বন্ড একটা নতুন শ্রদ্ধার সঙ্গে অন্ধকার বিবরের মত চোখদুটোর দিকে তাকাল। বলল, এতবড় একটা ব্যাপার। নিজের হাতে রাখতে হলে আরো অনেক হত্যা আপনাকে করতে হবে ডক্টর নো। এই ষড়যন্ত্রটার সত্যিই দাম আছে। আমি যা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক দামী সম্পত্তি আপনার। সকলেই আপনার দিকে হাত বাড়াবে। জানি না কে তাদের মধ্যে সবচেয়ে আগে আপনাকে শেষ করতে পারবে। ঐ লোকগুলো, বন্ড ছাদের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, বিদেশী রাষ্ট্রের ট্রেনিং নিয়ে এসেছে। যন্ত্রপাতি ওরাই চালায়। ধরুন ওদের ওপর যদি অন্য কোন নির্দেশ দেওয়া থাকে? সেক্ষেত্রে আপনার পক্ষে তা জানা সম্ভব নয়, তাই না?
আমার ক্ষমতা সম্পর্কে এখন আপনি সম্পূর্ণ ধারণা করে উঠতে পারেনি, মিঃ বন্ড। আপনি বড় একগুয়ে, আর আমি যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়ে বেশি মূর্খ। এ সবকটি সম্ভাবনা আমার জানা আছে। এদের একজনকে আমি আমার নিজস্ব চর হিসাবে কাজে লাগিয়েছি। তার কাছে সংকেত ও সংকেত যন্ত্রের নকল আছে। সে থাকে পাহাড়ের অন্য অংশে। অন্যেরা জানে সে মারা গেছে। সে লোকটি নিয়ম করে প্রতিটি বার্তা কান দিয়ে শোনে এবং আমাকে জানায়। এ পর্যন্ত বিদেশ থেকে আসা কোন সংকেত ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া যায়নি। এ সব নিয়ে আমি সর্বদা চিন্তা করি, মিঃ বন্ড। সবরকম সতর্কতা অবলম্বন করি, আর ভবিষ্যতে ক্রমশ আরো সতর্ক হব। আবার বলছি, আপনি এখনো আমাকে বুঝে উঠতে পারেননি।
আমি ঠিকই আপনাকে বুঝতে পেরেছি, ডক্টর নো। আপনি খুব সতর্ক, কিন্তু একই সঙ্গে কয়েকজন শত্রুর নজর পড়েছে আপনার ওপর। আমার জীবিকায়, অর্থাৎ গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষেত্রে। একই কথা আমার সম্বন্ধেও খাটে। কিন্তু আপনার শত্রুরা প্রত্যেকেই সাংঘাতিক। যেমন ধরুন, সেই চীনে গুণ্ডারা। এ ধরনের শত্রু আমারও অস্বস্থি ঘটাতে পারত। অবশ্য আমেরিকান পুলিশ এফ-বি-আই-এর আপনার ওপর তেমন অপরাধ চাপাবার নেই। দস্যুবৃত্তি ও ভুয়া পরিচয় জ্ঞাপন করা ছাড়া। কিন্তু উক্ত বিদেশী রাষ্ট্র সম্পর্কে কতটা জানা আছে আপনার? আপাতত হয়ত আপনি তাঁদের প্রিয়তম বন্ধু। কিন্তু কোন কাজেই তারা অংশীদার পছন্দ করে না। তারা চাইবেন আপনার অংশ আত্মসাৎ করতে, একটি বুলেটে আপনার অংশীদারী ঘুচিয়ে দিতে। তারপর আমার গুপ্তচর বিভাগের সঙ্গেও আপনি শত্রুতা করছেন। আপনি কি সত্যিই চান সে শত্রুতা বাড়িয়ে তুলতে? আপনার জায়গায় আমি থাকলে এমন কাজ করতাম না, ডক্টর নো। আমার সংস্থায় অতিশয় একগুয়ে গুপ্তচর একদল আছে। আমার আর এই মেয়েটির যদি কোন ক্ষতি হয়, অল্পদিনের মধ্যে আপনি হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারবেন ক্র্যাব-কী নেহাৎ একটা ছোট অসহায় দ্বীপ ছাড়া কিছু নয়।
