বন্ড মেয়েটার দিকে তাকাল। তার রং ভয়ে একেবারে সাদা হয়ে গেছে। বন্ড চোখ নামিয়ে হাতের নখগুলো পরীক্ষা করতে লাগল। অনেকটা সময় কাটানোর জন্যে বলল, আর তারপর? সারাদিন পাখির নোংরা নিয়ে সময় কাটাবার পর কি করবেন? আপনার জীবন নাটকের পরবর্তী কোন অধ্যায় লিখতে চলেছেন আপনি?
ঠিক বলেছেন। কথাটা নিশ্চয়ই আপনার মাথায় এসেছে, মিঃ বন্ড। কৌতূহলী স্বভাব আপনার। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বোধহয় আপনার জিজ্ঞাসা কমবে না। একজন মানুষ, যার পরমায়ু আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা, তার এমন অনুসন্ধিৎসা সত্যি প্রশংসার যোগ্য। আপনি শুনে শান্তি পাবেন যে পাখির নোংরা ছাড়াও এ দ্বীপে আরও অনেক কিছু আছে। সহজাত প্রবৃত্তির বশে আপনি যে সন্দেহ করছেন তা ভুল নয়।
মিঃ বন্ড, কিছুদিনের মধ্যে এই দ্বীপ পৃথিবীর সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুপ্ত ঘাঁটিতে পরিণত হতে চলেছে।
তাই নাকি? বস্ত বলল।
আপনি নিশ্চয় জানেন, ওয়াইন্ড-ওয়ার্ড প্যাসেজ বরাবর এখান থেকে প্রায় তিনশ মাইল দূরে আছে তুর্কস দ্বীপ, আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্র (Guided missiles) পরীক্ষার ঘাঁটি।
হ্যাঁ, ওটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি।
আপনি হয়ত কাগজে পড়েছেন যে সেখান থেকে ছোঁড়া কয়েকটি রকেট সম্পূর্ণ বিপথে চলে গেছে। যেমন, বহুতর বিশিষ্ট সার্ক রকেটটি দক্ষিণ আটলান্টিকে ডুব মারবার বদলে গিয়ে পড়েছিল ব্রাজিলের অরণ্যে।
হা। .. আপনার হয়ত মনে আছে, সেই রকেট টেলিমিটারের সাহায্যে পাঠানো সব নির্দেশ, এমন কি নিজেকে ধ্বংস করে ফেলার নির্দেশও সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে। তারপর নিজের ইচ্ছেমত উড়ে বেড়ায়।
আমার মনে আছে।
এ ছাড়া অনেক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বিরাট ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। তাদের সংখ্যা এত বেশি যে সবকটা নামও আমার মনে নেই। মিঃ বন্ড, আপনি শুনে হয়ত বিস্মিত হবেন যে এই সব ব্যর্থতার প্রায় সবকটি এই ক্র্যাব-কী থেকে সম্ভব করা হয়েছে।
তাই নাকি?
