুপ্রবেশকারীদের ওপর এই পরীক্ষা চালাই। আপনারা দুজনে আমার অনেক অসুবিধার কারণ হয়েছেন। প্রতিদানে আমিও আপনাদের যথেষ্ট যন্ত্রণা দিতে চাই। আপনাদের সহ্যশক্তির সীমা আমি মেপে রাখব। এ পরীক্ষার প্রতিটি তথ্য লিখে রাখা হবে। একদিন পৃথিবীর মানুষ আমার এই পরীক্ষার কথা জানবে। আপনাদের মৃত্যু বিজ্ঞানের অগ্রগতির পথে রসদ জোগাবে। মানুষের মূল্যবান জীবন আমি কখনো বৃথা নষ্ট করি না। বিগত যুদ্ধের সময় জার্মানরা জীবন্ত মানুষের ওপর যে সব পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছিল, বিজ্ঞানের তাতে উন্নতি কম হয়নি।
ডক্টর নো মেয়েটিকে বললেন। তোমার জন্য যে শাস্তি ঠিক করেছি, প্রায় এক বছর আগে একই উপায়ে আরেকটি মেয়েকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলাম। মেয়েটি ছিল নিগ্রো। সে তিন ঘণ্টা বেঁচে থাকতে পেরেছিল, তারপর ভয়ে ও আতংকে মারা যায়। তার সহ্যশক্তির সঙ্গে তুলনা করবার জন্য আমি একজন শ্বেতাঙ্গ মেয়ে খুঁজছিলাম। তাই এই দ্বীপে তোমার আগমন বার্তা পেয়ে আমি আশ্চর্য হইনি। আমি যা চাই তাই পাই। ডক্টর নো চেয়ারে আরো এলিয়ে বসে মেয়েটির প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করছিল। সে প্রায় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে, যেন র্যাট সাপের সামনে এক গেছে ইঁদুর।
বন্ড দাঁতে দাঁত চাপল।
তুমি তো জ্যামাইকান, তুমি আমার বক্তব্য বুঝতে পারবে। এই দ্বীপের নাম ক্র্যাব-কী (কর্কট দ্বীপ)। এরকম নাম হবার কারণ, এখানে অসংখ্য কাঁকড়া বাস করে, স্থলচর কাঁকড়া–জ্যামাইকায় যাদের বলে কালো কাঁকড়া। তোমার নিশ্চয়ই জানা আছে। একটার ওজন প্রায় এক পাউন্ড। আকারে চায়ের প্লেটের মত। বছরের এই সময়টাতে তারা হাজারে হাজারে তাদের উপকূলবর্তী গর্ত ছেড়ে বেরিয়ে এসে পাহাড়ের দিকে রওনা হয়। সেখানে প্রবালের মধ্যে, পাথরের ফাঁকে ফাঁকে গর্তের ভেতর তারা ডিম পাড়ে। শত শত কাঁকড়া সৈন্যবাহিনীর মত মার্চ করে এগিয়ে যায় পাহাড়ের দিকে, পথে কোন কিছু পড়লে তার ভেতর দিয়ে বা ওপর দিয়ে এগিয়ে চলে। জ্যামাইকায়, পথে বাড়িঘর পড়লে তার ভেতর দিয়ে চলে যায় তারা। অনেকটা নরওয়ের লেমিংদের মত। নিছক প্রবৃত্তির টানে তারা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে।
ডক্টর নো থামলেন। তারপর মৃদুকণ্ঠে বললেন, কিন্তু লেমিংদের সঙ্গে তাদের পার্থক্য আছে। এই কাঁকড়ারা পথে যা কিছু পায় খেয়ে ফেলে। বছরের এই সময়ে তাদের অভিযান চলে। লাল, কমলা, কালো রঙের বড়-সড় ঢেউয়ের মত হাজারে হাজারে তারা ছুটে চলে পাহাড়ের দিকে। আঁচড়ে, রগড়ে দ্রুত গতিতে ছুটে চলে আমাদের মাথার ওপরের পাথরের ওপর দিয়ে। আর আজ তাদের পথের মাঝে তারা দেখতে পাবে মাটির সঙ্গে আটকানো এক প্রসারিত নগ্ন নারীদেহ। যেন তাদের জন্য ভোজ্যদ্রব্য সাজানো। প্রথমে ওরা ওদের খাবার দাঁড়া দুটো দিয়ে উষ্ণ দেহটাকে ঠুকরে দেখবে…তারপর একটা লড়াইয়ের দাঁড়ার সাহায্যে একটু মাংস খুবলে নিয়ে চেখে দেখবে…তারপর আরেকটা…তারপর…।