উঁচু বাজির খেলা ঝুঁকি না নিয়ে খেলা যায় না মিঃ বন্ড। যথাসম্ভব বিপদের মুখোমুখি হতে আমি তৈরি আছি। জানেন মিঃ বন্ড গভীর কণ্ঠস্বরে যেন একটু লোভের ছোঁয়া লাগল, আমার সামনে এখন খুব বড় কয়েকটা কাজ রয়েছে। যে দ্বিতীয় অধ্যায়ের কথা আমি বলছিলাম, তাতে এত বড় পুরস্কার লাভের সম্ভাবনা আছে যে, এক মহামূর্খ ছাড়া কেউ কেবল ভয় পাওয়ার অজুহাতে সে সুযোগ নষ্ট করবে না। আমি আপনাকে বলেছি মিঃ বন্ড, যে তরঙ্গরশ্মির সাহায্যে ঐ রকেটগুলো উড়ে, তাদের আমি বাঁকাতে পারি। ইচ্ছে করলে গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দিতে এবং বেতার নিয়ন্ত্রণ অগ্রাহ্য করাতেও পারি।
মিঃ বন্ড, ধরুন আমি যদি আর একটু এগিয়ে যাই? যদি আমি তাদের এই দ্বীপের পাশের সমুদ্রে টেনে আনি, তাদের গোপন নির্মাণ কৌশল আয়ত্বে এনে ফেলি? আমেরিকান ডেস্ট্রয়ারেরা ঘুরে বেড়ায় অনেক দূরে। দক্ষিণ আটলান্টিকে। ক্ষেপণাস্ত্ররা জ্বালানী ফুরিয়ে গেলে প্যারাসুটের সাহায্যে সমুদ্রে নেমে পড়ে এবং ঐসব ডেস্ট্রয়ার তাদের সমুদ্রগর্ভ থেকে টেনে তোলে। কখনো কখনো এই প্যারাসুটগুলো ঠিক মত খোলে না। কখনো বা তাদের আত্মবিধ্বংসী যান্ত্রিক ব্যবস্থা বিকল হয়ে যায়। যদি কখনো কখনো দু একটা নতুন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ভুল পথে উড়ে ক্র্যাব-কি পাশে এসে পড়ে, তাতে তুর্কন্স দ্বীপের একজনও বিস্মিত হবে না। প্রথম প্রথম যান্ত্রিক গোলযোগ বলে ধরে নেওয়া হবে। পরে হয়ত তারা আবিষ্কার করবে যে অজানা কোন এক বেতার সংকেত তাদের ক্ষেপণাস্ত্রকে পরিচালিত করেছে।
তারপর শুরু হবে পরস্পরের তরঙ্গরশি বিকল করে দেবার লড়াই। ওরা এই অজ্ঞাত সংকেতের উৎসস্থল খুঁজে বার করবে। ওরা আমার খোঁজ করছে বোঝমাত্র আমি আমার চরম অস্ত্র প্রয়োগ করব। তাদের প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র উন্মাদের মত উড়ে গিয়ে পড়বে হাভানায়, কিংসটনে। উল্টোদিকে ঘুরে গিয়ে আছড়ে পড়বে মায়ামির ওপর। পরীক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের ডগায় পারমাণবিক অস্ত্র লাগানো থাকে না। তবু মিঃ বন্ড, লোকজনে ভর্তি একটা শহরের ওপর হাজার মাইল বেগে পাঁচ টন ধাতু ভেঙ্গে পড়লে ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে।
তারপর আতংক ছড়িয়ে পড়বে। জনসাধারণ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে। সমস্ত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ করে দিতে হবে। আমেরিকার শত্রুরারা এরকম একটা ঘটনার জন্য কত দাম দিতে পারে মিঃ বন্ড? আর সবকটি অপহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের। জন্য? ধরা যাক সব মিলিয়ে এক কোটি ডলার? দু কোটি? অস্ত্রীকরণ প্রতিযোগিতায় এ এক বিরাট জয়। যত টাকা চাইব, ততই পাব আমি। কি বলেন, মিঃ বন্ড? আর আপনার কি মনে হয় না, যে এই সব পরিকল্পনার পরিপ্রেক্ষিতে আপনার সমস্ত যুক্তিতর্ক নিতান্তই তুচ্ছ।