বিশ্বাস হচ্ছে না? অন্য অনেকে বিশ্বাস করেন যারা নিজের চোখে দেখেছেন, কি করে একটা ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে। এই অন্যেরা একটি বিদেশী রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। এই প্রকল্পে আমার সহকর্মী তাঁরা। আমার ছ জন কর্মচারিকে তারা সুশিক্ষিত করে তুলেছেন। তাদের দুজন ঠিক এই মুহূর্তে সজাগ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করছে কোন বেতার তরঙ্গক্রমে, কোন তরঙ্গরশ্মির সাহায্যে পরবর্তী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষিপ্ত হচ্ছে।
মিঃ বন্ড, আমাদের মাথার ওপরে, পাথরের দেওয়ালের আড়ালে লুকানো আছে দশ লক্ষ ডলার মূল্যের যন্ত্রপাতি। সেই সব যন্ত্র থেকে যেন এক সুদীর্ঘ হাত উঠে গেছে আকাশের হেভীসাইড স্তরে, তুর্কস্ দ্বীপ থেকে আসা বেতার সংকেতের জন্য অপেক্ষা করছে। সংকেতকে অচল করে দিচ্ছে। তাদের তরঙ্গরশ্মিকে আমাদের রশি দিয়ে ঘায়েল করছে। সময় সময় এক একটা রকেট আকাশে উঠছে, লক্ষ্যস্থল আটলান্টিকের বুকে কোন এক জায়গা, একশ থেকে পাঁচশ মাইল দূরে। আমরা তার গতিবিধি লক্ষ্য করি। ঠিক যতটা নির্ভুলভাবে তুর্কস দ্বীপ থেকে লক্ষ্য করা হচ্ছে। তারপর সহসা আমাদের প্রেরিত তরঙ্গ গিয়ে আঘাত করছে রকেটে। যাতে তার যান্ত্রিক মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত হয়। রকেট উন্মত্ত হয়ে পড়ে-তারপর সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়। নিজেকে বিস্ফারিত করে, অথবা আড়াআড়ি অনির্দিষ্ট পথে উড়ে বেরিয়ে যায়। আমেরিকানদের আর একটি পরীক্ষা ব্যর্থ হয়ে যায়। দোষ পড়ে যায় পরিচালক, পরিকল্পনাকারী আর নির্মাতাদের ওপর। পেন্টাগনে বিশৃংখলা ছড়িয়ে পড়ে। তারা ভাবেন অন্যপথে চেষ্টা করতে হবে–অন্য তরঙ্গক্রম। অন্য ধাতু, অন্য ধরনের বেতার নিয়ন্ত্রিত যান্ত্রিক মস্তিষ্ক।
অবশ্য আমরাও মাঝে মাঝে অসুবিধায় পড়ি। পরপর ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে বেরিয়ে যেতে দেখি, অথচ তাদের যান্ত্রিক মস্তিষ্ককে বিকল করতে ব্যর্থ হই। সঙ্গে সঙ্গে সেই বিদেশী রাষ্ট্রের রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ করি। হ্যাঁ এজন্য তারা আমাকে একটি বেতার সংকেত পেরক যন্ত্র দিয়েছে। এ যন্ত্রের জন্য এক নির্দিষ্ট তরঙ্গক্রম ও সময় ব্যবস্থা আছে। তারা এই সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করেন। সম্ভাব্য সমাধান বার করে আমাদের জানান। আমরা আবার সেইমত চেষ্টা করি। শেষ পর্যন্ত সুদূর স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে আমেরিকান রকেট আমাদের সংকেতে হঠাৎ সাড়া দেয়। সে রকেট আমাদের তরঙ্গ গ্রহণ করামাত্র তার মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত করে দিতে সক্ষম হই আমরা।
একটু থেমে ডক্টর নো আবার বললেন, কেমন লাগছে আপনার মিঃ বন্ড, গুয়ানোর ব্যবসার সঙ্গে লাগোয়া এই ছোট্ট ব্যবসাটাকে বেশ চিত্তাকর্ষক নয় কি? আর জেনে রাখুন, এটা বেশ লাভও দেয়। লাভের পরিমাণ শিগগীরই বাড়তে পারে। কম্যুনিস্ট চীন হয়ত এ কাজের জন্য আরো বেশি টাকা দিতে রাজি হবে। কে জানে। আমি ইতিমধ্যেই সেখানে তোক পাঠিয়েছি।
বন্ড চোখ তুলল। চিন্তিতভাবে ডক্টর নো-র দিকে তাকাল। খুব বড় খেলা খেলছেন ডক্টর নো। আন্তর্জাতিক গুপ্তচরবৃত্তি ও অন্তর্ঘাতের জগতে এ খেলার সত্যিই উঁচু দর আছে।…তা বেশ। এতক্ষণে সব রহস্য পরিষ্কার হচ্ছে। এত বড় একটা ব্যাপারের জন্য অবশ্যই কয়েকটা পাখিকে ভয় দেখিয়ে তাড়ানো আর কয়েকজন মানুষকে খতম করা চলতে পারে।
